ভলজাঁ দেখল ঘোড়ায় চেপে একজন যাজক আসছে। সে তার কাছে গিয়ে বলল, মঁসিয়ে লে কুরে। একটা ছেলেকে এই পথে যেতে দেখেছেন? পেতিত গার্ভে নামে একটা ছেলে?
না, আমি কোনও ছেলেকে দেখিনি।
ভলজাঁ পাঁচ ফ্রাঁ’র দুটো মুদ্রা বার করে যাজকের হাতে দিয়ে বলল, দরিদ্রদের সেবার জন্য এটা নিন মঁসিয়ে লে কুরে… ছেলেটার বয়স বছর দশেক হবে। তার পিঠে একটা বাক্স ছিল। হয়তো সে চিমনির ঝাড়ুদার অথবা ওই ধরনের কিছু কাজ করে।
আমি তাকে দেখিনি।
পেতিত গার্ভে তার নাম। এখানকার পাশাপাশি কোন গাঁয়ে থাকে কি?
যাজক বলল, আমি তা জানি না। মনে হয় সে এখানকার ছেলে নয়। বিদেশি কোনও ভবঘুরে। ওরা মাঝে মাঝে আসে।
আরও দুটো পাঁচ ফ্রাঁ’র মুদ্রা বার করে যাজকের হাতে দিয়ে ভাজা বলল, দরিদ্রদের সেবার জন্য এটাও রেখে দিন।
যাজক ঘোড়াটা চালিয়ে দিলে ভলজাঁ চিৎকার করে বলে উঠল, মঁসিয়ে লাব্বে, আমাকে গ্রেপ্তার করুন, আমি চোর।
যাজক ভয়ে ঘোড়াটাকে জোরে ছুটিয়ে চলে গেল।
যেদিকে যাচ্ছিল সেইদিকেই যেতে লাগল ভলজাঁ। অনেকক্ষণ ধরে ছুটল। পেতিত গার্ভের নাম ধরে অনেক ডাকল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না বা কোনও সাড়াও পেল না। মাঝে মাঝে পথের ধারে এক একটা ঝোঁপ বা বড় পাথরের ছায়া দেখে মনে হতে লাগল কোনও মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পরে দেখল সেটা দেখার ভুল। এক জায়গায় এসে ভলক্স দেখল তিন দিকে তিনটে পথ চলে গেছে। সেইখানে তিনটে পথের মুখের কাছে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার পর শেষবারের মতো একবার চিৎকার করে ডাকল, ‘পেতিত গার্ভে।’ এরপর আর একবার ডাকল। কিন্তু গলা দিয়ে কোনও শব্দ বার হচ্ছিল না। নিজের কথা নিজেই শুনতে পাচ্ছিল না। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না সে। এক অপরাধ-চেতনার গুরুভারের চাপে পা দুটো তার বসিয়ে দিচ্ছিল যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি। একটা পাথরের উপর হাঁটু দুটোর মাঝে মাথাটা খুঁজে বসে রইল সে। আপন মনে বলে উঠল, আমি হচ্ছি হতভাগ্য এক শয়তান। মহাপাপী। অনুতাপের অপ্রতিরোধ্য বেদনার আবেগে পরিপ্লাবিত হয়ে উঠল তার সমস্ত অন্তর। সে কাঁদতে লাগল। গত উনিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম কাঁদল সে।
আমরা জানি জাঁ ভলজাঁ যখন বিশপের বাড়ি থেকে চলে আসে তখন তার মনের অবস্থা এমন একটা আকার ধারণ করে, যা আগে কখনও করেনি। তার মনের মধ্যে তখন কী ধরনের আলোড়ন চলছিল, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না সে। বৃদ্ধ দয়ালু বিশপের সব কথা ও কাজের বিরুদ্ধে সে অকারণে শুধু তার অন্তরটাকে কঠোর করে তুলেছে। বিশপ তাকে একসময় বলেছিল, ‘তুমি আমাকে কথা দিয়েছ এবার থেকে তুমি সৎ হবে। আমি তোমার আত্মাকে কিনে নিচ্ছি। সে আত্মাকে আমি বিকৃত যত সব কামনা আর কুচিন্তার হাত থেকে মুক্ত করে ঈশ্বরকে দান করছি।’ কথাগুলো বারবার তার মনে আনাগোনা করেছিল। কিন্তু আত্মাভিমানের যে দুর্ভেদ্য দুর্গ আমাদের সব পাপপ্রবৃত্তিকে এক নিরাপদ আশ্রয় দান করে সেই আত্মাভিমানের বশবর্তী হয়েই মনের তলায় চেপে রেখে দিয়েছিল বিশপের সেই কথাগুলোকে। অস্পষ্টভাবে হলেও একটা কথা বুঝতে পেরেছিল সে, বিশপের ক্ষমাই তার নিষ্ঠুর প্রকৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হানে। সেই আক্রমণ ও আঘাতকে যদি সে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিহত করতে পারে তা হলে অক্ষুণ্ণ থেকে যাবে তার মানসপ্রকৃতির অবিমিশ্র নিষ্ঠুরতা, তা হলে চিরকালের জন্য পাথরের মতো কঠিন থেকে যাবে তার অন্তরটা; আর যদি সে আঘাত ও আক্রমণের কাছে আত্মসমর্পণ করে তা হলে এতদিন ধরে অসংখ্য মানুষের দুর্ব্যবহারে সে প্রবল ঘৃণা সঞ্জাত হয়েছিল তার মনে, যে ঘৃণা এখন তার অবিরাম সহচর হিসেবে বিরাজ করে তার অন্তরে সে ঘৃণাকে ত্যাগ করতে হবে তাকে চিরকালের জন্য। অস্পষ্টভাবে সে আরও বুঝতে পারল এখন শেষ লড়াইয়ের ক্ষণ এসে গেছে। এখন হয় তাকে জয়লাভ করতে হবে অথবা পরাভব স্বীকার করতে হবে সে যুদ্ধে। একদিকে তার অন্তর্নিহিত পাপ আর একদিকে সেই ধর্মাত্মা বিশপের পুণ্য–এই দুইয়ের সংগ্রামে একজনকে জিততেই হবে।
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে নানা জটিল চিন্তার দ্বারা বিব্রত হয়ে মাতালের মতো টলতে লাগল। এইভাবেই সে আবার পথ হাঁটতে লাগল। দিগনেতে বিশপের বাড়িতে যেসব ঘটনা ঘটে গেছে তার ফল কী হবে, সে বিষয়ে কি তার কোনও ধারণা আছে? এইসব ঘটনার সঙ্গে যেসব ব্যাপার জড়িয়ে আছে তা কি সে বোঝে? কেউ কি তার কানে কানে একটা কথা ফিস ফিস করে বলেনি যে সে আজ জীবনের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে যেখানে মধ্যপথ বলে কিছু নেই। এখন থেকে হয় তাকে মানুষ হিসেবে খুব ভালো হতে হবে অথবা খুব খারাপ হয়ে উঠতে হবে, হয় তাকে বিশপের থেকে আরও অনেক বড় হতে হবে অথবা শয়তানের থেকে নীচ হতে হবে, হয় তাকে মানবতা ও মহত্ত্বের সর্বোচ্চ স্তরে উঠে যেতে হবে অথবা নীচতা ও হীনতার সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যেতে হবে।
আমরা আবার এ প্রশ্ন করতে পারি, জাঁ ভলজাঁ কি তার মনের মধ্যে এসব কথা বুঝতে পেরেছিল? দুঃখ-বিপর্যয় অবশ্য মানুষের বুদ্ধিকে তীক্ষ্ণ করে তোলে। তবু ভলজাঁ এইসব জটিল ব্যাপারগুলো ঠিকমতো বুঝতে পেরেছিল কি না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এ সব চিন্তা তার মনের মধ্যে ঢুকেছিল তার স্পষ্ট কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না, শুধু অস্পষ্টভাবে তার একটা ধারণা করে নিতে হয়। তাছাড়া এসব চিন্তা তার মনের মধ্যে ঢুকে তার মনটাকে এক বেদনার্ত ও দুর্বিষহ আলোড়নের মধ্যে ফেলে দেওয়া ছাড়া তার কোনও ভালো করতে পারেনি। নারকীয় এক কুটিল অন্ধকারে ভরা কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরেই বিশপের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকার তার মনশ্চক্ষুকে একেবারে বিহ্বল করে দিয়েছিল, দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকার পর কোনও লোক হঠাৎ উজ্জ্বল দিবালোক দেখতে পেলে তার চোখ দুটো যেমন ধাঁধিয়ে যায়। বিশপের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, সততা ও শুচিতায় যে উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি এনে দিয়েছিল তার জীবনে, সে প্রতিশ্রুতি সঙ্গে সঙ্গে অভিশাপ হয়ে প্রবল ভয়ে কাঁপিয়ে তুলেছিল তাকে। সত্যি সত্যিই হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল সে। অন্ধকার কোটর হতে অকস্মাৎ নির্গত কোনও পেঁচা যেমন সূর্যোদয়ের আলোকবন্যায় বিহ্বল ও বিব্রত হয়ে পড়ে, তেমনি সহসা পুণ্যের উজ্জ্বলতায় চোখে অন্ধকার দেখছিল সে।
