ফাঁতিনে ছিল সমাজের নিচুতলার মানুষদের একজন। অবজ্ঞা আর অপরিচয়ের অপরিসীম কলঙ্ক সারা গাঁয়ে মেখে সে উঠে আসে এক নারকীয় সমাজের গভীরতম প্রদেশ থেকে। তার জন্মপরিচয়, বাবা-মা কিছুই জানত না সে। মন্ত্রিউল সুর-মের নামক এক জায়গায় তার জন্ম হয়, কিন্তু কে তার বাবা-মা তা সে জানত না। তার কোনও ঘরবাড়ি ছিল না বলে বাড়ির দেওয়া কোনও নাম ছিল না। সে যুগে চার্চ ছিল না বলে জন্মের পর চার্চে তার কোনও ধর্মীয় নামকরণ হয়নি। সুদূর শৈশবে একদিন সে যখন রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে ছুটতে ছুটতে কোথায় যাচ্ছিল তখন এক পথচারী তাকে দেখে তার নাম দেয় লা পেতিত ফাঁতিনে। সেই নামটাকেই সে মেনে নেয়, মাথার উপর ঝরে পড়া বৃষ্টিকে যেমন মেনে নেয় মানুষ। তার নাম লা পেতিত ফাঁতিনে নিজের সম্বন্ধে সে শুধু এইটুকুই জানে। এর বেশি কিছু না। তার বয়স যখন দশ তখন সে শহর ছেড়ে কাছাকাছি এক গাঁয়ের খামারে কাজ করতে যায়। পনেরো বছর বয়সে সে ভাগ্যান্বেষণে যায় প্যারিসে। সে ছিল দেখতে সুন্দরী। যতদিন পেরেছিল সে তার কুমারী জীবনের শুচিতাকে রক্ষা করে এসেছিল। তার মাথার চুলগুলো ছিল সোনালি আর দাঁতগুলো ছিল মুক্তোর মতো সাদা ঝকঝকে। সোনা আর মুক্তো দিয়ে ভূষিত ছিল সে। কিন্তু সোনা ছিল তার মাথায় আর মুক্তো ছিল তার দাতে।
বাঁচার জন্য কাজ করত সে এবং বাঁচার জন্যই সে যেন প্রেমে পড়ে। কারণ পেটের মতো অন্তরেরও একটা ক্ষিদে আছে। সে ক্ষিদে মেটাবার জন্যই সে যেন থোলোমায়েসের প্রেমে পড়ে।
থোলোমায়েসের কাছে ভালোবাসার ব্যাপারটা ছিল জীবনের এক চলমান ঘটনা। কিন্তু ফাঁতিনের কাছে ভালোবাসাই ছিল জীবন।
লাতিন কোয়ার্টারে যেখানে ছাত্রাবাস ছিল সেখানেই ফাঁতিনের প্রথম প্রেমের জন্ম হয়। তার স্বপ্নের ফুল সেখানেই প্রথম ফোটে। প্যানথিয়নের যে পাহাড়ে অনেক ছেলেমেয়ে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ ও মুক্ত হয় সে পাহাড়ে কিছুদিনের জন্য থোলোমায়েসের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল ফাঁতিনে। কিন্তু তবু সে পাহাড় থেকে থেলোমায়েসকে দেখার চেষ্টা করত। অনেক সময় মানুষ ছুটে পালিয়ে যায় কাউকে অনুসরণ করার জন্য। ফাঁতিনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।
চারজন যুবকের মধ্যে থোলোমায়েস ছিল সবচেয়ে প্রাণবন্ত আর হাসিখুশিতে ভরা।
ছাত্র হিসেবে থোলোমায়েসের চালনচলন ছিল পুরনো ধাঁচের। সে ছিল ধনী পরিবারের ছেলে। তার বার্ষিক আয় চার হাজার ফ্রাঁ। তার বয়স ছিল তেইশ। কিন্তু এই বয়সেই তার গায়ের চামড়ায় কোঁচকানো দাগ পড়েছিল। মাথার একটা জায়গায় টাক পড়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কিছুই মনে করত না সে। সে বলত, তিরিশ বছরে টাক পড়েছে, চল্লিশ বছরে হাঁটু গেড়ে গেড়ে চলতে হবে। তার হজমশক্তি ভালো ছিল না। একটা চোখে কম দেখত। কিন্তু তার এই বিগতপ্রায় যৌবনের জন্য কোনও দুঃখ না করে বরং তা নিয়ে আনন্দোচ্ছল হয়ে উঠত। তার ভাঙা দাঁত, পড়া চুল আর ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে সে নিজেই হাসি-তামাশা করত। মোট কথা, তার যৌবনহানির ব্যাপারটাকে হাসিমুখে সানন্দে মেনে নিয়েছিল সে। সে একটা নাটক লিখেছিল। কিন্তু বদেভিলের থিয়েটার সে নাটক মঞ্চস্থ করতে চায়নি। মাঝে মাঝে কবিতা লিখত সে। তাছাড়া তার চারপাশের সবাইকে ছোট ভাবত। কারও কোনও গুণকে স্বীকার করত না। তার মাথায় টাক ছিল আর সবার সব কিছু সমালোচনা করত বলে সে সহজেই নেতা হয়ে গিয়েছিল যুবকদলের। সবার ওপর প্রভুত্ব করত।
একদিন থোলোমায়েস তার বন্ধুদের আড়ালে এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাদের বলল, প্রায় এক বছর ধরে তিনে, জেফিনে আর ফেবারিতে তাদের একবার চমক লাগিয়ে দেবার জন্য বলছে আমাদের। আমরাও তাদের তা দেব বলে কথা দিয়েছি। তারা কথাটা আমাদের বরাবর বলে আসছে। বিশেষ করে আমাকে। নেপলস-এর মেয়েরা সেন্ট জেভিয়েরকে একবার বলেছিল, কই হলুদমুখো, তোমার মাছ দেখাও। তেমনি ওরাও আমাকে বলে, কই খোলোমায়েস, তোমার চমক কোথাও। তা দেখাও। এখন আমরা বাড়ি থেকে বাবা-মা’র চিঠি পেয়েছি। দু’দিক থেকেই আমরা বিব্রত। আমার মনে হয় এবার আমাদের সময় এসেছে। এখন ব্যাপারটা আমাদের ভেবে দেখতে হবে।
থোলোমায়েস এবার তার গলার স্বরটা নিচু করে তাদের কী বলতেই তারা সবাই জোর হাসিতে ফেটে পড়ল। ব্ল্যাকিভেল চিৎকার করে বলে উঠল, চমৎকার পরিকল্পনা!
পরদিন ছিল রবিবার। চারজন যুবক আর চারজন যুবতী এক প্রমোদভ্রমণে বেরিয়ে গেল।
.
৩
আজ হতে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে কয়েকজন ছেলেমেয়ে মিলে কোনও গ্রামাঞ্চল দিয়ে বেড়াতে গেলে কী ধরনের ব্যাপার হত তা আজকের দিনে কল্পনা করা কঠিন। আজকাল প্যারিস শহরের প্রান্তে বেড়াতে যাবার মতো কোনও গ্রামাঞ্চল নেই। আজকাল ঘোড়ার সেই ডাকগাড়ির পরিবর্তে লোকে রেলগাড়িতে চড়ে অথবা জলপথে স্টিমবোটে করে বাইরে যায়। ১৮৬২ সালে সারা ফ্রান্সের মধ্যে প্যারিসই ছিল একমাত্র শহর, আর সব শহরতলি।
আটজন ছেলেমেয়ে শহর থেকে দূর গ্রামাঞ্চলে গিয়ে তখনকার দিনে যত রকমের গ্রাম্য আমোদ-প্রমোদ প্রচলিত ছিল তাতে স্বেচ্ছায় গা ঢেলে দিয়ে মত্ত হয়ে উঠল। আর গ্রীষ্মের ছুটি সবে মাত্র শুরু। উষ্ণ উচ্ছৃঙ্খল গ্রীষ্মের দিন। আগের দিন চারজন মেয়ের পক্ষ থেকে থোলোমায়েসকে একখানি চিঠি লিখে পাঠায় ফাঁতিনে। কারণ সে-ই একমাত্র লিখতে পারত। তাতে লেখে ‘সেই বড় চমকের জন্য খুব সকালে উঠতে হবে।’
