সেদিন তারা সকাল পাঁচটায় উঠেছিল। তারা ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রথমে সেন্ট ক্লাউতে গিয়ে পৌঁছয়। সেখানে জল দেখে তারা আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। তেতিনয়েরে তারা প্রাতরাশ খেয়ে ইচ্ছামতো দৌড়ঝাঁপ করে বেড়াতে থাকে। তারা পুকুরে সাঁতার কাটে, গাছে চড়ে, জুয়ো খেলে, ফুল তোলে, ক্রিমপাফ কেনে এবং গাছ থেকে আপেল পেড়ে খায়।
পিঞ্জরমুক্ত পাখির মতো মেয়েরা হাসিখুশিতে উজ্জ্বল হয়ে বেড়াতে থাকে। তারা পুরুষদের টীকা-টিপ্পনী কেটে ঠাট্টা-তামাশা করতে থাকে। এ হল প্রথম যৌবন-জীবনের উন্মত্ততা, কতকগুলি অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সমষ্টি, এ যেন কতকগুলি বড় বড় মাছির রঙিন ডানার উচ্ছ্বসিত কম্পন। প্রথম যৌবনের এইসব কথা কি তোমাদের কারও মনে নেই? তোমরা কি কেউ কখনও কোনও সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে হাত ধরাধরি করে ঝোপে-ঝাড়ের বা কোনও জলাশয়ের ধারে বেড়াওনি? পথের ছোটখাটো বাধা-বিপত্তি কখনও এইসব প্রমোদাভিলাষী দলের কারও মনে কোনও বিরক্তি উৎপাদন করতে পারেনি। ফেবারিতে একবার অবশ্য তাদের সাবধান করে দিয়েছিল, পথে ওই যে খোলাহীন শামুক দেখা যাচ্ছে, এটা হচ্ছে বৃষ্টি আসার লক্ষণ।
মেয়ে চারজনের দেহসৌন্দর্য আর বেশভূষা ছিল সত্যিই মনোমুগ্ধকর। তারা সেন্ট ক্লাউডে বাদামগাছের তলায় সকাল ছ’টার সময় যখন বেড়াচ্ছিল তখন একজন বয়স্ক কবি তাদের দেখে অবাক হয়ে যান। মেয়েদের মধ্যে সবার বড় এবং ব্ল্যাকিভেলের বান্ধবী তেইশ বছরের ফেবারিতে সাবার আগে আগে গাছগুলোর তলা দিয়ে যাচ্ছিল। যত সব খাল-নালা ডিঙিয়ে ঝোঁপঝাড়ের পাশ কাটিয়ে একরকম নাচতে নাচতে পথ হাঁটছিল আর সবাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। জেফিনে আর ডালিয়া দু জনে ঘন হয়ে পাশাপাশি পথ হাঁটছিল। একে অন্যের সম্পূরক হিসেবে ইংরেজি আদব-কায়দা দেখাচ্ছিল। তখন মেয়েদের মাথার চুল কুঞ্চিত করার রীতি প্রথম প্রচলিত হয়। বায়রন। সুলভ এক ভাবময় বিষাদে স্বেচ্ছায় গা ঢেলে দেওয়ার এক রীতিও শিক্ষিত মেয়েদের সমাজে প্রচলিত ছিল। পরে এ বিষাদ ইউরোপের শিক্ষিত পুরুষদের পেয়ে বসে। জেফিনে আর ডালিয়া তাদের পোশাক আঁট করে পরেছিল। লিস্তোলিয়ের আর ফেমিউল তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সম্বন্ধে কী সব আলোচনা করছিল। তারা ফাঁতিনেকে আইনের অধ্যাপক মঁসিয়ে ডেলভিনকোট ও মঁসিয়ে ব্লোদের মধ্যে কী নিয়ে ঝগড়া হয় তা বোঝাচ্ছিল। ব্ল্যাকিভেল সমানে ফেবারিতের গায়ের শালটা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল। যেন এই কাজের জ্যই তার জন্ম হয়েছে পৃথিবীতে।
দলের নেতা হিসেবে তখনও সবার পেছনে ছিল থেলোমায়েস। সে রসিক ছিল, কিন্তু তার রসিকতার মাঝে নেতৃত্বসুলভ এক গাম্ভীর্য ছিল। তার কথা সবাই মানতে বাধ্য হত। তার পোশাক বলতে ছিল একটা ঢিলা পায়জামা, আর একটা শার্ট। হাতে ছিল একটা ছড়ি আর মুখে একটা চুরুট। তার সঙ্গীরা বলাবলি করত, ওই পায়জামা পরলে থোলোমোয়েসকে সত্যিই অসাধারণ দেখায়।
ফাঁতিনে ছিল আনন্দের প্রতিমূর্তি। তার সাদা সুন্দর দাঁতগুলো যেন হাসির জন্য সৃষ্টি হয়েছিল। তার হাতে সব সময় থাকত সাদা ফিতেওয়ালা একটা খড়ের তৈরি বনেট। তার মাথায় সোনালি চুলের রাশগুলো প্রায়ই ছড়িয়ে পড়ত মাথার চারদিকে। তার ঠোঁট দুটো সব সময় ভোলা থাকত আনন্দের আবেগে। তার মুখের কোণ দুটো যেমন একদিকে কোনও উদ্ধত যুবকের অগ্রপ্রসারী প্রেমোচ্ছ্বাসকে আহ্বান করছিল অন্যদিকে তেমনি তার চোখের বড় বড় অবনত পাতাগুলো এক অব্যক্ত বিষাদ ছড়িয়ে সেই ঔদ্ধত্যকে খর্ব করার প্রয়াস পাচ্ছিল। তার পোশাক ও বেশভূষার মধ্যে একই সঙ্গে এক মিষ্টি গানের ছন্দ আর শীতল আগুনের শিখা অদৃশ্য অবস্থায় বিরাজ করছিল অপর তিনজনের পোশাক মাঝামাঝি ধরনের ছিল। তাতে কোনও পারিপাট্যের আতিশয্য ছিল না। সব মিলিয়ে ফাঁতিনের চেহারাটার মধ্যে একই সঙ্গে এক সংযমের শাসন আর উদ্ধত প্রেমের ছলনা লুকিয়ে ছিল। অনেক সময় মানুষের নির্দোষিতার মূলে থাকে কৃত্রিমতার একটা প্রয়াস, জোর করে ভালো হবার একটা সচেতন চেষ্টা।
হাসিখুশিতে উজ্জ্বল মুখ, সুন্দর চেহারা, ভারী ভারী পাতাওয়ালা নীল চোখের গভীর চাউনি, ঈষৎ ধনুকের মতো বাঁকা পা, সুঠাম গঠন, সাদা ধবধবে গায়ের মাঝে দু’একটা নীল শিরার উঁকিঝুঁকি, যৌবনলাবণ্যপুষ্ট গাল, ঈজিয়ার জুনোর মতো ঋজু ঘাড়, জামার ফাঁকে ফাঁকে দেখতে পাওয়া কোনও এক নামকরা ভাস্করদের গঠিত মূর্তির মতো সুন্দর দুটো কাঁধ–এই হল ফাঁতিনের দেহের মোটামুটি বিবরণ। আত্মসচেতনতার দ্বারা সংযত, আনন্দোশ্রুল্লতায় সঞ্জীবিত এক সুন্দর প্রতিমা।
আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হলেও নিজের সৌন্দর্য সম্বন্ধে কোনও অহঙ্কার ছিল না ফাঁতিনের। কোনও সৌন্দর্যের উপাসক যিনি সকল দেহসৌন্দর্যের মধ্যে এক নিখুঁত পরিপূর্ণতার সন্ধান করেন তিনি হয়তো ফাঁতিনেকে দেখে তার চেহারার মধ্যে কোনও কোনও খুঁত ধরার চেষ্টা করবেন। আবার তিনি হয়তো তার মধ্যে এক প্রাচীন সৌন্দর্যরীতি ও সামঞ্জস্যের সুষমা খুঁজে পাবেন। সৌন্দর্যের দুটি দিক আছে–রূপাবয়ব আর ছন্দ। রূপাবয়ব হচ্ছে আদর্শ আঙ্গিক বা আধার, আর ছন্দ হচ্ছে গতি।
আমরা আগেই বলেছি ফাঁতিনে ছিল আনন্দের প্রতিমূর্তি। কিন্তু সেই সঙ্গে শালীনতাবোধ, নারীসুলভ গুণশীলতারও কোনও অভাব ছিল না তার মধ্যে। কেউ যদি খুঁটিয়ে তাকে দেখত তা হলে বুঝতে পারত তার যৌবনের উন্মাদনার অন্তরালে নববসন্ত আর ফুল্লকুসুমিত এক প্রেমের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আত্মস্বাতন্ত্রের এক অজেয় দুর্গও ছিল। জীবনে প্রথম প্রেমের ঘটনায় সে ক্ষণে ক্ষণে অনুভব করত এক অপার বিস্ময়ের চমক আর নির্দোষিতাজনিত এক অবুঝ আশঙ্কা, যে আশঙ্কার দ্বারা সাইককে ভেনাস থেকে সহজে পৃথক করা যায়। তার সরু সরু লম্বা আঙুলগুলো যেন কোনও কুমারী সন্ন্যাসিনীর মালার জপ করার ভঙ্গিতে মৃদু সঞ্চালিত হত, মনে হত সেগুলো যেন এক পবিত্র অগ্নিশিখার অন্তরালে ভস্মাচ্ছাদিত এক একটি স্বর্ণদণ্ড। যদিও থোলোমায়েসকে তার অদেয় কিছুই ছিল না, তবু সে মাঝে মাঝে যখন গম্ভীর হয়ে উঠত, যখন সংযমশাসিত কুমারীত্বের কঠোর একটা ভাব ফুটে উঠত তার চোখে-মুখে, গভীর অনমনীয় এক আত্মমর্যাদাবোধ আচ্ছন্ন করে ফেলত তাকে, যখন তার যৌবনজীবনের সকল আনন্দোচ্ছলতা ত্যাগ আর আত্মনিগ্রহের অগ্রপ্রসারী আক্রমণে অভিগ্রস্ত হয়ে পড়ত সহসা তখন দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে উঠত যে কেউ। সেই মুহূর্তে তাকে দেখে মনে হত সে যেন রোষকষায়িতলোচনা নিষ্করুণ কোনও দেবী। তখন তার কপাল, নাক ও চিবুকে এমন সব রেখা ফুটে উঠত যাতে তার সমগ্র মুখমণ্ডলের ভারসাম্য নষ্ট হত, আর সঙ্গে সঙ্গে তার নাক আর উপরকার ঠোঁটের মাঝখানে অপরিদৃশ্যপ্ৰায় এমন এক সুন্দর কুঞ্চন দেখা দিত যা সতীত্বের এক দুর্বোধ্য নিদর্শন, যা দেখে একদিন, আইকোনিয়ামের ধ্বংসাবশেষের মাঝে বার্বাডোসা ডায়েনার প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছিল।
