সে বুঝতে না পারলেও একটা জিনিস নিশ্চিত যে সে আর আগেকার সেই মানুষ নেই। তার অন্তরের মধ্যে একটা বিরাট পরিবর্তন এসেছে, তার মনের কাঠামোটাই বদলে গেছে একেবারে। বিশপ তাকে এ কথা বলেনি বা তার অন্তরকে স্পর্শ করেনি একথা জোর গলায় বলে বেড়াবার মতো শক্তি তার আর নেই।
এই ধরনের মানসিক গোলমাল ও গোলযোগের মধ্যে পেতিত গার্ভের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। সে তার চল্লিশ ব্যু ছরি করে। কেন সে এ কাজ করেছে? সে নিশ্চয়। এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না। সুদীর্ঘ কারাবাস তার মনের মধ্যে যে অশুভ শক্তি জাগিয়ে তোলে সেই শক্তিই কি তার অন্তর্নিহিত কুপ্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করে তোলে? হয়তো তাই, অথবা যতটা ভাবছি ততটা নয়। তবে মোট কথা, যে পেতিত গার্ভে নামে ছেলেটার পয়সা চুরি করেছিল সে মানুষ নয়, জাঁ ভলজাঁর মধ্যে যে একটা পশু ছিল সেই পশুটাই তার অভ্যাসগত ও প্রকৃতিগত পাশবিকতার বশে পয়সাটার উপর পা-টা চেপেছিল। আর তখন ভলজাঁর ভেতরকার মানুষটা নতুন চিন্তাগুলোর সঙ্গে বুদ্ধি দিয়ে লড়াই করে চলেছিল। সে যখন বুঝতে পারল তার ভেতরকার পশুটা এ কাজ করেছে। তখন সে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে।
আশ্চর্যের কথা এই যে, নতুন অবস্থার মধ্যে যে মানসিকতা তার গড়ে উঠেছিল তাতে সে বেশ বুঝতে পারল, যে কাজ সে করে ফেলেছে সে কাজের মানসিক প্রতিক্রিয়া সে সহ্য করতে পারবে না।
যাই হোক, তার এই শেষের কুকর্মটা তার মনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করল। তার মনের সব বিশৃঙ্খলা ভেদ করে এ ঘটনা এমন এক আলোকসম্পাত করল তার মনের ওপর যার ফলে তার মন ও বুদ্ধি অন্ধকার থেকে আলোটাকে পৃথক করতে পারল এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণের মতো তার কাজের ন্যায়-অন্যায়ের উপাদানগুলো বিচার করে দেখতে পারল।
প্রথমেই সে কোনও নিমজ্জমান ব্যক্তির তৃণখণ্ড আঁকড়ে ধরার মতো কোনও কিছু নতুন করে চিন্তা করার আগে ছেলেটাকে খুঁজে তার পয়সাটা ফেরত দিতে চাইল। যখন সে তা পারল না তখন সে সত্যিই হতাশ হয়ে বসে পড়ল। যে মুহূর্তে সে ‘পাপী শয়তান এই কথা দুটো উচ্চারণ করল তখন সে ভেতরকার যে মানুষটা হতে এতদিন বিচ্ছিন্ন ছিল সে তাকে দেখতে পেয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। অথচ বাইরে সে দেখল সে একটা রক্তমাংসের মানুষ, অপরাধী পাপী জাঁ ভলজাঁ যার হাতে ছড়ি, পিঠে চুরি করা জিনিসপত্রে ভরা একটা ব্যাগ, মুখখানা কালো এবং মনে কালো মুখখানার থেকে কালো কুটিল যত চিন্তা।
অতিরিক্ত দুঃখভোলা মানুষকে করুণাপ্রবণ করে তোলে। জাঁ ভলজাঁও কেমন যেন কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠেছিল। জাঁ ভলজাঁ নামে মানুষটার মুখোমুখি হয়ে সে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল কে ওই মানুষটা? নিজেকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল সে।
এইসব মুহূর্তে যখন মনের সমুদ্রটা ভয়ঙ্করভাবে শান্ত হয়ে ওঠে এবং অন্তদৃষ্টিটা স্বচ্ছ হয়ে ওঠে তখন আমাদের চিন্তাগুলো বাস্তব জগৎটাকে পরিহার করে গভীরে চলে যায়। তখন এই পরিদৃশ্যমান বাস্তব জগৎটাকে আর আমরা দেখতে পাই না, তখন শুধু আমরা আমাদের অন্তরের জগৎ, তার অন্তর প্রকৃতিটাকেই দেখতে পাই।
এইভাবে সে যখন নিজের মুখোমুখি হয়ে আপন অন্তরের রহস্যময় গভীরে তলিয়ে গিয়ে ভাবছিল তখন হঠাৎ বাইরে থেকে একটা টর্চের আলো এসে লাগল তার চোখে। প্রথমে সে ভাবল এটা তারই চেতনার আলো। কিন্তু ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে সে বুঝল একটা মানুষ এ আলো ফেলেছে আর সে মানুষ হল দিগনের সেই বিশপ।
তখন তার মনশ্চক্ষুর সামনে দুটো মানুষের মূর্তি ফুটে উঠল –একজন বিশপ আর একজন জাঁ ভলজাঁ। প্রথমে মনে হল জাঁ ভলজাঁর দানবিক চেহারাটার বিশাল ছায়ায় বিশপের মূর্তিটা ঢাকা পড়ে গেছে। কিন্তু ক্রমে ভাবতে ভাবতে সে দেখল বিশপের উজ্জ্বল জ্যোতির তীব্রতায় জাঁ ভলজাঁ মুখ লুকিয়ে পালিয়ে গেছে কোথায়। জাঁ ভলজাঁ একেবারে অদৃশ্য হয়ে যেতে বিশপ একাই দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে। তার দেহ থেকে বিচ্ছুরিত জ্যোতির প্লাবনে তার ছায়াচ্ছন্ন বিষাদগ্রস্ত আত্মাটা আলোকিত হয়ে উঠেছে যেন।
অনেকক্ষণ ধরে কাঁদল জাঁ ভলজাঁ। কোনও বেদনার্ত বা শোকার্ত একজন নারী বা শিশুর থেকে আরও আকুলভাবে কাঁদল সে। কাঁদতে কাঁদতে সে দেখল এক নতুন দিনের প্রভাত-সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে তার আত্মাটা। সে এক আশ্চর্য দিন–একই সঙ্গে বিস্ময়কর এবং ভয়ঙ্কর। সে আলোর স্বচ্ছতায় সেসব জিনিস, তার বর্তমান ও অতীত জীবনের অনেক ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখতে পেল যা সে এর আগে কখনও দেখতে পায়নি। তার অপরাধ, তার সুদীর্ঘকালীন অভিশাপ, তার কারামুক্তি ও প্রতিশোধবাসনা, তার অন্তরের ও বাইরের কঠোরতা, বিশপের বাড়ির ঘটনা, সবশেষে ছেলেটার পয়সা চুরির ঘটনা–সব কিছু খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সে। বিশপ তাকে মার্জনা করার পরেও এই শেষ চুরির ঘটনাটায় সে বড় লজ্জা পেল। সেসব কিছু দেখে সে নিজের জীবনের ও আত্মার একটা ছবি এঁকে ফেলল। সে ছবি যেমন কুৎসিত তেমনি ভয়ঙ্কর। তবু সে দেখল জীবন ও আত্মার জগতে এক নতুন দিনের প্রভাত-সূর্যের আবির্ভাব হয়েছে। আর সে দেখল এক স্বর্গীয় আলোর জ্যোতিতে এক শয়তান উদ্ভাসিত ও অভিন্নত হয়ে উঠেছে।
কতক্ষণ সে সেইখানে বসে বসে কেঁদেছিল? তার পর সে কী করেছিল এবং কোথায় গিয়েছিল? তা আমরা জানি না। তবে সেই রাত্রিতে গ্রেনোবল থেকে আসা এক ঘোড়ার গাড়ির ড্রাইভার দিগনের বড় গির্জাটার পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখে মঁসিয়ে বিয়েনভেনুর বাড়ির সামনে একজন মানুষ নতজানু হয়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে আছে।
১.৩ অষ্টাদশ লুই-এর রাজত্বকাল
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
