ফেবারিতে মাঝে মাঝে বলছিল, কিন্তু সেই বিস্ময়ের চমকটা কোথায়?
থোলোমায়েস বলল, তোমাদের ধৈর্য ধরতে হবে।
.
৫
পাহাড়ের চূড়োয় উঠতে গিয়ে এবার ওরা কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তখনও ওদের দুপুরের খাওয়া হয়নি। এবার ওরা সবাই খাবার কথা বলতে লাগল। তখন ওরা শ্যাম্প এলিসি’র বিখ্যাত রেস্তোরাঁ বম্বার্দার একটি শাখা হোটেল ক্যাবারে বম্বার্দায় খেতে গেল। হোটেলটা ছিল র্যু দ্য রিভেলিতে।
সেদিন রবিবার বলে হোটেলটায় ছিল দারুণ ভিড়। সব ঘর লোকে ভর্তি। ওরা একটা বড় অপরিচ্ছন্ন ঘর পেল। ঘরটার একপ্রান্তে পার্টিশান করা একটা ছোট ঘর ছিল। তার মধ্যে একটা বিছানা ছিল। ঘরের মধ্যে দুটো টেবিলের ধারে কয়েকটা চেয়ার ছিল। ওরা চারজন সেই চেয়ারগুলোতে বসল। দুটো ভোলা জানালা দিয়ে এলম গাছের ফাঁক দিয়ে নদী দেখতে পেল ওরা। তখন আগস্ট মাস। বিকাল সাড়ে চারটে বাজে। সূর্য সবেমাত্র অস্ত যেতে শুরু করেছে। টেবিলের উপর খাবার ও মদ দেওয়া হল। প্রচুর হৈ-হুল্লোড় করতে লাগল ওরা।
শ্যাম্প এলিসিতে তখনও সূর্যের আলো ছিল। জনাকীর্ণ পথে ধুলোর ঝড় উঠছিল। পথে অনেক ঘোড়ার গাড়ি যাওয়া-আসা করছিল। অ্যাভেনিউ দ্য নিউলি দিয়ে একদল সৈন্য চলে গেল। তাদের সামনে একদল বাদক জয়ঢাক বাজিয়ে যাচ্ছিল। তুলিয়েরের প্রাসাদের চূড়ার উপর উড়তে থাকা সাদা পতাকাটা অস্তম্লান সূর্যের ছটায় গোলাপি দেখাচ্ছিল। প্লেস দে লা কঙ্কর্দে তখন লোকের দারুণ ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যে অনেকে কোটের বোতামে সাদা ফিতেয় জড়ানো রুপোর ফুল খুঁজে বেড়াচ্ছিল। এখানে-সেখানে একদল করে ছোট ছোট মেয়ে দর্শকদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে বুর্বন গাইছিল।
রবিবারের পোশাক পরা অনেক শ্রমিক বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে ভিড় করেছে শহরের পথে। তাদের অনেকে মদ পান করছিল, কেউ কেউ ঘোড়ায় চেপে বেড়াচ্ছিল। সকলেই হাসিখুশিতে মেতে উঠেছিল। তখন দেশে শান্তি বিরাজ করছিল। রাজতন্ত্রীদের পক্ষে সময়টা ছিল বেশ নিরাপদ। পুলিশের বড়কর্তা কাউন্ট অ্যাঙ্গলে রাজার কাছে প্যারিসের শ্রমিক ও সাধারণ জনগণ সম্বন্ধে এক গোপন রিপোর্ট পেশ করেন। সে রিপোর্টে বলা হয়, মহাশয় সব দিক বিবেচনা করে দেখলে বোঝা যায়, এইসব জনগণ থেকে ভয়ের কিছু নেই। তারা যেমন উদাসীন তেমনি বিড়ালের মতো অলস। গ্রামাঞ্চলের নিচের তলায় মানুষরা কিছুটা বিক্ষুব্ধ আছে, কিন্ত প্যারিসের জনগণের মধ্যে কোনও বিক্ষোভ নেই। তাদের চেহারাগুলোও বেঁটেখাটো এবং তারা দু জনে একজন পুলিশের সমকক্ষ হতে পারে। রাজধানী প্যারিসের শ্রমিকশ্রেণির কাছ থেকে আমাদের ভয়ের কিছু নেই। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই যে, গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে প্যারিস ও শহরতলির জনগণের চেহারা বিপ্লবের আগে যা ছিল তার থেকে অনেক খারাপ হয়ে গেছে। তারা মোটেই বিপজ্জনক নয়। এক কথায় তারা বড় উদাসীন, কোনও কিছুরই খেয়াল রাখে না।
কিন্তু কোনও পুলিশের বড়কর্তাই বিশ্বাস করে না যে বিড়ালও সিংহ হতে পারে। পুলিশের বড় কর্তারা যাই বলুক প্যারিসে অনেক কিছুই ঘটে। এটাই হচ্ছে প্যারিসের জনমতের রহস্য। তাছাড়া কিছুকাল আগে প্রজাতন্ত্রীরা এই বিড়ালদেরই স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধার চোখে দেখত। এই ধরনের এক বিড়ালেরই এক বিরাট ব্রোঞ্জমূর্তি কোরিনথের মেন স্কোয়ারে পিরেউসের মিনার্ভার মূর্তির অনুকরণে দাঁড়িয়ে আছে। রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর পুলিশ প্যারিসের জনগণ সম্বন্ধে অতিমাত্রায় আশাবাদী হয়ে ওঠে। কিন্তু প্যারিসের সাধারণ জনগণ মোটেই ঢিলেঢালা বা উদাসীন প্রকৃতির নয়। ফরাসিদের কাছে প্যারিসের অধিবাসীরা গ্রিকদের কাছে এথেন্সের জনগণের মতো। উপর থেকে তাদের দেখে মনে হবে তাদের মতো এত ঘুমোতে কেউ পারে না, কেউ এত তাদের মতো উচ্ছৃঙ্খল এবং অলস প্রকৃতির নয়। কিন্তু এ ধারণা স্পষ্ট ভ্রান্ত। তারা উদাসীনও উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। কিন্তু যখন কোনও বৃহত্তর গৌরব অর্জনের জন্য তাদের ডাক পড়বে তখন এক প্রচণ্ড সংগ্রামশীলতায় আশ্চর্য ও অভাবনীয়ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠবে তারা। প্যারিসের কোনও একটা লোক হাতে একটা বর্শা পেলে সে ১০ আগস্টের যুদ্ধের অবতারণা করতে পারে আর যদি সে একটা বন্দুক পায় তা হলে অস্টারলিৎসের যুদ্ধ বাধিয়ে তুলতে পারে। এই প্যারিসের লোকই ছিল নেপোলিয়ঁনের সাম্রাজ্য বিস্তারের মূল শক্তি, তারাই ছিল বিপ্লবী দাঁতনের মূল ভিত্তি। লা পার্টির ডাকে তারা সেনাবিভাগে যোগ দেয় দলে দলে। স্বাধীনতার ডাকে তারা পদভরে রাজপথ ও ফুটপাতগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সুতরাং সাবধান। রাগে তাদের মাথার চুল একবার খাড়া হয়ে উঠলে তারা এক মহাকাব্যসুলভ বীরত্ব লাভ করে, তাদের সামান্য জামাগুলো গ্রিক বীরের সামরিক পোশাক বা বর্মে পরিণত হয়। তাদের গণ-অভ্যুত্থান গদিন কোর্কের যুদ্ধের রূপ নেয়। যুদ্ধজয়ের ঢাকের শব্দে শহরের অলি-গলিতে বাস করা অধিবাসীরা এক মহাশক্তিতে সঞ্জীবিত হয়ে ওঠে। বেঁটেখাটো লোকগুলোর চোখের দৃষ্টি ভয়ঙ্কর ভাব ধারণ করে। তাদের সংকীর্ণ বুকগুলো থেকে বেরিয়ে আসা নিঃশব্দ নিশ্বাসগুলো এক মত্ত প্রভঞ্জনের রূপ পরিগ্রহ করে দিগন্তপ্রসারী আল্পস পর্বতের চূড়াটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চায়। প্যারিসের এইসব ছোটখাটো লোকগুলোকে ধন্যবাদ, এদের দ্বারা সংঘটিত বিপ্লবই সেনাবাহিনীকে অনুপ্রাণিত করে সারা ইউরোপ জয় করে একদিন। তারা যুদ্ধের গানে আনন্দ পায়। সে গানের সুর আর ছন্দ তাদের প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খায়। কারমাগনোল’ গান গেয়ে তারা যোড়শ লুই-এর সিংহাসন উল্টে দেয় আর মার্সেলাই’ গান গেয়ে সারা পৃথিবীকে মুক্ত করতে পারে।
