হাঁফ ছাড়ার জন্য থোলোমায়েস একবার থামল। ব্ল্যাকিভেল, লিস্তোলিয়ের আর ফেমিউল একটা বাজে গান ধরল। যে গানের কোনও যুক্তি বা মাথামুণ্ডু নেই, যা মনের মধ্যে কোনও রেখাপাত করতে পারে না, শুধু তামাকের ধোয়ার মতো উড়ে যায়, উবে যায় মুহূর্তে। এ গানের উদ্দেশ্য হল থোলোমায়েসের আবেগটাকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া। গ্লাসের মদটা এক চুমুকে শেষ করে আবার তাতে মদ ঢেলে তার কথাটা শেষ করার জন্য আবার বলতে লাগল, জাহান্নামে যাক যত সব জ্ঞান! আমি যা কিছু বলেছি সব ভুলে যাও। আমরা সতী নারী বা পরিণামদর্শী পুরুষ কোনওটাই হব না। আমি চাই শুধু আনন্দের মত্ততা। খাওয়া-দাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের আলোচনায় জলাঞ্জলি দিয়ে আনন্দ করো। হজম, বদহজম সব চুলোয় যাক। পুরুষরা বিচার চায় আর মেয়েরা ফুর্তি আর আমোদ উৎসব চায়। এই বিশ্বসৃষ্টি কত সুন্দর, কত ঐশ্বর্যমণ্ডিত! কত আনন্দে ভরা এই পৃথিবী। বসন্তের পৃথিবী উজ্জ্বল সূর্যালোকে মুক্তোর মতো চকচক করছে। পথে-ঘাটে পাখির গান ঝরে পড়ছে অবিরল ধারায়। অ্যাভেনিউ দ্য অবজারভেরিতে কত সুন্দরী ধাত্রীরা শিশুদের দিকে অজানা দৃষ্টি রেখে স্বপ্নবিষ্ট হয়ে বসে আছে। আমার অন্তরাত্মা পাখির মতো
অনাবিষ্কৃত কোনও অরণ্যে অথবা নির্জন সাভানা অঞ্চলে উড়ে যেতে চায় যেখানে সব। কিছুই সুন্দর, সব কিছুই মনোরম। মাছিরা ঝাঁক বেঁধে সেখানে সূর্যের আলোয় উড়ে বেড়ায়, যে সূর্যের আলো থেকে অনেক সঙ্গীতমুখর পাখির জন্ম হয়। আমাকে চুম্বন করো ফাঁতিনে।
কিন্তু অন্যমনস্কভাবে সে ফেবারিতেকে চুম্বন করল।
.
৮
জেফিনে বলল, এ হোটেলে থেকে ইডনের খাবার ভালো।
ব্ল্যাকিভেল বলল, আমি বম্বার্দাকে বেশি পছন্দ করি। পরিবেশটা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। নিচের তলায় দেয়ালগুলোতে আয়না আছে।
ফেবারিতে বলল, আমি শুধু দেখতে চাই আমার প্লেটে কী খাবার দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এখানকার কাঁটাচামচগুলো দেখ। হাতলগুলো সব রুপোর। ইডনে এগুলো হাড়ের।
থোলোমায়েস জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কী দেখছিল।
ফেমিউল তাকে বলল, থোলোমায়েস, লিস্তোলিয়েরের সঙ্গে আবার ঝগড়া হচ্ছে।
থোলোমায়েস বলল, বিবাদ ভালো, তবে ঝগড়া আরও ভালো।
ফেমিউল বলল, আমরা দর্শনের একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সেকার্তে ও স্পিনোতার মধ্যে তুমি কাকে পছন্দ করো?
থোলোমায়েস বলল, আমি পছন্দ করি বিখ্যাত ক্যাবারে গায়ক দেসজিয়েতকে।
এরপর বিচারের পর রায়দানের ভঙ্গিতে সে বলতে লাগল, আমি বাঁচতে চাই। এখনও পৃথিবীর পরমায়ু শেষ হয়নি, সুতরাং এখনও আমরা বাজে কথা বলে ফুর্তি করতে পারি। আর এই ফুর্তির জন্য অমর দেবতাদের ধন্যবাদ দিই আমি। আমরা মিথ্যা কথা বলি, তবু হাসি। আমরা কোনও কিছু মেনে নিয়েও তাতে সংশয় পোষণ করি। চমৎকার। ন্যায়মূর্তির আশ্রয়বাক্য থেকে অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু অনেক সময় বেরিয়ে আসে। পৃথিবীতে এখনও এমন অনেক লোক আছে যারা বিস্ময়ের চমকে ভরা বৈপরীত্যের বাক্স খুলে বা বন্ধ করে অনেকখানি আনন্দ পায়। হে মহিলাগণ, তোমরা এখন যে মদ পান করছ শান্তিতে তা এখানকার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিনশো সত্তর মাইল দূরে কোরাল দ্য ফ্রেইরার আঙুরক্ষেতে তৈরি হয় এবং সেখান থেকে চালান আসে। একবার ভেবে দেখ, তিনশো সত্তর মাইল দূর থেকে এই বম্বার্দা হোটেলে যে মদ আসে তা লিটারপ্রতি সাড়ে চার ফ্রাঁতে এখানে বিক্রি হয়।
ফেমিউল প্রতিবাদ করে কী বলতে গেল। সে বলল, থোলোমায়েস, তুমি নেতা, তোমার মতই আইন। কিন্তু তুমি কি ভেবে দেখেছ–
ঘোলোমায়েস সে কথা গ্রাহ্য না করে বলতে লাগল, বম্বার্দা হোটেলের জয় হোক। বম্বার্দা এলিফ্যান্টার মিউনোফিসের সমান মর্যাদা পাবে যদি সে আমাকে একটা নাচের মেয়ে জোগাড় করে দেয়। আবার সে যদি আমাকে সঙ্গদানের জন্য একটা মেয়ে এনে দিতে পারে তা হলে সে শেরোনেউসের থাইজেলিয়নের মর্যাদা পাবে। বিশ্বাস করো মহিলাগণ, আপুলিউসের কথা থেকে জানতে পারা যায় গ্রিস ও মিশরেও বম্বার্দা নামে হোটল ছিল। সলোমন তাই হয়তো বলতেন, জগতে নতুন কোনও কিছুই নেই। আবার ভার্জিল বলেছিলেন, আসলে এই প্রেম যুগে যুগে বিভিন্ন নরনারীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন রূপ লাভ করে। আজ যেমন কয়েকটি যুবতী তাদের যুবক প্রেমিক এক একজন লুইকে নিয়ে সেন্ট ক্লাউডে নৌকোবিহার করে বেড়াচ্ছে তেমনি অতীতে একদিন অ্যাসপেপসিয়াও পেরিক্লিসের সঙ্গে জাহাজে করে সামস দ্বীপে বেড়াতে যায়। অ্যাসপেসিয়া কে ছিল, তোমরা তা জান কি? সে এমন একটা যুগের মেয়ে ছিল যখন মেয়েদের আত্মা বলে কোনও জিনিস ছিল না। তথাপি তার মধ্যে এমন একটা আত্মা ছিল যা একই সঙ্গে গোলাপি এবং লাল, যে আত্মা একই সঙ্গে ছিল অগ্নিশিখার থেকে তপ্ত আর স্নিগ্ধ, সকলের থেকে শীতল। নারীচরিত্রের দুটি প্রান্তসীমাকে সে অতিক্রম করেছিল। সে ছিল বারবণিতা দেবী, সে ছিল অংশত সক্রেটিস আর অংশত মেলন লেসকৎ। আসলে সে যেন প্রমিথিউসের সেবার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল। অবশ্য প্রমিথিউস যদি তা চাইত।
কথা বলার আবেগ তখন পেয়ে বসেছিল থোলোমায়েসকে এবং তাকে তখন থামানো কঠিন হত যদি-না তখন তাদের ঘরের বাইরে জানালাটার তলায় গাড়ি টানতে টানতে একটা ঘোড়া হঠাৎ পড়ে না যেত। ঘোড়াটা ছিল মাদী এবং বয়সে বুড়ি। গাড়ি টানার সামর্থ্য তার ছিল না। গাড়িটা টানতে টানতে ঘোড়াটা তাই ক্লান্তির নিবিড়তায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আর যেতে পারছিল না। গাড়ির চালক গালাগালি করছিল। নির্মমভাবে চাবুক মারতে লাগল। কিন্তু ঘোড়াটা আর চলল না, পড়ে গেল। তখন গাড়িটার চারদিকে ভিড় জমে গেল। গোলমাল শুনে থোলোমায়েস ও তার দলের সবাই জানালা দিয়ে উঁকি মারতে লাগল।
