গভীর মনোযোগের সঙ্গে কথাগুলো শুনছিল ফেবারিতে।
ফেবারিতে বলল, ফেলিক্স নামটা কী সুন্দর! ফেলিক্স শব্দটা লাতিন। এর মানে হচ্ছে সুখী।
থোলোমায়েস আবার বলতে লাগল, বন্ধুগণ, তোমরা কি কামনার দংশন থেকে মুক্তি পেতে চাও? তোমরা বাসরশয্যা বাতিল করতে চাও অথবা কুটিল প্রেমের ছলনাকে পরিহার করতে চাও? তা হলে তা সহজেই করতে পারবে। এটাই হল ব্যবস্থাপত্র। বিরামহীন বিদ্রি শ্রমের মধ্য দিয়ে তোমাদের নিজেদের ক্ষয় হয়ে যেতে হবে, আহার। নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় উপবাসে জীবন কাটাতে হবে, সামান্যতম পোশাক পরতে হবে আর ঠাণ্ডা জলে স্নান করতে হবে।
লিস্তোলিয়ের বলল, আমি কিছুদিনের মধ্যেই এক নারীকে লাভ করব।
থোলোমায়েস আবেগে চিৎকার করে উঠল, নারী! নারী থেকে সাবধান! নারীদের চটুল চঞ্চল অন্তরকে যারা বিশ্বাস করে তারা জাহান্নামে যাক। নারীরা হচ্ছে অবিশ্বস্ত এবং চঞ্চল প্রকৃতির। সে সাপকে তার প্রতিদ্বন্দিনী ভেবে ঘৃণা করে, অথচ সেই সাপ তার সামনের বাড়িতেই থাকে।
ব্ল্যাকিভেল বলল, থোলোমায়েস, তুমি মাতাল হয়ে পড়েছ।
হয়তো তাই।
তা হলে অন্তত আনন্দ কর।
গ্লাসে মদ ঢেলে উঠে দাঁড়িয়ে থোলোমায়েস বলল, ঠিক আছে। মদের জয় হোক। মেয়েরা, আমাকে ক্ষমা করবে। স্পেনদেশীয় রীতি। মদই মানুষকে নাচায়। শোন। ভদ্রমহিলারা, বন্ধুর একটা উপদেশ শোন। ইচ্ছে হলেই তোমার প্রেমের অংশীদার পরিবর্তন করতে পার। ইংরেজ নারীদের মতো কোনও নারীর অন্তরে আবব্ধ হয়ে থাকার জন্য প্রেমের জন্ম হয়নি, এক বাধাহীন গণ্ডিহীন আনন্দ চঞ্চলতায় অন্তর থেকে অন্তরে ঘুরে বেড়াবার জন্যই প্রেমের সৃষ্টি হয়েছে। ভুল করাই মানুষের কাজ, এটা প্রবাদের কথা। আমি বলি ভালোবাসা মানেই ভুল করা। ভদ্রমহিলাগণ, আমি তোমাদের প্রত্যেককেই শ্রদ্ধা করি। জেফিনে, জোশেফাইন, তোমরা একটু কম কটুভাষিনী হলে এবং ক্রোধের অভিব্যক্তিটা একটু কম হলে তোমরা আরও বেশি মনোহারিণী হয়ে উঠতে পারতে। আর ফেবারিতে, একদিন ব্ল্যাকিভেল যখন রু্য গেরিন বয়সের একটা রাস্তা পার হচ্ছিল তখন সাদা মোজাপরা একটি মেয়ে তাকে পা দেখাল এবং তাতে এত আনন্দ পায় যে মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলে সে। ফেবারিতে, তোমার ঠোঁট দুটো গ্রিক ভাস্কর্যের মতো। একমাত্র ইউফোরিয়ন যে চিত্রকর শুধু ঠোঁটের ছবি আঁকায় নাম করে সে-ই তোমার মুখের ছবি ঠিকমতো আঁকতে পারত। তোমার আগে আর কোনও মেয়ে ওই নামের উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি। ভেনাসের মতো তোমাদের আপেল দাবি করা উচিত আর ইভের মতো তোমাদের সে আপেল খেয়ে ফেলা উচিত। এইমাত্র তুমি আমার নামের কথা বলেছিলে এবং আমি তাতে কিছুটা অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু নামের শব্দার্থগুলো বড় ছলনাময়। আমার নাম ফেলিক্স, কিন্তু আমি সুখী নই। শব্দগুলো মিথ্যাবাদী, তাদের কথা বিশ্বাস করা উচিত নয়। মিস ডালিয়া, আমি যদি তুমি হতাম তা হলে আমি নিজেকে গোলাপ বলে চালাতাম। ফুলের যেমন গন্ধ থাকা উচিত, মেয়েদের তেমনি গুণ থাকা উচিত। ফাঁতিনে সম্বন্ধে আমি কিছু বলতে চাই না। সে বড় স্বপ্নালু আর সূক্ষ্ম চেতনাসম্পন্ন। তার চেহারাটা পরীর মতো হলেও তার অবনত বিষাদগ্রস্ত চোখ দুটো সন্ন্যাসিনীর মতো। শ্রমজীবিনী হলেও স্বপ্নের আয়নার মধ্যে ডুবে থাকে মনে মনে। সে স্বর্গের দিকে তাকিয়ে গান করে, প্রার্থনা করে, কিন্তু কী দেখে কী করে তা সে নিজেই জানে না। সে এমন এক বাগানে প্রায়ই চলে যায় যেখানে এত পাখি আছে যে বাস্তব কোনও জীবন বা জগতে তা নেই। আমি কী বলছি শোন ফাঁতিনে, আমি থেলোমায়েস, একটা মায়া মাত্র… কিন্তু সে শুনছে না, তার সোনালি স্বপ্নের মধ্যে ডুবে আছে। তার মধ্যে সব কিছুই সবুজ, সজীব, মেদুর, যৌবন আর প্রভাতী আলো। ফাঁতিনে, তোমার নাম রাখা উচিত ছিল মার্গারেট অথবা পার্ল। তুমি যেমন দূরপ্রাচ্যের ঐশ্বর্যশালিনী কোনও দেশের মেয়ে। আর একটা উপদেশের কথা শোন মেয়েরা, বিয়ে করো না তোমরা। কিন্তু একথা আমি কেন বলছি? কেন আমি আমার নিশ্বাস ক্ষয় করছি? বিয়ে ব্যাপারটাকে মেয়েরা কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারে না। জ্ঞানী ব্যক্তিরা যতই উপদেশ দিন না কেন, মেয়েরা যে কাজই করুক, বা যত গরিবই হোক, তারা শুধু এমন স্বামীর স্বপ্ন দেখে যে হীরে বোঝাই করে এনে তাদের কাছে ঢেলে দেবে। সে যাই হোক, তোমরা বড় বেশি চিনি খাও। তোমাদের যদি কোনও দোষ থাকে তো সে দোষ একটাই। তোমরা শুধু চঞ্চল মিষ্টি বস্তুমাত্র। তোমাদের ঝকঝকে দাঁতগুলো শুধু চিনি খেতে চায়। কিন্তু মনে রেখ, চিনি নুনের মতোই। নুন-চিনি দুটোই বেশি খেলে শরীরটাকে শুকিয়ে দেয়। শিরায় রক্তের চাপ বাড়িয়ে দেয়, রক্তের গতিবেগ বাড়িয়ে দেয়, রক্তকে জমাট বাঁধিয়ে দেয়। ফুসফুসেতে ঘায়ের সৃষ্টি করে। এইভাবে তা মানুষকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। বহুমূত্র থেকে যক্ষ্মরোগের সৃষ্টি হয়। সুতরাং হে ভদ্রমহিলারা, তোমরা চিনি খেয়ো না, দীর্ঘদিন জীবিত থাক।… এবার আমি পুরুষদের কথা বলব। হে ভদ্রমহোদয়গণ, তোমরা বিজয় অভিযান শুরু কর। তোমরা তোমাদের বন্ধুদের প্রেমিকাকে নির্মমভাবে ছিনিয়ে নাও। ঘুষি বা তরবারি চালিয়ে এগিয়ে যাও–প্রেমের ব্যাপারে বন্ধুত্ব বলে কিছু নেই। যেখানেই সুন্দরী নারী সেখানেই প্রকাশ্য যুদ্ধ, কোনও ক্ষমা নেই। সুন্দরী নারীরাই যত অনর্থের মূল, তারা কীটদষ্ট কুসুমের মতো। নারীর সৌন্দর্যই অনেক ঐতিহাসিক যুদ্ধের কারণ। নারীরা পুরুষদের বৈধ শিকার। যুদ্ধজয়ের পর রোমুলাস মেথাইন নারীদের বন্দি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ন্যান্ডির উইলিয়ম বহু স্যাক্সন নারীকে এবং সিজার রোমের বহু নারীকে ধর্ষণ করেন। যারা নিজেরা ভালোবাসা পায় না তারা শকুনির মতো অপরের প্রেমাস্পদের ওপর ভাগ বসাতে চায়। যেসব হতভাগ্য পুরুষের কোনও প্রেমিকা নেই, ইতালির সেনাদলের কাছে বলা বোনাপার্টের একটি কথার পুনরাবৃত্তি করে তাদের বলতে চাই আমি, সৈনিকগণ, তোমাদের কিছুই নেই, অথচ সৈনিকদের সব আছে।
