কোঁতে অ্যাঙ্গলের এই রিপোর্টের কথা বলে আমরা সেই আটজন যুবক-যুবতীর কাছে ফিরে যাব, যাদের আহারপর্ব বম্বার্দা হোটেলে সমাপ্তির পথে এগিয়ে চলেছিল।
.
৬
টেবিলের কোনও আলোচনা আর প্রেমিকদের আলোচনা হাওয়ার মতোই অলীক আর বিলীয়মান। প্রেমিকদের আলোচনা বা কথাবার্তা হল কুয়াশা, টেবিলের আলোচনা ক্ষণবিলীন এক সুবাস।
ফেমিউল আর ডালিয়া গুনগুন করে গান গাইছিল। থোলোমায়েস মদ খাচ্ছিল। জেফিনে হো হো করে হাসছিল, আর ফাঁতিনের মুখে ছিল মৃদু হাসি। লিস্তোলিয়েরের হাতে সেন্ট ক্লাউডে কেনা কাঠের যে জয়ঢ়াকটা ছিল সেটা সে বাজাচ্ছিল।
ফেবারিতে তার প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ব্ল্যাকিভেল, আমি তোমাকে দারুণ ভালোবাসি।
এ কথায় ব্ল্যাকিভেল এক প্রশ্ন করে বসল, আমি যদি তোমাকে আর ভালো না বাসি তা হলে তুমি কী করবে ফেবারিতে?
ফেবারিতে বলল, আমি? ঠাট্টা করেও এসব কথা বলবে না তুমি। যদি তুমি আমাকে ভালো না বাস তা হলে আমি তোমাকে ছাড়ব না, তোমার পিছু পিছু ঘুরব, আমি তোমাকে মারব। তোমার চোখ দুটো উপড়ে ফেলব; তোমাকে গ্রেপ্তার করাব।
ব্ল্যাকিভেল যখন কথাটা শুনে পুরুষোচিত অহঙ্কার আর আত্মতৃপ্তির হাসি হাসছিল, ফেবারিতে তখন আবার বলল, তুমি কী ভেবেছ, অসভ্য কোথাকার! আমি চেঁচামিচি করব, পাড়ার সব লোককে জাগাব।
ব্ল্যাকিভেল এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে আনন্দে চোখে দুটো বন্ধ করে কী ভাবছিল। ডালিয়া তখন খেতে খেতে ফেবারিতেকে চুপি চুপি কী একটা কথা জিজ্ঞাসা করল।
ডালিয়া বলল, সত্যি সত্যিই কি তুমি ওকে ভালোবাস?
ফেবারিতে হাতে কাঁটাটা তুলে নিয়ে তেমনি চাপা গলায় বলল, আমি ওকে মোটেই সহ্য করতে পারি না। ও বড় নীচ। আমি রাস্তার ওপারের একটা ছেলেকে ভালোবাসি। আমি কার কথা বলছি তুমি জান?
তাকে দেখলেই তুমি বুঝতে পারবে অভিনেতা হওয়ার জন্যই যেন জন্ম হয়েছে। তার। আমি অভিনেতাদের পছন্দ করি। রোজ রাত্রিতে সে বাড়ি ফিরে বাড়ির ছাদে গিয়ে এত জোরে গান গায় আর আবৃত্তি করে যে নিচের তলার সব লোক তা শুনতে পায়। সে একটা উকিলের কেরানি হিসেবে এখনই রোজ কুড়ি করে রোজগার করে। তার বাসা সেন্ট জ্যাকে একটা দলে সমবেত গান গাইত। ছেলেটা সত্যিই সুন্দর। সে আমাকে এত ভালোবাসে যে একদিন আমি যখন কেক তৈরি করার জন্য ময়দা মাখছিলাম তখন সে আমাকে বলল, তুমি যদি তোমার হাতের দস্তানা ছিঁড়ে দাও তা হলেও আমি তা খাব। একজন শিল্পীই এ কথা বলতে পারে। তার ব্যবহারটা সত্যিই বড় মিষ্টি। আমি তার জন্য পাগল। কিন্তু আমি ব্ল্যাকিভেলকে বলি আমি তাকে ভালোবাসি। আমি ভয়ঙ্কর মিথ্যাবাদী, তাই নয় কি?
ফেবারিতে কিছুক্ষণের জন্য থেমে আবার বলতে লাগল, আমার মনমেজাজ খুব খারাপ ডালিয়া। আমার জীবনে কোনও বসন্ত নেই, আছে শুধু বর্ষার অবিরল ধারা। যেন তার শেষ নেই। ব্ল্যাকিভেলের মনটা বড় ছোট, এদিকে বাজারে সব জিনিসেরই প্রচুর দাম। যেমন ধর মটরদানা, মাখন সব কিছু। যাই হোক, আমরা এখানে এসেছি, খাচ্ছি একটা ঘরে। ঘরের মধ্যে একটা বিছানা আছে। কিন্তু জীবনটা আমার কাছে বিতৃষ্ণ হয়ে গেছে।
.
৭
দলের কেউ কেউ গান গাইছিল, কেউ কেউ আবার জোরে কথা বলছিল। ঘরের ভেতর চলছিল তুমুল হট্টগোল। থোলোমায়েস এবার সকলকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
খোলোমায়েস বলল, এখন শান্ত হয়ে যুক্তির সঙ্গে কথা বল। এখন ভেবে দেখতে হবে জীবনে আমরা বড় হতে চাই কি না। হঠকারীর মতো যা-তা বলাতে আত্মশক্তিরই ক্ষয় হয়। ঘন ঘন মদ খেলে চিন্তাশক্তি বাড়ে না। তাড়াহুড়ো করে কোনও লাভ নেই দ্রমহোদয়গণ, এখন আমাদের এই আমোদ-প্রমোদের সঙ্গে মর্যাদাবোধের সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে, ক্ষুধার সঙ্গে সুবিবেচনার। বসন্তকাল থেকে আমরা একটা শিক্ষা পেতে পারি। বসন্ত যদি খুব তাড়াতাড়ি আসে এবং তাড়াতাড়ি খুব জোর গরম পড়ে যায় তা হলে অনেক ফলের ক্ষতি হয়। নিজের গরমে নিজেই পুড়ে ছারখানা হয়ে যায় বসন্ত। উদ্যমের আতিশয্য সুরুচিকে নষ্ট করে। অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করে খাওয়াও ভালো হয় না। এ বিষয়ে রেনিয়ের আর তালিবাদ একমত।
বাকি সবাই একযোগে প্রতিবাদ করে উঠল।
ব্ল্যাকিভেল বলল, আমাদের বিরক্ত কর না থোলোমায়েস।
ফেমিউল বলে উঠল, অত্যাচারীরা নিপাত যাক, আজ রবিবার।
লিস্তোলিয়ের বলল, আমাদের সকলেরই জ্ঞানবুদ্ধি আছে।
ব্ল্যাকিভেল বলল, হে আমার প্রিয় খোলোমায়েস, আমার শান্ত ভাবটা একবার দেখ।
থোলোমায়েস বলল, তুমি স্বয়ং মার্কুই দ্য মঁতকাম হয়ে উঠেছ।
মঁতকামের মার্কুই ছিলেন সে যুগের এক প্রখ্যাত রাজতন্ত্রবাদী। কথাটা ঠাট্টার ছলে বললেও তাতে কাজ হল। ব্যাঙডাকা কোনও জলাশয়ে ঢিল ছুঁড়লে যেমন ব্যাঙগুলো একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়, তেমনি সবাই চুপ করে গেল।
থোলোমায়েস শান্ত কণ্ঠে নেতা হিসেবে তার প্রভুত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য বলতে লাগল, শান্ত হয়ে আরাম করে বস বন্ধুগণ। ঠাট্টার ছলে যে কথাটা মুখ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে গেছে সেটাকে আর ধরো না। আকাশ থেকে ঝরে পড়া এইসব তুচ্ছ কথাগুলোকে কোনও গুরুত্ব দিতে নেই। ঠাট্টা-তামাশা হচ্ছে পলায়মান আত্মা থেকে ঝরে পড়া এক বস্তু। সেটা যে কোনও জায়গায় পড়তে পারে। তা যেখানেই পড়ুক এইসব চটুল রসিকতার বোঝা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মা তখন আকাশে উঠতে থাকে। পাহাড়ের মাথার উপর একটা সাদা দাগ দেখলে ঈগল কখনও তার উড়ে চলার কাজ। বন্ধ করে না। আমি যে ঠাট্টা বা রসিকতা ঘৃণা করি তা নয়। তাদের যেটুকু মূল্য আছে। আমি শুধু সেইটুকুই তাকে দিতে চাই; তার বেশি নয়। মানবজাতির মধ্যে অনেক মহাপুরুষ ও মহাজ্ঞানী ব্যক্তিরাও রসিকতা করতেন মাঝে মাঝে। যিশু একবার পিটারকে নিয়ে তামাশা করেছিলেন। মোজেস একবার আইজাককে নিয়ে ঠাট্টা করেছিলেন। এসকাইলাস পলিনিয়েস আর ক্লিওপেট্রা অক্টেভিয়াসকে নিয়েও তামাশা করেছিলেন। তবে আমরা দেখতে পাই অ্যাক্টিয়ামের যুদ্ধের আগে ক্লিওপেট্রা এই ঠাট্টার কথাটা না বললে আমরা তোরিনা নগরের কথাটা কেউ মনে রাখতাম না। তোরিনা শব্দটা এসেছে একটা গ্রিক শব্দ থেকে যার অর্থ হল কাঠের চামচ। যাই হোক, আমরা আবার আমাদের মূল কথায় ফিরে যাই। হে আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমি আবার বলছি, কোনও হৈ-হুল্লোড় বা হট্টগোল নয়, কোনও আতিশয্য বা উচ্ছৃঙ্খলতা, চপলতা নয়। আনন্দোৎসবের মত্ততায় আমাদের জ্ঞানবুদ্ধিকে বিসর্জন দিলে চলবে না। আমার কথা শোন, আমার কাছে অ্যাফিয়ারাসের বিজ্ঞতা আর বুদ্ধি আর সিজারের টাক। ঠাট্টা-তামাশা আর খাওয়া-দাওয়ারও একটা সীমা থাকা উচিত। মেয়েরা, তোমরা। আপেল ভালোবাস, কিন্তু এ নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। এখানেও সুমতি আর কলাকৌশলের ভূমিকা আছে। গোগ্রাসে সব কিছু গিলে অতি ভোজন করলে শাস্তি পেতে হয়। পাকস্থলীর ওপর নীতিবোধ চাপিয়ে দেবার জন্যই ঈশ্বর অজীর্ণ রোগের সৃষ্টি করেছিলেন। সুতরাং মনে রেখো, আমাদের সব আবেগানুভূতির, এমনকি প্রেমাবেগেরও একটা পাকস্থলী বলে জিনিস আছে যার গ্রহণক্ষমতার একটা সীমা আছে। যথাসময়ে সবকিছুর শেষে আমাদের ইতি’ লিখে দেওয়া উচিত। সংযমের রশ্মি দিয়ে কামনার বেগ। প্রবল হয়ে উঠলে তাকে টেনে ধরা উচিত। ক্ষুধার দরজা সময়ে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। অবস্থাবিশেষে আমরা অসংযত হয়ে উঠলে আমাদের নিজেদেরই বন্দি বা গ্রেপ্তার করা উচিত। যিনি কোন সময়ে কী করা উচিত সেটা জানতে পারেন তিনিই যথার্থ জ্ঞানী। আমার ওপর আস্থা স্থাপন করতে পার, কারণ আমি কিছুটা আইন পড়েছি, অন্তত পরীক্ষার ফল তাই বলে। কখন কী করতে হবে বা বলতে হবে তা আমি জানি। প্রাচীন রোমে পীড়নের পদ্ধতি সম্পর্কে আমি লাতিন ভাষায় এক গবেষণামূলক তত্ত্ব রচনা করেছি। আমি অল্পদিনের মধ্যে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করব। সুতরাং এর থেকে বোঝা যাবে আমি একেবারে অপদার্থ নই। আমি চাই তোমরা কামনা-বাসনার দিক থেকে নরমপন্থী হও এবং আমার মতে এটাই বিজ্ঞজনোচিত পরামর্শ। সেই মানুষই সুখী যে যথাসময়ে বীরের মতো কোনও জায়গায় প্রবেশ করে, আবার সময় হলে চলে যায়।
