বাগানটা খুঁটিয়ে দেখার পর সে আবার তার ঘরের মধ্যে ফিরে এল। মনে হল এবার একটা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছে। তার পিঠের ব্যাগটা খুলে সে তার মধ্যে তার জুতোজোড়াটা ভরে নিল। তার পর পিঠের উপর ঝুলিয়ে নিয়ে টুপিটা মাথায় পরল। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা ছোট লোহার রড বর করে সে বিছানার উপর রেখেছিল। রডটার একদিকে সূচালো। সে এটা নিয়ে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে, তা বোঝা গেল না। তুলোঁর জেলখানায় সে যখন কাজ করত পাহাড়ে তখন এই ধরনের যন্ত্র পাথর কাটার কাজে ব্যবহার করত তারা।
সেই লোহার যন্ত্রটা এক হাতে নিয়ে ঘরের কোণ থেকে তার লাঠিটা তুলে আর এক হাতে নিল। তার পর সে পা টিপে নিঃশব্দে বিশপের শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দেখল দরজটা খোলা রয়েছে। বিশপ সেটা বন্ধ করেননি।
.
১০
ভলজাঁ কান পেতে কী শোনার চেষ্টা করল। কিন্তু কোনও শব্দ ছিল না সে ঘরে।
ভলজাঁ প্রথমে তার আঙুলের ডগা দিয়ে দরজাটায় একটু ঠেলা দিল। দরজাটা একটু ফাঁক হল, অথচ কোনও শব্দ হল না। কিন্তু দরজার সামনেই একটা টেবিল ছিল পথরোধ করে। সে দেখল দরজাটায় আরও জোরে একটু ঠেলা দিলে টেবিলটা সরে যাবে। সে তাই এবার জোরে ঠেলে দিল দরজাটা এবং তাতে জোর একটা ক্যাচ করে শব্দ হল।
ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল ভলজাঁর। ভয়ের আবেগে সেই মুহূর্তে তার মনে হল দরজাটার যেন এক অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে এবং তাই সেটা বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে দেবার জন্য কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করছে। কাঁপতে কাঁপতে ভয়ে পিছিয়ে এল সে। তার মনে হল তার নাকের প্রতিটি নিশাসের শব্দ যেন ঝড়ের গর্জন। তবে তার মনে হল এ শব্দ ঠিক ভূমিকম্পের শব্দ নয় এবং তাতে নিশ্চয় বাড়িটা জেগে উঠবে না। তবু সে ভাবল দরজার শব্দটায় জেগে উঠবে বৃদ্ধ বিশপ। তার বোন চিৎকার করে উঠবে। চারদিক থেকে সাহায্য করার জন্য লোক ছুটে আসবে। তার কেবলি মনে হতে লাগল আবার তার সর্বনাশ হয়ে গেল।
যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেইখানেই দাঁড়িয়ে রইল সে। নড়াচড়া করতে সাহস পেল না। এইভাবে কয়েক মুহূর্ত পার হয়ে গেল। দরজাটা তার সামনে তেমনি ভোলা রয়ে গেছে। সে সাহস করে একবার ভেতরে দেখল। দেখল কেউ জেগে ওঠেনি বা কেউ নড়াচড়া করছে না। ঘরের মধ্যে কোনও শব্দ শুনতে পেল না সে। বুঝল শব্দটা তা হলে কাউকে জাগাতে পারেনি।
বিপদটা কেটে গেল। যদিও তার বুকের মধ্যে একটা আলোড়ন চলছিল তবু সে পেছন ফিরে চলে গেল না। তার একমাত্র চিন্তা শুধু কাজটা সেরে ফেলা। এবার সে বিশপের শোবার ঘরে ঢুকে পড়ল।
ঘরের ভেতরটা দারুণ শান্ত ছিল। তবে তখনও কিছুটা অন্ধকার থাকায় ঘরের ভেতরে চেয়ার-টেবিল, কাগজপত্র, বই, টুল, পোশাক-আশাক প্রভৃতি যেসব জিনিসপত্র ছিল তা সে বুঝতে পারল না। আধো-আলো আধো-অন্ধকারে সেগুলোকে এক একটা বস্তুপুঞ্জ বলে মনে হল। সাবধানে পা টিপে এগিয়ে যেতে লাগল ভলজাঁ। ঘরের অপর প্রান্ত হতে ঘুমন্ত বিশপের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ কানে আসছিল তার। হঠাৎ যেটা সে চাইছিল সেটা বিছানার পাশে পেয়ে যাওয়ায় চমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
প্রকৃতি যেন অনেক সময় আমাদের কর্মাকর্মের ওপর গুরুগম্ভীরভাবে মন্তব্য করে আমাদের ভাবিয়ে তোলে সে বিষয়ে। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে আকাশে মেঘ জমে ছিল। ভলজাঁ যখন বিশপের বিছানার পাশে থমকে দাঁড়িয়েছিল তখন হঠাৎ মেঘটা সরে যেতেই এক ঝলক চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে বিশপের মুখের উপর পড়ল। বিশপ শান্তিতে ঘুমোচ্ছেন। রাত্রিতে খুব শীত থাকার জন্য বিশপ সে রাতে হাত পর্যন্ত বাদামি। রঙের একটা পশমি জ্যাকেট পরেছিলেন। তাঁর মাথাটা বালিশের উপর ঢলে পড়েছিল। তার হাতের আঙুলে একটা যাজকের আংটি ছিল। তাঁর যে হাত দুটি কত মানুষের কত মঙ্গল করেছে, কত উপকার করেছে, সে হাত দুটি চাদরের বাইরে ছড়ানো পড়ে আছে। তাঁর মুখের উপর ফুটে আছে অদ্ভুত এক প্রশান্তি, এক পরম তৃপ্তি আর পরম সুখের স্নিগ্ধ আলো, যে আলোর প্রতিফলন আর কোথাও দেখা যায় না। ধার্মিক লোকের আত্মা যে রহস্যময় স্বর্গীয় সুষমার অমৃতে মিলে মিশে এক হয়ে যায়।
মোট কথা, বিশপের মুখে তখন ছিল এক স্বর্গীয় জ্যোতি। এ জ্যোতি তার আপন অন্তরাত্মা থেকে বিচ্ছুরিত এক জ্যোতি, এ জ্যোতি তার আপন বিবেকের জ্যোতি। যে মূহূর্তে চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে তাঁর অন্তরের জ্যোতির সঙ্গে মিলিত হয়ে এক হয়ে গিয়েছিল তখন সেই ঘরখানার নরম অন্ধকারে তাঁর মুখের উপর একটা স্বর্গীয় জ্যোতি ফুটে উঠেছিল। চাঁদের উজ্জ্বলতা, বাড়ি আর বাগানের নিস্তব্ধতা, নৈশ পরিবেশের অটল প্রশান্তি–এইসব কিছু শিশুসুলভ এক অনাবিল ঘুমের মধ্যে ডুবে যাওয়া বিশপের শ্রদ্ধাজনক মুখখানার উপর এনে দিয়েছিল এমন এক প্রশান্ত গাম্ভীর্য আর মহত্ত্ব, যা ক্রমশই অচেতনভাবে ঈশ্বরানুভূতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
সেই লোহার যন্ত্রটা হাতে নিয়ে নৈশ ছায়ার মধ্যে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল জাঁ ভলজাঁ। বৃদ্ধ বিশপের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন ভয় হচ্ছিল তার। এমন দৃশ্য এর আগে কখনও দেখেনি সে। তার নীতি-চেতনার স্তরে দুই বিপরীত ভাবের এক তুমুল দ্বন্দ্ব চলছিল তখন। একদিকে এক পাপকর্মের অনুষ্ঠানে উন্মুখ প্রবৃত্তির পটভূমিকায় তার বিপন্ন বিবেকের অক্ষম উপস্থিতি আর একদিকে এক অসতর্ক ও নির্দোষ নিরীহ মানুষের সুগভীর নিদ্রা। এই নিঃসঙ্গ নীরব দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে জাঁ ভলজাঁ এক মহান ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন হয়ে উঠল ধীরে ধীরে।
