বিশপ আর তাঁর বোন যখন প্রাতরাশ খাওয়ার পর টেবিল থেকে উঠে যাচ্ছিলেন তখন দরজায় কে করাঘাত করল বাইরে থেকে। বিশপ বললেন, ভেতরে এস।
সঙ্গে সঙ্গে দরজা ঠেলে তিনজন পুলিশ একটা লোকের ঘাড় ধরে ঘরের মধ্যে ঢুকল। লোকটা হল জাঁ ভলজাঁ।
তিনজন পুলিশ ছাড়া একজন সার্জেন্ট দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এগিয়ে এসে বিশপকে ডাকল, মঁসিয়ে–
এ কথায় ভলজাঁ আশ্চর্য ও হতবুদ্ধি হয়ে বোকার মতো বলে উঠল, মঁসিয়ে! উনি তা হলে কুরে বা ছোট যাজক নন।
সার্জেন্ট তাকে ধমক দিয়ে বলল, চুপ কর। উনি হচ্ছে মহামান্য বিশপ।
মঁসিয়ে বিয়েনভেনু তখন তাদের কাছে ছুটে এলেন। তিনি ভলজাঁকে দেখেই বললেন, তুমি তা হলে আবার এসেছ? তোমাকে দেখে আনন্দিত হলাম। তুমি কি রুপোর বাতিদান দুটো নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিল? ওগুলোও খাঁটি রুপোর এবং দু’শো টাকা দাম হবে। আমি তো ও দুটোও দিয়েছিলাম। তুমি হয়তো ভুলে গেছ।
জাঁ ভলজাঁর চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল। সে সেই বিস্ফারিত চোখের অপরিসীম বিস্ময় আর বিহ্বলতা নিয়ে তাকিয়ে রইল বিশপের পানে। তার সেই চোখমুখের অদ্ভুত ভাব থেকে তার মনের অনুভূতি অনুমান করা সম্ভব ছিল না।
সার্জেন্ট বিশপকে বলল, মঁসিয়ে, তা হলে কি ধরে নেব এই লোকটা যা বলেছে তা সত্যি? তাকে ছুটতে দেখে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তার পিঠের ব্যাগের মধ্যে এই রুপোর জিনিসগুলো পাই তাই–
বিশপ হাসিমুখে বললেন, আর ও বলেছে একজন বৃদ্ধ যাজক যার ঘরে রাত কাটিয়েছে সে তাকে ওগুলো দিয়েছে। এবার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। আপনারা অবশ্য ওকে এখানে ধরে আনতে বাধ্য। কিন্তু আপনারা ভুল করেছেন।
সার্জেন্ট বলল, তা হলে বলতে চান ওকে আমরা ছেড়ে দেব?
পুলিশরা ভলজাঁকে ছেড়ে দিতে সে আমতা আমতা করে বলল, আমি তা হলে এবার সত্যিই কি যেতে পারি?
ভলজাঁ যেন ঘুমের ঘোরে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল কথাগুলো।
একজন পুলিশ বলল, তুমি কি শুনতে পাওনি?
বিশপ বললেন, এবার কিন্তু রুপোর বাতিদান দুটো নিয়ে যেতে ভুলবে না।
আলনার উপর থেকে বাতিদান দুটো এনে ভলজাঁর হাতে তুলে দিলেন বিশপ। তাঁর বোন ও ম্যাগলোরি কোনও কথা বলে অথবা কোনও প্রতিবাদসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হস্তক্ষেপ করল না বিশপের কাজে। ভলজাঁর হাত দুটো কাঁপতে লাগল। সে অন্যমনে যন্ত্রচালিতের মতো বাতিদান দুটো নিল।
বিশপ ভলজাঁকে বললেন, এবার তুমি শান্তিতে যেতে পার। এবার যদি কোনওদিন ঘটনাক্রমে এ বাড়িতে আস তা হলে আর বাগানের মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। এ দরজায় কোনওদিন তালা দেওয়া হয় না।
এবার পুলিশদের দিকে ঘুরে বিশপ বললেন, ধন্যবাদ ভদ্রমহোদয়গণ!
পুলিশরা চলে গেল। ভলজাঁ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন মনে হল সে পড়ে যাবে। বিশপ তার কাছে গিয়ে বললেন, তুমি ভুলে যেও না তুমি কথা দিয়েছ তুমি তোমার সব টাকা দিয়ে এমন একটা কিছু কাজ করবে যাতে তুমি একজন সৎ লোক হয়ে উঠতে পার।
ভলজাঁর মনে পড়ল না কী প্রতিশ্রুতি সে দিয়েছে। সে তাই চুপ করে রইল। এর আগের কথাগুলোই বিশপ ধীরে ধীরে নিচু গলায় বললেন, জাঁ ভলজাঁ, হে আমার ভাই, এখন আর কোনও পাপ নেই তোমার মধ্যে। এবার থেকে তুমি শুধু ভালো কাজ করে। যাবে। তোমার আত্মাকে যত সব কুটিল চিন্তা আর অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্য তোমার আত্মাকে কিনে নিয়েছি আমি এবং তার পর ঈশ্বরকে তা ফিরিয়ে দিয়েছি।
.
১২
শহর ছেড়ে একরকম ছুটতে ছুটতে ভলজাঁ গ্রামাঞ্চলে গিয়ে পড়ল। কোথায় কোন দিকে যাচ্ছে তার কিছু খেয়াল ছিল না তার। এইভাবে পথে পথেই সারা সকালটা কেটে গেল তার। এর মধ্যে কিছু সে খায়নি, কোনও ক্ষুধাও বোধ করেনি। যে অদ্ভুত চেতনা বা অনুভূতি তার মনটাকে তখন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তার মধ্যে ছিল এক ধরনের রাগ। কিন্তু এ রাগ কার ওপর তা সে জানে না। এই ঘটনায় সে সম্মান বা আঘাত কী পেয়েছে, তা সে বুঝতে পারছে না। গত কুড়ি বছরের মধ্যে কোনও কোনও অসতর্ক মুহূর্তে তার। মনে কোনও মমতামেদুর ভাব জাগলে সে কঠোরভাবে তা অবদমিত করেছে। তার মনের অবস্থা তখন সত্যিই বড় ক্লান্ত ছিল। সে ভয়ে ভয়ে বুঝল এতদিনের অন্যায় অবিচার আর দুর্ভাগ্যের চাপে তার মনের মধ্যে যে একটা ভয়ঙ্কর শান্ত নিষ্ক্রিয় ভাব গড়ে উঠেছিল, এখন সেটা ধসে পড়ছে। কিন্তু তার পরিবর্তে আবার কোন ভাব গড়ে উঠবে? এক একসময় আবার জেলখানায় ফিরে যেতে ইচ্ছা হয় তার, যা আগে কখনও হয়নি। জেলখানায় গেলে আর কিছু না হোক অন্তত কোনও দুশ্চিন্তা থাকবে না তার মনে। তখন বছরটা প্রায় শেষ হয়ে এলেও কিছু ফুল তখনও ছিল পথের ধারের বনে-ঝোপে। সেইসব বুনো ফুলের গন্ধে ছেলেবেলাকার কথা মনে পড়ল তার। বিস্মৃতির অতল গর্ভে সমাহিত সেইসব স্মৃতি সত্যিই দুঃসহ তার পক্ষে।
এইসব মানসিক অশান্তি আর গোলমালের মধ্য দিয়ে সারাটা দিন কেটে গেল তার। বিকালে সূর্য অস্ত যাবার সময় যখন সব বস্তুর ছায়াগুলো বড় বড় হয়ে উঠল তখন এক প্রান্তরের ধারে একটা ঝোঁপের পাশে সে বসল। প্রান্তরটা একেবারে ফাঁকা আর জনশূন্য। দূর দিগন্তের একদিকে আল্পস পর্বতের চূড়া অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। দিগনে শহর থেকে সে প্রায় সাত মাইল দূরে চলে এসেছে। একটা পায়ে চলা পথ তার পাশ দিয়ে প্রান্তরটা ভেদ করে দূরে চলে গেছে।
