১৮১৭ সালে প্যারিসের চারজন যুবক হাস্যকৌতুকে বিশেষ নাম করে।
.
২
তুলুজ, লিমোজে, ক্যাহর আর মঁতাবাঁ থেকে চারজন ছাত্র প্যারিসে পড়তে আসে। তারা ছিল বছর কুড়ি বয়সের সাধারণ যুবক। মোটামুটি ধরনের দেখতে। তাদের সম্বন্ধে ভালো বা মন্দ, পণ্ডিত বা মূর্খ, বুদ্ধিমান বা বোকা কোনওটাই ঠিকমতো বলা যায় না। তাদের স্বভাবের সঙ্গে স্ক্যান্ডিনেভিয়া আর ক্যালিডোনিয়া অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বভাবের একটা মিল ছিল। তাদের চালচলন ছিল অস্কারসুলভ, ইংরেজ ভাবাপন্ন তখনও হয়ে ওঠেনি।
তুলুজ থেকে আসা যুবকের নাম ছিল ফেলিক্স থোলোমায়েস, ক্যাহরের যুবকের নাম ছিল লিস্তোলিয়ের, লিমোজে থেকে যে যুবক এসেছিল তার নাম ছিল ফেমিউল আর মঁতাবাঁর যুবকের নাম ছিল ব্ল্যাকিভেল। যুবকদের প্রত্যেকেরই একজন করে প্রেমিকা ছিল। ব্ল্যাকিভেল ভালোবাসত ফেবারিতেকে। ফেবারিতে আগে ইংল্যান্ডে বাস করত। লিস্তোলিয়ের ভালোবাসত ডালিয়াকে। তার প্রিয় ফুলের এই নামটা সে নিজে পছন্দ করে ধারণ করে। ফেমিউল ভালোবাসত জেফিনেকে। অনেকে আবার তাকে জোশেফাইন বলে ডাকত। থোলোমায়েস ভালোবাসত ফাঁতিনেকে। তার সোনালি চুলের জন্য লোকে তাকে লা ব্লক বা সুন্দরী বসে ডাকত।
ফেবারিতে, ডালিয়া, জেফিনে আর ফাঁতিনে–এই চারজন মেয়েরই মোহিনী শক্তি ছিল। তারা সব সময় চকচকে পোশাক পরত, গাঁয়ে গন্ধদ্রব্য ব্যবহার করত। তাদের। মুখগুলো হাসিখুশিতে ভরা থাকত। তবে তাদের দেখলেই বোঝা যেত তারা আগে দর্জির কাজ করত এবং সূচিশিল্পের কাজ তখনও ছাড়েনি তারা। তারা এখন প্রেমে পড়লেও তাদের আগেকার কর্মজীবনের শান্ত স্র একটা ভাব তাদের চোখে-মুখে ফুটে ছিল তখনও। নারীদের অধঃপতন শুরু হলেও তাদের চরিত্রের ধাতুর মধ্যে একটা পবিত্রতার বীজ রয়ে যায় এবং এই মেয়েগুলোরও তাই ছিল। এই মেয়েগুলোর মধ্যে যে সবচেয়ে ছোট ছিল তাদের সবাই ‘বেরি’ বলে ডাকত। আর যে সবচেয়ে বড় ছিল বয়সে তাকে সবাই ‘বিগ সিস্টার বা বড় বোন’ বলত। বড় বোনের বয়স ছিল তেইশ। এদের মধ্যে যে তিনজন বড় ছিল তারা ছিল অনেক অভিজ্ঞ, বেপরোয়া এবং প্রেমের ব্যাপারে অভ্যস্ত আর সুন্দরী ফাঁতিনে প্রথম প্রেমের অভিজ্ঞতা জীবনে প্রথম অর্জন করছিল এবং তার আস্বাদ অনুভব করছিল।
ডালিয়া, জেফিনে আর ফেবারিতের জীবনে একাধিক প্রেমের অভিজ্ঞতা ছিল। আগে তাদের জীবনে তাদের প্রেমকাহিনীর নায়ক হিসেবে যে তিন জন যুবক আসে তারা হল অ্যাডলেফ, আলফোনসে আর গুস্তভ। দারিদ্র্য আর চটুল প্রেমাভিনয় সুন্দরী খেটে খাওয়া শ্রমিক মেয়েদের এক অপ্রতিরোধ্য প্রলোভন হিসেবে এসে তাদের জীবনটাকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। দারিদ্র্য তাদের খোঁচা দেয়, আর তার পীড়ন তাদের কুপথে ঠেলে দেয়। প্রেম তাদের তোষামোদের পথে নিয়ে যায়। এই দুই-এর আবেদনের কাছে তারা অসহায় এবং তাদের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারে না তারা। যে প্রেমের ফুল তাদের উপর ছুঁড়ে দেওয়া হয় তা পরে পাথর হয়ে তাদের আঘাত করে। এইভাবে তারা নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনে। যে আশা আপাতগৌরবময় অথচ এক দুর্বোধ্য ছলনায় জটিল, সে আশার মোহ তাদের জীবনের পথ থেকে সরিয়ে দূরে নিয়ে যায়।
এদের মধ্যে ফেবারিতে কিছুকাল ইংল্যান্ডে থাকায় জেফিনে আর ডালিয়া তাকে খাতির করত। ছোটবেলা থেকেই তার একটা বাড়ি ছিল। তার বাবা ছিলেন গণিতের শিক্ষক। অহঙ্কারী আত্মম্ভরী এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। যৌবনে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েন। কিন্তু বিয়ে করেননি তাকে। ফেবারিতের জন্ম হয় তারই গর্ভে। ফেবারিতের বাবার বয়স বাড়লেও নারীলোলুপতা কমেনি। তার বাবার কাছে থাকত না ফেবারিতে। মাঝে মাঝে দেখা করতে যেত। ফেবারিতে একবার তার বাড়িতে থাকাকালে কোনও এক সকালে রক্তচক্ষু এক বয়স্ক মহিলা তার ঘরে ঢুকে তাকে বলে, তুমি জান আমি কে? আমি তোমার মা। মহিলাটি ঘরে ঢুকে নিজের হাতে খাবার বার করে খেয়ে একটা তোক নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মহিলাটি খুব বদমেজাজি ছিল এবং ফেবারিতের সঙ্গে একটা কথাও বলত না কখনও। সে তার বাবার কাছে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনত।
ডালিয়া ভালোবাসত লিস্তোলিয়েরকে। এই ভালোবাসা কিভাবে গড়ে ওঠে তা কেউ জানে না। তবে ডালিয়ার গোলাপি আঙুলের নখগুলো খুব সুন্দর ছিল। এই সুন্দর নখ নিয়ে কোনও মেয়ে কঠোর শ্রমের কাজ করতে পারে না। কাউকে ধার্মিক হতে হলে আগে তাকে হাত দুটিকে উৎসর্গ করতে হবে। সে হাতে কঠোর শ্রম করতে হবে। জেফিনে ফেমিউলকে প্রেমিক হিসেবে লাভ করে তার গায়ে পড়া ঢলে পড়া ভাব আর তোষামোদসূচক আদরের কথাবার্তার দ্বারা।
যুবকরা ছিল পরস্পরের কমরেড’ আর মেয়েরা ছিল পরস্পরের বান্ধবী। এইসব ক্ষেত্রে সাধারণ প্রেম আর বন্ধুত্ব পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চলতে থাকে।
সদ্গুণ আর দর্শন দুটি ভিন্ন বস্তু। তার প্রমাণস্বরূপ বলা যেতে পারে ফেবারিতে, জেফিনে আর ডালিয়া ছিল দার্শনিক মনোভাবাপন্ন আর ফাঁতিনে ধর্মভাবাপন্ন আর গুণশীলসম্পন্না।
কিন্তু এই তো গেল ফাঁতিনের কথা, কিন্তু থোলোমায়েস? সলোমন হয়তো বলতেন প্রেম ধর্মেরই এক অঙ্গ। ফাঁতিনের কাছে সেটা তাই ছিল। তার জীবনে এটাই হল প্রথম প্রেম এবং একমাত্র প্রেম। সে ছিল প্রেমের দিক থেকে সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত। সব মেয়েদের মধ্যে একমাত্র তাকেই তার প্রেমিক আপনজন মনে করত এবং তাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করত।
