এর মানে সে বুঝতে পারল না। সে ভাবল তাকে ঠকিয়েছে তারা। জেলকর্তৃপক্ষ তার খাটুনির টাকা চুরি করে নিয়েছে।
জেল থেকে যেদিন সে ছাড়া পায় সেদিন সেখান থেকে বেরিয়ে পথ হাঁটতে হাঁটতে গ্রেসি নাম একটা জায়গাতে সে দেখল একটা কারখানার সামনে মাল নামানো হচ্ছিল। ওয়াগন থেকে। তখন সে সেখানে কুলির কাজ করতে চায়। সেখানে লোকের দরকার ছিল বলে মাল খালাস করার কাজে তাকে নিল তারা। সে যখন কাজ করছিল তখন একজন পুলিশ এসে তার পরিচয় জানতে চাইলে সে তার হলুদ টিকিটটা দেখায় তাকে। তার পর আবার কাজ করতে থাকে। দিনের শেষে একজন কুলিকে সে তাদের পারিশ্রমিক কত করে, তা জানতে চায়। তাকে বলা হয় এ কাজের রোজ হচ্ছে তিরিশ স্যু। কিন্তু ফোরম্যান লোকটা তার হলুদ টিকিট দেখতে পাওয়ায় সে তার কাছে থেকে মজুরি চাইতে গেলে সে তাকে মাত্র পঁচিশ স্যু দেয়। সে বার বার তিরিশ স্যু দাবি করলে ফোরম্যান তাকে বলে, নেবে নাও, না হলে আবার তোমাকে জেলে ঢুকতে হবে।
আবার সে বুঝতে পারল সে প্রতারিত হল। এর আগে সমাজ তাকে প্রতারিত করেছে। এবার সে পেল ব্যক্তিবিশেষের প্রতারণা। সে বুঝল জেল থেকে খালাস মানেই মুক্তি নয়। একটা লোক জেলখানা ত্যাগ করলেই সে মুক্ত হয় না, তার দণ্ড ঘোচে না। সমাজের কাছে সে চিরদণ্ডিতই রয়ে যায়।
গ্লেসিতে যে ঘটনা ঘটেছিল এই হল তার বিবরণ। দিগনেতে সে কী রকম অভ্যর্থনা লাভ করে, তা আমরা আগেই জেনেছি।
.
৯
গির্জার ঘড়িতে দুটো বাজতেই ঘুম থেকে জেগে উঠল জাঁ ভলজাঁ।
বিছানার অতিরিক্ত আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের অনুভূতিই ঘুমটা দীর্ঘ হতে দেয়নি তার। সে উনিশ বছর কোনও বিছানায় শোয়নি, তবু তক্তার কাঠই ছিল তার একমাত্র শয্যা। সে তার পোশাক না খুলেই শুয়ে পড়েছিল বিছানায়। ঘুমটা তার খুব একটা দীর্ঘায়িত না হলেও সে চার ঘণ্টা ঘুমিয়েছিল আর তাতে তার দেহের ক্লান্তিটা দূর হয়ে যায় একেবারে। কখনই খুব বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমোয় না ভলজাঁ।
চোখ মেলে অন্ধকারেই একবার তাকাল সে। তার পর আবার ঘুমিয়ে পড়ার জন্য বন্ধ করল চোখ দুটো। কিন্তু গতকাল সারাদিন বিভিন্ন রকমের আবেগানুভূতি আর চিন্তার পীড়নে মস্তিষ্কটা গরম থাকায় ঘুমটা ভাঙার পর আর নতুন করে ঘুম এল না তার। সে আর ঘুমোতে পারল না; শুয়ে শুয়েই ভাবতে লাগল।
তার মনের মধ্যে জোর আলোড়ন চলছিল তখন। নতুন-পুরনো অনেক চিন্তা আসা-যাওয়া করতে লাগল তার মনে। অনেক চিন্তা এল আর চলে গেল। কিন্তু একটা চিন্তা বারবার ফিরে আসতে লাগল। সে চিন্তা অন্য সব চিন্তাকেই মুছে দিতে লাগল জোর করে। সে চিন্তা হল বিশপের টেবিলের উপর নামিয়ে রাখা রুপোর কাঁটাচামচগুলো।
খাবার সময় টেবিলের উপর সেগুলো দেখেছিল সে। তার পর দেখেছিল শোবার সময় ম্যাগলোরি সেগুলো বিশপের ঘরের ভেতর আলমারিতে রাখে। সে দেখে নিয়েছে খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে বিশপের ঘরে ঢুকলেই ডান দিকের আলমারিতে আছে সেগুলো। সেই খাঁটি রুপোর জিনিসগুলো বিক্রি করলে তার থেকে অন্তত দুশো ট্র্য পাওয়া যাবে। সে উনিশ বছরের মধ্যে যা রোজগার করছে তার দ্বিগুণ, যদিও জেলকর্তৃপক্ষ তাকে না ঠকালে সে আরও কিছু বেশি পেত।
পুরো এক ঘণ্টা সে দারুণ অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে ভুগতে লাগল; কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারল না। গির্জার ঘড়িতে তিনটে বাজল। সে চোখ খুলে বিছানায় বসল। বিছানার পাশে পড়ে যাওয়া পিঠের ব্যাগটা কুড়িয়ে নিল। পা দুটো ঝুলিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইল সে। সারা বাড়িটার মধ্যে একমাত্র সে-ই জেগে ছিল। হঠাৎ পা থেকে জুতো দুটো খুলে পাপোশের কাছে রেখে দিয়ে আবার ভাবতে লাগল।
সেই কুৎসিত চিন্তাটা ভারী বোঝার মতো আবার আসা-যাওয়া করতে লাগল মনের মধ্যে। তার মাঝে মাঝে অন্য অপ্রাসঙ্গিক চিন্তাও আসতে লাগল। ব্রিভেত নামে জেলখানার এক কয়েদি তার পায়জামাটা পা থেকে গুটিয়ে বেঁধে রাখল সুতোর একটা দড়ি দিয়ে।
সকাল পর্যন্ত হয়তো এইভাবে বসে বসেই ভাবত ভলজাঁ। কিন্তু ঘড়িতে সাড়ে তিনটে বাজার একটা ঘন্টা পড়তেই সচকিত হয়ে ওঠে আবার।
এবার সে উঠে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনতে লাগল বাড়ির কোথাও কোনও শব্দ শুনতে পাওয়া যায় কি না। দেখল গোটা বাড়িটা তখনও নীরব। সে জানালাটা কোথায় তা বুঝতে পেরে সেদিকে এগিয়ে গেল। রাত্রির অন্ধকার ছিল তখনও। আকাশে সেদিন পূর্ণ চাঁদ থাকার কথা হলেও ভাসমান মেঘমালায় চাঁদটা মাঝে মাঝে চাপা পড়ে যাওয়ায় আলো-ছায়ার খেলা চলছিল আকাশে। মেঘে চাঁদটা ঢাকা পড়ে যেতেই অন্ধকারটা গাঢ় দেখাচ্ছিল।
ঘরের ভেতরটা গোধূলির ধূসর অস্পষ্ট আলোয় কিছুটা আলোকিত ছিল। তাতে ঘরের মধ্যে যাতায়াত করা যায়। জানালার কাছে ভলজাঁ দেখল জানালাটা শুধু একটা ছিটকিনি দিয়ে আঁটা আছে। কপাটটা খুললেই আর কোনও বাধা নেই। জানালাটা দিয়ে সহজেই বাগানে যাওয়া যায়। জানালাটা খুলতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া এসে ঘরে ঢুকতেই জানালাটা বন্ধ করে দিল সে। এবার বাগানটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। দেখল বাগানটা চারদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা আছে। পাঁচিলটাতে অবশ্য ওঠা সহজ। বাগানের ওপারে গাছে ঘেরা একটা বড় অথবা ছোট রাস্তা আছে।
