নিবিড় পথক্লান্তির সঙ্গে নিদারুণ মানসিক দুশ্চিন্তা আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল তার চেহারাটা। এমন সময় এক জীবন্ত মানুষের শব্দ কানে এল তার। মুখ ফিরিয়ে দেখল একটা বছর দশেকের ছেলে গান গাইতে গাইতে সেই হাঁটা পথটা দিয়ে আসছে। তার পিঠের উপর বাঁধা একটা বাক্সের মধ্যে তার জিনিসপত্র সব ছিল। মনে হল সে একজন ভবঘুরে জাতীয় ছেলে যে গাঁয়ে গায়ে চিমনি পরিষ্কারের কাজ করে বেড়ায় ছেঁড়া পায়জামা পরে। পথ চলতে চলতে মাঝে মাঝে থেমে খেলা করছিল সে। তার হাতে চল্লিশটা স্যু ছিল, তা নিয়ে লোফালুফি করছিল সে। সেটা উপরে ছুঁড়ে দিয়ে উল্টো দিক। দিয়ে লুফে নিচ্ছিল। এই পয়সাই তার জীবনের একমাত্র সম্বল।
জাঁ ভলজাঁকে দেখতে না পেয়ে সে ঝোঁপটার ধারে দাঁড়িয়ে পয়সাটা নিয়ে আবার খেলা করতে শুরু করে দিল। এবার সে পয়সাটা গড়িয়ে দিতে লাগল। গড়াতে গড়াতে পয়সাটা ভলজাঁর পায়ের কাছে এসে পড়ল। পায়ের কাছে আসতেই পা দিয়ে পয়সাটা চেপে দিল ভলজাঁ।
ছেলেটা দেখেছিল তার পয়সাটা কোথা গেছে। সে সোজাঁ ভলজাঁর কাছে চলে এল। জায়গাটা একেবারে নির্জন। পথে বা প্রান্তরের কোথাও একজন মানুষ নেই। মাথার অনেক উপরে এক ঝাঁক উড়ন্ত পাখির কলবর ছাড়া আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। অস্তম্লান সূর্যের কিছু আলো এসে ছেলেটার মাথার সোনালি চুল আর ভলজাঁর মুখের উপর পড়েছিল।
ছেলেটি বলল, মঁসিয়ে, আমার পয়সাটা দেবেন?
তার কণ্ঠে শিশুসুলভ এক সরল বিশ্বাসের সঙ্গে নির্দোষিতা আর অজ্ঞতার একটা ভাব ছিল।
ভলজাঁ বলল, তোমার নাম কী?
পেতিত গার্ভে মঁসিয়ে।
চলে যাও।
দয়া করে আমার পয়সাটা ফিরিয়ে দিন মঁসিয়ে।
জাঁ ভলজাঁ মাথা নিচু করে বসে রইল। কথাটার কোনও উত্তর দিল না।
ছেলেটি আবার বলল, দয়া করুন মঁসিয়ে।
ভলজাঁ মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার পয়সা। একটা রুপোর মুদ্রা।
ভলজাঁ যেন কথাটা শুনতে পেল না। ছেলেটা তখন তার ভারী জুতোপরা পা-টা সরিয়ে পয়সাটা বার করার চেষ্টা করতে লাগল। সে বারবার বলতে লাগল, আমার পয়সাটা দিয়ে দিন। আমার চল্লিশটা স্যু। এবার কাঁদতে লাগল জোরে। ভলজাঁ এবার মাথাটা তুলল। সে আশ্চর্য হয়ে ছেলেটার পানে তাকাল। তার পর তার ছড়িটা খুঁজতে খুঁজতে ভয়ঙ্কর গলায় বলে উঠল, কে এখানে?
ছেলেটা বলল, আমি পেতিত গার্ভে মঁসিয়ে। আপনি দয়া করে পা-টা সরিয়ে আমার চল্লিশ স্যু মুদ্রাটা দিয়ে দিন।
ছেলেটা রেগে গিয়ে কড়া গলায় বলল, আপনি পা-টা সরাবেন?
ভলজাঁ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চলে যাও বলছি। এখনও আছে?
সে তার একটা পা দিয়ে তখনও ছেলেটার মুদ্রাটাকে চেপে রইল। পা-টা সরাল না।
ছেলেটা ভলজাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। কিছুক্ষণ হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে আর পেছন ফিরে না তাকিয়ে বা কোনও কথা না বলে ছুটে পালাল। ছেলেটা ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে পড়েছিল। এক একবার পথের উপর দাঁড়াচ্ছিল। সে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তার চাপা কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল ভলজাঁ। কিন্তু একটু পরেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দেখতে দেখতে সূর্য অস্ত গেল। গোধূলির ছায়া ঘন হয়ে উঠল জাঁ ভলজাঁর চারদিকে। সারা দিন তার কিছুই খাওয়া হয়নি। গাঁয়ে জ্বর বোধ করছিল। যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে। ছেলেটার চলে যাওয়ার পর এক পা-ও নড়েনি কোথাও। সহসা সে তার সামনে দেখল ঘাসের উপর নীল রঙের একটা ভাঙা পাত্রের একটা টুকরো পড়ে রয়েছে। গাঁয়ে জোর ঠাণ্ডা লাগতে বুকের উপর শার্টটা বেঁধে নিল। তার পর মাটির উপরে থাকা ছড়িটা কুড়িয়ে নিতে গিয়ে তার পায়ের তলায়। এতক্ষণ ধরে পড়ে থাকা চল্লিশ ব্যু’র মুদ্রাটা দেখতে পেল। ঠাণ্ডায় কাঁপতে লাগল সে।
তা দেখে এক বৈদ্যুতিক আঘাত পেয়ে যেন চমকে উঠল সে। আপন মনে বলে উঠল, এটা কী? মনে হল চকচকে রুপোর মুদ্রাটা তার উজ্জ্বল চোখ মেলে তাকিয়ে তাকে দেখছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সে সরে গিয়ে মুদ্রাটা হাতে তুলে নিয়ে তার চারপাশে নিরাপদ আত্মগোপনের এক আশ্রয় খুঁজতে থাকা ভীতসন্ত্রস্ত এক জন্তুর মতো দৃষ্টি ছড়িয়ে তাকাতে লাগল।
কোনও দিকে কিছুই দেখতে পেল না সে। রাত্রির অন্ধকার নেমে আসছিল। গোটা প্রান্তরটা ঠাণ্ডা হিম হয়ে উঠেছে। তার উপর নীলচে এক কুয়াশা নেমে এসে গোধূলির শেষ আলোটুকু অকালে মুছে দিয়েছে। ছেলেটা যেদিকে পালায় সেই পথেই জোর পায়ে হাঁটতে লাগল ভলজাঁ। কিছুদূর যাওয়ার পর একবার থেমে আবার তাকাল চারদিকে। এবারও কিছুই দেখতে পেল না সে। তখন জোর চিৎকার করে ডাকতে লাগল, পেতিত গার্ভে! পেতিত গার্ভে!
সে একবার থামল। কিন্তু কারও কোনও সাড়া পেল না। এক কুয়াশাঘন অন্ধকার প্রান্তরের বিশাল শূন্যতা আর অখণ্ড স্তব্ধতার মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল সে। সে স্তব্ধতার মাঝে তার সব কণ্ঠস্বর নিঃশেষে তলিয়ে গিয়েছিল কোথায়। তীক্ষ্ণ কনকনে বাতাস বইতে লাগল। ঝোঁপঝাড়ের গাছগুলো প্রচণ্ড রাগে ডালপালা নেড়ে ভয় দেখাতে লাগল যেন তাকে।
আবার পথ হাঁটতে লাগল সে। সহসা ছুটতে শুরু করে দিল। ছুটতে ছুটতে মাঝে মাঝে পেতিত গার্ভের নাম ধরে হতাশ কণ্ঠে ভয়ঙ্করভাবে ডাকতে লাগল। পেতিত গার্ভে সে ডাক শুনতে পেলে কোথাও হয়তো লুকিয়ে পড়ত।
