জাঁ ভলজাঁ’র মনের সেই অনুভূতিটা অন্য কেউ তো দূরের কথা, সে নিজেই তা প্রকাশ করতে পারবে না। এক পরম প্রশান্তির সামনে অগ্রসরমান এক চরম হিংসার রূপকে কল্পনা করে নিতে হবে আমাদের। তার যে মুখে শুধু এক বিহ্বল বিব্রত বিস্ময় ছাড়া আর কিছুই ছিল না, সে মুখ দেখে তার মনের ভাব বোঝা সম্ভব ছিল না। সে নিচের দিকে মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনের কথা ধরতে পারাটা সম্ভব ছিল না কারও পক্ষে। তবে সে যে বিশেষ বিচলিত হয়ে পড়েছিল তা তার তখনকার চেহারা বা মুখচোখের ভাব দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু কী ধরনের আবেগ ছিল তার মনের মধ্যে, তা বোঝা যাচ্ছিল না।
বিছানা থেকে তার দৃষ্টিটা সরিয়ে নিল ভলজাঁ। তখন তার মুখচোখের ভাব থেকে। একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। তার মন তখন পরস্পরবিরুদ্ধ দুটি স্রোতের টানে ভেসে চলেছিল–একদিকে মৃত্যু আর একদিকে মুক্তি। হয় তাকে ঘুমন্ত বিশপের মাথাটাকে ভেঙে গুঁড়ো করে দিতে হবে অথবা তার হাতটাকে চুম্বন করতে হবে।
কিছুক্ষণ এইভাবে কেটে যাবার পর ভলজাঁ তার বাঁ হাত দিয়ে মাথা থেকে টুপিটা তুলে আর ডান হাতে সেই লোহার যন্ত্রটা ধরে দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে লাগল। বিশপ তখনও শান্তিতে ঘুমোচ্ছেন। তার ভয়ঙ্কর দৃষ্টি যেন ভেদ করতে পারছে না বিশপের শান্ত নিদ্রার আবরণটাকে। বিছানার পাশে আলনার উপরে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর একটা ছোট মূর্তি ছিল। যিশু যেন দু হাত বাড়িয়ে ঘরের মধ্যে দু জন লোকের একজনকে আশীর্বাদ আর একজনকে ক্ষমা দান করছেন।
ভলজাঁ হঠাৎ টুপিটা আবার মাথায় পরে ঘুমন্ত বিশপের দিকে না তাকিয়ে আলমারিটার কাছে চলে গেল। চাবিটা কাছে পেয়ে গেল বলে আর তালা ভাঙতে হল না। চাবি খুলে আলমারি থেকে রুপোর কাঁটাচামচের ঝুড়িটা নিয়ে আবার তার ঘরে চলে গেল। তার পর তার পিঠের ব্যাগটা খুলে তার মধ্যে রুপোর কাঁটাচামচগুলো ভরে নিয়ে বুড়িটা ফেলে দিল। ব্যাগটা পিঠে নিয়ে ছড়িটা হাতে ধরে খোলা জানালা দিয়ে বাগানে লাফ দিয়ে পড়ে পাঁচিলে উঠে বিড়ালের মতো একমুহূর্তে ওদিকের রাস্তাটায় পড়ল।
.
১১
পরদিন সকালে সূর্যোদয়ের সময় তার বাগানের কাজ করছিলেন মঁসিয়ে বিয়েনভেনু। এমন সময় ম্যাগলোরি ছুটতে ছুটতে উত্তেজিতভাবে তাঁর কাছে এল।
ম্যাগলোরি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, বঁসিয়ে মঁসিয়ে, আপনি জানেন রুপোর জিনিসপত্র রাখা ঝুড়িটা কোথায়?
বিশপ বললেন, হ্যাঁ জানি।
ম্যাগলোরি বলল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। জিনিসটা গেল কোথায় তা আমি বুঝতেই পারছিলাম না।
কিছুক্ষণ আগে খালি ঝুড়িটা বাগানের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখতে পান বিশপ। তিনি ঝুড়িটা তুলে ম্যাগলোরির হাতে দিয়ে বলেন, এই নাও।
ম্যাগলোরি বলল, কিন্তু এটা তো খালি। রুপোর জিনিসগুলো গেল কোথায়?
বিশপ বললেন, তা হলে তুমি রুপোর জিনিসগুলো চাইছ? সেগুলো কোথায় তা তো আমি জানি না।
ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন। সেগুলো চুরি গেছে। গতকাল রাতে যে লোকটা এসেছিল সেই সেগুলো চুরি করে নিয়ে গেছে।
এই বলে লোকটা অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট যে জায়গায় শুয়েছিল সেখানে ছুটে চলে গেল। সেখানে কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার ছুটতে ছুটতে ফিরে এল। বিশপ তখন ঝুড়ির চাপে পিষ্ট একটা ফুলগাছের উপর ঝুঁকে পড়ে কী দেখছিলেন।
ম্যাগলোরি বলল, মঁসিয়ে মঁসিয়ে, লোকটা চলে গেছে। রুপোর জিনিসগুলো সব চুরি করে নিয়ে গেছে।
কথা বলতে বলতে বাগানের চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল ম্যাগলোরি। দেখল রাস্তার দিকের বাগানের পাঁচিলের এক জায়গায় একটা-দুটো ইট খসে পড়েছে। ওই ভাঙা জায়গাটা যেন চোর পালানোর সাক্ষী হয়ে আছে।
ম্যাগলোরি বলল, ওই যে ওই পথে পালিয়েছে রাক্ষসটা। সে পাঁচিল পার হয়ে রাস্তায় চলে গেছে। আমাদের সব রুপোগুলো চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে।
কিছুক্ষণ ভাববার পর বিশপ গম্ভীরভাবে ম্যাগলোরির দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বললেন, প্রথম কথা ওগুলো কি সত্যি সত্যিই আমাদের ছিল?
হতবাক ও হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাগলোরি। কোনও কথা খুঁজে পেল না। কথাটার মানে কিছু বুঝতে পারল না।
বিশপ আবার বলতে লাগলেন, আমি দেখছি এতদিন ধরে জিনিসগুলো রাখা আমারই ভুল হয়ে গেছে। আসলে ওগুলো গরিব-দুঃখীদের জিনিস। যে লোকটা সেগুলো নিয়ে গেছে সে-ও গরিব নয় তো কি?
ম্যাগলোরি বলল, আমার বা আপনার বোনের জন্য বলছি না, মঁসিয়ে এবার থেকে কী করে খাবেন?
আপাত বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে বিশপ বললেন, টিন বা সিসের কাঁটাচামচ কিনে আনবে।
তার থেকে গন্ধ বার হবে।
তা হলে লোহার কাঁটাচামচ আনবে।
তার একরকম বাজে স্বাদ আছে।
তা হলে কাঠের কাঁটাচামচের ব্যবস্থা করবে।
কিছুক্ষণ পর খাবার ঘরের যে টেবিলে গতরাতে জাঁ ভলজাঁ বসে খেয়েছিল সেখানে বসে বিশপ তার বোনের পাশে বসে প্রাতরাশ খাচ্ছিলেন। একসময় খেতে খেতে তিনি খুশিমনে তার বোনকে বললেন, দেখ, আসলে কাঠের হোক বা যারই হোক, কোনও কাঁটাচামচের দরকাই নেই। একপাত্র দুধে একটা রুটি ডোবাতে কোনও কাঁটাচামচের দরকার হয় না।
ম্যাগলোরি নিজের মনে মনে স্বগতোক্তি করল, আর কীই-বা আশা করতে পার তুমি। একটা বাজে লোককে ঘরে থাকতে দিয়ে খাইয়ে ভালো বিছানায় শুইয়ে তার ফল পেলে কি না সেসব চুরি করে নিয়ে গেল। ঘৃণায় ও রাগে সর্বাঙ্গ আমার কাঁপছে।
