.
৭
জাহাজের যাত্রীটি লাফিয়ে পড়ল জলে।
কিন্তু জাহাজ থামল না। অনুকূল বাতাসের সহায়তায় ধ্বংসোনুখ জাহাজটা এগিয়ে চলেছে চরম পরিণতির দিকে। আত্মহননের লক্ষ্য থেকে কোনওমতেই বিচ্যুত হবে না যেন সে। সেই পথে অনিবারণীয় অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলতে লাগল সে।
লোকটা জলে ডুব দিয়ে আবার উঠে এল। সে দু হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু কেউ তার কথা শুনতে পেল না। বাতাসের আনুকূল্যে জাহাজ তার কাজ করে যেতে লাগল। কিন্তু যে যাত্রীটি জাহাজ থেকে জলে ঝাঁপ দিল তার কী হল, তা জাহাজের নাবিক বা কোনও যাত্রীর সেদিকে কোনও নজর ছিল না। অন্তহীন বিশাল সমুদ্রে যেন সূচ্যগ্রপ্ৰমাণ এক চিহ্ন।
লোকটা হতাশ হয়ে অপস্রিয়মাণ জাহাজটার পানে তাকিয়ে ডাকতে লাগল। কিন্তু ভূতের মতো দেখতে জাহাজটা দ্রুত আড়াল হয়ে গেল তার দৃষ্টিপথ থেকে। কিছুক্ষণ আগেও সে ওই জাহাজেই ছিল। নাবিকরা অন্য সব যাত্রীর সঙ্গে ডেকের উপর ছিল। সে-ও তাদের সকলের সঙ্গে সমান ভাবে আলো-বাতাস ভোগ করেছে। কিন্তু তার একটু পরেই সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দেয়।
চারদিক থেকে দানবিক ঢেউগুলোর আঘাতের সঙ্গে লড়াই করতে লাগল, সে চঞ্চল বাতাসের আঘাতে ঢেউগুলো সব উত্তাল হয়ে উঠল। তার মুখে সমুদ্রের নোনা জল এসে লাগতে লাগল। যে ভয়ঙ্কর সমুদ্রটা তাকে গ্রাস করতে চাইছে সেই অন্ধকার সমুদ্রটাই তার কাছে ঘৃণার এক মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠল।
তবু সে মরিয়া হয়ে সাঁতার কেটে যেতে লাগল। ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তার শক্তি ক্ষয় হতে লাগল। সে মাথার উপর দেখল ঘন মেঘমালা আকাশটাকে আচ্ছন্ন। করে আছে। সারা সমুদ্রের অনন্ত পটভূমিজুড়ে মূর্তিমান মৃত্যুকে যেন হেঁটে বেড়াতে দেখল সে। পৃথিবীর দূর প্রান্ত থেকে অজানা কতসব দূরাগত শব্দের ধ্বনি শুনতে পেল সে। আকাশে মেঘমালার কোলে কোলে পাখি উড়ে বেড়াচ্ছিল। মানুষের দুঃখ-দুর্দশার মাঝে দেবদূতেরা পাখা মেলে উড়ে আসে। কিন্তু সে দেবদূতেরা কী করতে পারে তার জন্য? তারা শুধু গান করতে করতে পাখা মেলে উড়ে যায় আর সে শুধু বাঁচার জন্য। সংগ্রাম করে যায়।
অনন্ত আকাশ আর অনন্ত সমুদ্রের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলল সে। সমুদ্র হচ্ছে এক বিশাল সমাধিগহ্বর আর আকাশ হচ্ছে শবাচ্ছাদন। তখন অন্ধকার ঘন হয়ে আসছিল। যতক্ষণ তার শক্তি ছিল দেহে ততক্ষণ সে সমানে সাঁতার কেটে এসেছে। এদিকে জাহাজটা তার যাত্রীদের নিয়ে অনেকক্ষণ আগেই কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। গোধূলির বিশাল ছায়ান্ধকারে এক অসহায় নিঃসঙ্গতার মাঝে সে শুধু অনুভব করল চারদিক থেকে অসংখ্য তরঙ্গমালা তার কাছে ছুটে আসছে। শেষবারের মতো একবার ভয়ে চিৎকার করে উঠল সে। কোনও মানুষকে ডাকল না। কিন্তু ঈশ্বর কোথায়?
যে কোনও বস্তু বা ব্যক্তি যার নাম ধরেই ডাকুক না কেন, কেউ কোনও সাড়া দিল না সে ডাকে। না সমুদ্রের জলরাশি, না অনন্ত প্রসারিত আকাশ কেউ সাড়া দিল না তার ডাকে। সে সমুদ্র ও বাতাসকে ডাকল। কিন্তু তারা যেন একেবারে বধির। তার চারদিকে গোধূলির ধূসর অন্ধকার, অন্তহীন নিঃসঙ্গতা আর উদ্দাম অবিরাম জলকল্লোল। তার অন্তরে তখন শুধু শঙ্কা আর অবসাদ, তার তলদেশে তখন অতলান্তিক শূন্যতা। পায়ের তলায় দাঁড়াবার কোনও জায়গা নেই। সে শুধু বুঝতে পারল তার দেহটা অন্ধকারে ভেসে চলেছে। ঠাণ্ডায় অসাড় হয়ে আসছে তার সর্বাঙ্গ। তার হাত দুটো মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে আছে, কিন্তু সে হাতে কিছুই ধরা নেই। শুধু বাতাস, সমুদ্রের কল্লোল আর আকাশের তারাদের অর্থহীন চাউনি। করবে সে? হতাশা চায় আত্মসমর্পণ, ক্লান্তি বা অবসন্নতা চায় মৃত্যু। সে-ও অবশেষে সব সগ্রাম ত্যাগ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। সে ডুবে গেল।
এই হল মানবসমাজের এক অপরিণামদর্শী অগ্রগতি। তার চলার পথে কত জীবন, কত আত্মা নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছে তার দর্পিত পদভরে। এ যেন এক আশ্চর্য মহাসমুদ্র যার মধ্যে নিষ্ঠুর আইনের দ্বারা নির্বাসিত কত মানুষ কোনও সাহায্য না পেয়ে নৈতিক মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হয়েছে। এই সমুদ্র হচ্ছে নির্মম নিষ্করণ এক সামাজিক অন্ধকার, দুঃখের অতলগর্ভ খাদ যার মধ্যে আইনে দণ্ডিত হতভাগ্য মানুষদের সমাজ ফেলে দেয়। যেসব মানুষের আত্মা এই সমুদ্রগর্ভে সমাধি লাভ করে তাদের কেউ উদ্ধার করতে পারে না।
.
৮
জেলখানা থেকে বার হবার সময় জাঁ ভলজাঁ যখন তুমি মুক্ত’ এই কথা দুটো শুনল তখন সে যেন তা বিশ্বাস করতে পারছিল না, অবিশ্বাসের অন্ধকারে মনটা যেন ধাঁধিয়ে গেল তার। সহসা যেন আলোর একটা তীর এসে চোখ দুটোকে বিদ্ধ করল তার। সে আলো হল জীবনের আলো, জীবন্ত মানুষের আলো। কিন্তু ফুটে উঠতে না উঠতে সে আলো ম্লান হয়ে গেল মুহূর্তে। স্বাধীনতার কল্পনায় সে যেন অভিভূত হয়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে এক নতুন জীবনের আশ্বাসে সঞ্জীবিত হয়ে উঠল সে। কিন্তু হাতে একটা হলুদ টিকিট পাবার সঙ্গে সঙ্গেই তার স্বাধীনতার অর্থটা বুঝতে পারল।
এর পরেও ছিল আরও মোহমুক্তি। সে আগে ভেবেছিল এতদিন কারাগারে কাজ করে যে টাকা উপার্জন করেছে তা সব মিলিয়ে হবে একশো সত্তর ফ্রাঁ কিন্তু রবিবারগুলোর খাটুনি সে ভুল করে ধরেছিল। সেসব বাদ দিয়ে সে মোট পেল একশো উনিশ ফ্রাঁ পনেরো স্যু।
