অনেক সময় ভালোবাসা ভুল হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু ফাঁতিনের নিষ্পাপ মনের সততা সে ভুলকে অতিক্রম করে চলছিল স্বচ্ছন্দে।
.
৪
সেদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উজ্জ্বল সূর্যালোকের প্লাবন বয়ে যেতে লগাল। মনে হচ্ছিল সমস্ত প্রকৃতি যেমন ছুটির আনন্দে ঢলে পড়েছে। সেন্ট ক্লাউডের প্রান্তর থেকে ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। নদীতীরের বাতাসে গাছপালার শাখাগুলো দুলছিল। মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে বেড়াচ্ছিল ফুলে ফুলে। যুঁই, ওট, মিলকয়েল প্রভৃতি ফুলের উপর প্রজাপতিরা উড়ে বেড়াচ্ছিল দল বেঁধে। এদিকে ফ্রান্সের রাজার পার্কটাকে কোথা থেকে একদল যাযাবার পাখি এসে দখল করে বসেছিল।
প্রকৃতির এই সুন্দর পরিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল যেন আটজন যুবক-যুবতী। তারা নাচছিল, গান করছিল, প্রজাপতিদের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছিল, বনফুল তুলে আনছিল, যখন-তখন এ ওকে চুম্বন করছিল। একমাত্র ফাঁতিনে ছিল এর ব্যতিক্রম। এক সলজ্জ স্বপ্নবরণের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে সে হয়তো তার প্রেমের কথা ভাবছিল। ফেবারিতে তাকে একবার বলল, তুমি কারও পানে না তাকালেও তোমাকে সবাই সব সময় দেখে।
এই হল জীবনের আনন্দ। ক্ষণপ্রণয়িত এক আনন্দের তাৎক্ষণিক আবেশে মত্তবিভোর চারজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা পর্যাপ্ত আলো আর উষ্ণতায় মণ্ডিত এক উদার প্রকৃতির প্রাণবন্ত আহ্বানে সাড়া দিতে ছুটে এসেছে এখানে। হয়তো কোনও বিস্মৃত অতীতে কোনও এক পরী এইসব মাঠ-বনকে শুধু যুবক-যুবতীর অন্তরের সামনে নিজেদের উন্মুক্ত করে দেবার জন্য আদেশ দিয়ে গেছে। সেই পরীকে অশেষ ধন্যবাদ, তার জন্যই আজও মুক্ত আকাশের তলে বৃক্ষছায়া দ্বারা আলিঙ্গিত প্রান্তরে প্রেমিক-প্রেমিকারা দল বেঁধে ছুটে আসে। যতদিন আকাশ, প্রান্তর আর গাছ থাকবে, যতদিন নীল আকাশ থেকে অবারিত আলোর চুম্বন ঝরে পড়বে এই প্রান্তরে, যতদিন এইসব বৃক্ষরাজি তাদের স্পর্শশীতল ছায়ার দ্বারা আলিঙ্গন করবে এইসব প্রান্তরকে ততদিন এখানে ছুটে আসবে এই ধরনের প্রেমিক-প্রেমিকার অসংখ্য দল।
এইজন্যই হয়তো বসন্তকালের এত জনপ্রিয়তা। সামন্ত থেকে বালকভৃত্য, জমিদার থেকে চাষি-ক্ষেতমজুর, সভাসদ থেকে সাধারণ শহরবাসী সকলেই এই বসন্তরূপ মায়াবিনী পরীর দ্বারা বিছিয়ে দেওয়া মোহের আবেশে আচ্ছন্ন হয়। কোর্টের সামান্য মুহুরিও যেন স্বর্গের দেবতা হয়ে ওঠে। তারা হাসির স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়, বাতাসের মধ্যে কিসের যেন খোঁজ করে বেড়ায় পাগলের মতো, যেন এক রহস্যময় রূপান্তর ঘটে তাদের প্রেমবিগলিত অন্তরে। ঘাসের উপর হৈ-হুল্লোড় করতে করতে ছুটে বেড়ানো, পরস্পরের কোমর ধরাধরি করা, গানের ছন্দভরা অর্ধস্ফুট কথার গুঞ্জন, পরস্পরের মুখে মুখে চেরি ফলের আনাগোনা আরও কত কী যে সব করে তারা, তার ইয়ত্তা নেই। এই সময় মেয়েরা হাসিমুখে বিলিয়ে দেয় নিজেদের এবং ভাবে এই সুখ চিরস্থায়ী হবে। দার্শনিক, কবি ও শিল্পীরা প্রেমিক-প্রেমিকাদের এই উন্মাদসুলভ আবেগ আর আচরণের একটা মানে খোঁজার চেষ্টা করেন, কিন্তু বুঝতে না পেরে হতবুদ্ধি হয়ে যান। লানস্ৰেত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদেরও আকাশে উড়তে দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন। দিদেররা সব হালকা প্রেমকেই দু হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানান।
আটজন যুবক-যুবতী প্রাতরাশের পর রাজার বাগান দেখতে গেল। সে বাগানে ভারত থেকে একটি বিরল গাছের চারা এসেছে। তার নামটা ভুলে গিয়েছি। তা দেখার জন্য সমস্ত প্যারিসের লোক ভিড় করেছে সেন্ট ক্লাউডে। গাছটা লম্বা একটা সুন্দর ঝোঁপের মতো দেখতে যার কোনও ডালপালা বা পাতা নেই, যার সুতোর মতো শাখাগুলোতে ছোট ছোট সাদা ফুল ফোটে। মনে হয় সাদা ফুলে ভরা একমাথা চুল। একরাশ মুগ্ধ জনতার ভিড় গাছটাকে ঘিরে ছিল সব সময়।
থোলোমায়েস প্রস্তাব করল, গাধার পিঠে চড়ে খানিকটা বেড়াব আমরা।
তখন কয়েকটা গাধা জোগাড় করে বানব্রে থেকে আইসি গেল ওরা।
আইসিতে একটা ঘটনা ঘটল। পার্কের মতো যে ঘেরা বাগানটা ওরা দেখতে গেল সেটা তখন সৈন্যবিভাগের খাবার পরিবেশনকারী কুঁগুই-এর অধীনে ছিল। বাগানের লোহার গেটটা তখন ভোলা ছিল। ওরা গেট দিয়ে পার্কের মধ্যে প্রথমে অ্যাঙ্কোরিতের প্রতিমূর্তিটা দেখল। তার পর সেই বিখ্যাত আয়নার ঘরটা দেখল যে ঘরে ঢুকলে সবারই মুখগুলো বিকৃত দেখায়। এরপর ওরা বাদামগাছে ঘেরা বড় দোলনাটায় পালাক্রমে দুলল। দোলনায় দুলবার সময় হাসিতে ফেটে পড়ছিল ওরা। তুলু থেকে আসা থোলোমায়েসের স্বভাবটায় স্প্যানিশ ভাবটা তখনও পুরোমাত্রায় ছিল। সে মনের সুখে একটা গান ধরল। গানটার অর্থ হল, আমি বাজাজ থেকে এসেছি। প্রেমই আমায় ডেকে এনেছে এখানে। আমার আত্মা এখন আমার চোখের তারায় এসে ফুটে উঠেছে, কারণ তুমি তোমার পা দেখাচ্ছ আমায়।
একমাত্র ফাঁতিনেই দোলনায় দুলল না।
ফেবারিতে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল, আমি কোনও লোকের অহঙ্কার দেখতে পারি না।
গাধায় চড়ার শখ মিটলে ওরা একটা নৌকো ভাড়া করে পাসি থেকে ব্যারিয়ের দ্য লেতয়েনে গেল। ওরা সকাল পাঁচটায় বেরিয়ে সারাদিন এখানে-ওখানে ছোটাছুটি করছে। তবু ওরা ক্লান্ত হয়ে ওঠেনি। ফেবারিতে বলল, রবিবারে ক্লান্তি বলে কোনও কথা নেই। রবিবারে কেউ ক্লান্ত হয় না কখনও। ওরা রু বুর্জোর উঁচু জায়গাটায় দাঁড়িয়ে দূরে গাছপালার মাথায় শ্যাম্প এলিনার চূড়াটা দেখতে পেল।
