১
তখন অষ্টাদশ লুই-এর রাজত্বকাল। ১৮১৭ সাল। নেপোলিয়ঁন তখন সেন্ট হেলেনা দ্বীপে ইংরেজদের হাতে বন্দি অবস্থায় দিন যাপন করছিলেন। প্রুশীয় সৈন্যরা ফান্সের উপর বুক চেপে বসেছিল তখনও। এই বছর রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও তুলিয়ের শহর ধ্বংস করার অভিযোগে অভিযুক্ত প্লেগনিয়ের, ক্যাবেয়ো আর তলেরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে তাদের প্রথমে হাত ও পরে মাথা কেটে বিপ্লব দমন করে অবস্থা আয়ত্তে আনা হয়। এ বছর দুটো ঘটনা লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। একটি ঘটনা হল ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের নির্বাচিত রচনাসগ্রহের প্রকাশ এবং দ্বিতীয় ঘটনা হল দতানের ভ্রাতৃহত্যা। দতান নাকি তার ভাইয়ের মাথা কেটে মাথাটা একটা জলাশয়ে ফেলে দেয়। মেদুসে নামে একটি যুদ্ধজাহাজ হারিয়ে যায় এবং সেটি খুঁজে বার করার এক সরকারি তদন্ত শুরু হয়। এ বছর কর্নেল মেলভেস মিশরে পালিয়ে গিয়ে মুসলমান হয়ে সুলেমান পাশা উপাধি ধারণ করে। এ বছর মঁসিয়ে কেঁতে লিঞ্চ একটা বড় কাজ করেন। ১৮১৪ সালের ১২ মার্চ তারিখে তিনি বোর্দো শহরের মেয়র হওয়ার পর শহরটাকে ডিউক দ্য অ্যাঙ্গুলিমের হাতে তুলে দেন। এই বছর অ্যাকাডেমি ফ্রাঁসোয়া এক প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। তার বিষয়বস্তু ছিল পাণ্ডিত্য থেকে প্রাপ্ত সুখ। ক্লেয়ার দ্য আলবে আর মালেক আদেল এই দুটি বিখ্যাত গ্রন্থের জন্য মাদাম কত্তিনকে সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখিকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইনস্টিটিউট দ্য ফ্রান্স থেকে নেপোলিয়ঁন বোনাপার্টের নামটি বাদ দেওয়া হয়। অ্যাঙ্গুলিমেতে এক নৌবাহিনীর কলেজ স্থাপিত হয়। অ্যালিমের ডিউক নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে শহরটিকে এক প্রসিদ্ধ সমুদ্রবন্দরে পরিণত করা চেষ্টা করেন, কারণ তার ধারণা ছিল তা না হলে রাজতন্ত্রের মর্যাদা অপমানিত হবে। নেতা ও জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক মতভেদ তখনও ছিল। রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন কাফে লেমক্লিনের লোকেরা রাজতন্ত্রের সমর্থক ছিল এবং কাফে ভেলয়ের লোকেরা বুর্বনদের সমর্থক ছিল। তবে সব বুদ্ধিজীবী ও বিচক্ষণ ব্যক্তিরা এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে রাজা অষ্টাদশ লুই এক সনদের মাধমে চিরতরে বিপ্লবের অবসান ঘটিয়েছেন। রাজতন্ত্রকে সুদৃঢ় করার জন্য দক্ষিণপন্থীরা নানারকম পরিকল্পনা রচনা করার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। দক্ষিণপন্থীরা প্রায়ই বলতেন উগ্র রাজতন্ত্রী মতবাদের জন্য আমাদের বেকলের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। তবে আবার সেন নদীর ধারে তুলিয়েরের প্রাসাদশীর্ষে মিলিত হয়ে কাউন্ট দার্নয়ের একদল সার্থক ষড়যন্ত্রের জল্পনা-কল্পনা করতেন। বিবাহবিচ্ছেদ প্রথার উচ্ছেদ করা হয়। সমস্ত উচ্চ বিদ্যালয়গুলোকে কলেজের মর্যাদা দেওয়া হয়। অভিনেতা পিকার্দ একাডেমির সদস্য নির্বাচিত হয়, নাট্যকার মলিয়ের যা কোনওদিন পারেননি। থিয়েটার দ্য লোসেওনে কিদার্দ লে দিউ ফিলবার্ত নাটকে নিয়মিত অভিনয় করতেন। এ বছর সবাই একবাক্যে বলতে থাকে মঁসিয়ে শার্লক লয়জেঁ এ শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা প্রতিভাধর ব্যক্তি হয়ে উঠবেন। তবে ঈর্ষাকাতর ব্যক্তিরা প্রায় বলতেন, লয়জে যখন আকাশে উড়ছেন, তাঁর পা দুখানি মাটিতেই আছে। যে দার্শনিক সেন্ট সাইমনের কথা লোকে জানতই না, তিনি হঠাৎ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন, তিনি বিজ্ঞান একাডেমির সদস্য হন। ইংরেজ কবি লর্ড বায়রন ফ্রান্সে পরিচিত উঠে খ্যাতি লাভ করতে থাকেন। মঁসিয়ে জেনাভে পুলিশের বড়কর্তার পদ লাভ করলে ফবুর্গের অভিজাত সমাজ তাঁর ধর্মাচরণের জন্য তাঁকে সমর্থন করে। দু জন নামকরা সার্জেন এ কোন দ্য মেডিসিনের সভাকক্ষে খ্রিস্টের ঐশ্বরিকত্ব নিয়ে বিতর্কে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। বিতর্ককালে আবেগের উত্তাপে তারা পরস্পরের প্রতি ঘুষি পাকাতে থাকেন। তাঁদের একজন কুভিয়ের একই সঙ্গে প্রকৃতি জগৎ ও বাইবেলের জেনেসিসের প্রতি তার আনুগত্য ও শ্রদ্ধা দেখান। একই সঙ্গে তিনি ধর্মশাস্ত্র আর ফসিল বা জীবাশ্মের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং সেই সঙ্গে যে কোনও লুপ্ত বৃহদাকার প্রাণীর থেকে মোজেসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করেন। কাউন্ট সার্তয়কে নোতার দ্যমে প্রবেশ করতে দেখে একজন লোক বলে ওঠে, যেদিন আমি বোনাপার্ট আর তালমাকে হাত ধরাধরি করে বল সভেজে ঢুকতে দেখি সেদিনটা কী অভিশপ্ত!’ এই কথা বলার জন্য লোকটার দুমাস কারাদণ্ড হয় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে। নেপোলিয়ঁনের সামনে যারা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গা-ঢাকা দেয় তারা আবার প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসতে থাকে। যারা একদিন যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষে যোগদান করে, তারা সম্মান ও পুরস্কার লাভ করতে থাকে। যারা একদিন ছিল রাজতন্ত্রের বিরোধী তারা আবার দৃঢ়ভাবে প্রকাশ্যে রাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য দেখাতে থাকে।
এই হল ১৮১৭ সালের মোটামুটি এক চিত্র। লোকে এখন এসব কথা প্রায় সব ভুলে গেছে। এইসব ছোটখাটো ঘটনা বাতিল করে দিয়ে ইতিহাস বড় বড় ঘটনা নিয়ে মত্ত হয়ে থাকে। কিন্তু মানুষের জীবনকাহিনীতে এই আপাততুচ্ছ ছোটখাটো ঘটনারও মূল্য আছে। ইতিহাসস্বরূপ বিশাল বনস্পতির শাখা-প্রশাখায় যেসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা পাতার মতো বিরাজ করতে থাকে তারা কেউ মৃত্যুহীন নয় একেবারে। এক একটি বছরের উপাদানেই শতাব্দীর বিশাল মুখমণ্ডলটি রচিত হয়।
