একটা কথা অবশ্যই বলা উচিত যে জেলখানার অন্য কয়েদিদের থেকে জাঁ ভলজাঁর দৈহিক শক্তি অনেক বেশি ছিল। যে কোনও শক্ত কাজে সে ছিল চারটে লোকের সমান। সে অনেক ভারী ভারী বোঝা তুলতে পারত। একবার তুলোর টাউন হল মেরামতের একটা কাঠের ভারী বাড়ি পড়ে যাবার উপক্রম হলে সাহায্য না আসা পর্যন্ত ভলজাঁ কাঁধে করে বেশ কিছুক্ষণ সেটাকে ধরে রাখে।
তার দৈহিক শক্তির থেকে বুদ্ধি ও কৌশল আরও বেশি ছিল। যেসব দেয়াল বা কোনও খাড়া পাহাড়ে কোনও হাত-পা রাখার জায়গা নেই, সেসব দেয়াল বা পাহাড়ের উপর সে অবলীলাক্রমে উঠে যেত এক সুদক্ষ জাদুকরের মতো। এইভাবে যেকোনও তিনতলা বাড়ির ছাদের উপর উঠে যেতে পারত সে।
সে খুব কম কথা বলত এবং হাসত না কখনও। তার মুখ থেকে কোনও জোর হাসি বা অট্টহাসি বার করা খুবই কঠিন ছিল। কখনও সে মনে কোনও প্রবল আবেগ না জাগলে সে কখনও হো হো শব্দে হাসত না। তাকে দেখলেই মনে হত সে যেন সব সময় ভয়ঙ্কর এক চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে।
এইভাবে দিন কাটাত সে। এক অসংগঠিত অসংহত চরিত্রের অলস উপলব্ধি আর অসংগত বুদ্ধিবৃত্তির ভারী বোঝাভার নিয়ে এক অন্তহীন বিহ্বলতার সঙ্গে সে শুধু এই কথা অনুভব করে যেত যে এক বিরাট দানবিক শক্তি সব সময় পীড়ন করে চলেছে তাকে। অস্বচ্ছ অপ্রচুর আলোর যে বৃত্তসীমা তার জীবনকে ঘিরে রেখেছিল সে বৃত্তের বাইরে উধ্বালোকে তাকিয়ে সে কি কিছু দেখার চেষ্টা করত? যদি তা করত তা হলে সে ভয় আর ক্রোধের এক মিশ্র অনুভূতির সঙ্গে দেখতে পেত আইন, কুসংস্কার, মানুষের সমাজজীবন ও ব্যক্তিজীবনের অসংখ্য তথ্যপুঞ্জ সমন্বিত পিরামিডের মতো এক অদ্ভুত আকারের সুবিশাল সৌধ দাঁড়িয়ে আছে তার মাথার উপরে যে সৌধকে আমরা সভ্যতা বলে অভিহিত করে থাকি। সেই অদ্ভুত সৌধের পুঞ্জীভূত রূপটাই অভিভূত করত তাকে। তার মধ্যস্থিত উপাদানগুলো পৃথকভাবে স্পষ্ট করে বুঝতে পারত না সে। তবে মাঝে মাঝে সেই তথ্যপুঞ্জের ফাঁকে ফাঁকে কতকগুলি জিনিসকে স্পষ্ট করে দেখতে পেত সে যেমন জেলখানার প্রহরী, পুলিশ, বিশপ আর সবার উপর মুকুটমণ্ডিত সম্রাট। এইসব দূরস্থিত ঐশ্বর্যের বস্তুগুলো কমানোর পরিবর্তে বাড়িয়ে দিত তার মনের অন্ধকারটাকে। সে দেখত কত মানুষ আসা-যাওয়া করছে তার মাথার উপর দিয়ে। কত আইন, প্রথা, কুসংস্কার, গোঁড়ামি, মানবজীবনের কত ঘটনা প্রভৃতির অজস্র উপাদানে ঈশ্বর যে সভ্যতাকে জটিল করে তুলেছেন সে সভ্যতা শান্ত নিষ্ঠুর এক ঔদাসীন্যের চাপে তার আত্মাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। যারা দুঃখ-বিপর্যয়ের অতল গহ্বরে পতিত, যারা নরকের অন্ধকারে দিশাহারা, যারা সমাজ ও আইনের দ্বারা অবজ্ঞাত ও ধিকৃত সেইসব হতভাগ্য মানুষ তাদের ঘাড়ের উপর এক নিষ্করুণ সমাজের দুর্বিষহ বোঝাভার অনুভব করে চলে। সে বোঝাভার দেখে বাইরের লোকেরা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। এই অবস্থার মধ্যে জাঁ ভলজাঁ কী সব ভাবত। কিন্তু কী ভাবত সে?
জাঁতাকলের মাঝখানে সামান্য এক শস্যদানার চিন্তা ছাড়া আর কোন চিন্তা বিষয়বস্তু হতে পারে তার কল্পনার সঙ্গে বাস্তব এবং বাস্তবের সঙ্গে কল্পনা মিশে তার মনের কাঠামোটাকে এমন করে তুলেছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। জেলখানায় কঠোর শ্রমের কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে কী ভাবত সে। তার সে যুক্তিবোধ আগের থেকে আরও পরিণত ও আরও বিচলিত হয়ে উঠেছিল তা এক সহজ অবিশ্বাসের মধ্যে ঢলে পড়ত। যেসব ঘটনা তার সামনে ঘটত সেসব ঘটনার মানে বুঝতে না পেরে তাদের অকল্পনীয় ও অচিন্ত্যনীয় মনে হত। বড় অদ্ভুত মনে হত তার চারপাশের জগৎকে। নিজের মনে মনে বলত, এইসব কিছুই স্বপ্ন। যে প্রহরী তার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত তাকে ভূত বলে মনে হত তাকে কোনও আঘাত না করা পর্যন্ত।
প্রকৃতিজগৎ সম্বন্ধে তার কোনও চেতনাই ছিল না। জাঁ ভলজাঁ সম্বন্ধে একথা বলা প্রায় ঠিক হবে সে সূর্যের কোনও অস্তিত্ব ছিল না তার কাছে। একমাত্র ঈশ্বরই জানেন কোন সত্যের আলোয় প্রতিভাত হয়ে থাকত তার আত্মা।
জাঁ ভলজাঁর উনিশ বছরের সশ্রম কারাজীবন তার জীবন ও আত্মাকে যেন ভেঙেচুরে নতুন রূপে গড়ে তুলেছিল। ফলে সমাজের কাছ থেকে যে অন্যায় অত্যাচার ও উৎপীড়ন তাকে সহ্য করতে হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মন তার বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সমাজের প্রতি প্রতিশোধবাসনা জাগে তার অন্তরে। এই প্রতিশোধবাসনার বশবর্তী হয়ে সে দুই ধরনের কুকর্ম করে বসত। এক একসময় সে কোনও ভাবনা-চিন্তা না করে অন্ধ ক্রোধের আবেগে অনেক কুকর্ম করে বসত। আবার অনেক সময় ঠাণ্ডা মাথায় যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে অনেক অন্যায় করে বসত। তবে তার সকল অন্যায়, কুকর্ম বা অপকর্মের পেছনে সমাজের বিরুদ্ধে এক দুর্মর দুর্জয় প্রতিশোধবাসনা কাজ করে যেত। তার এই শেষোক্ত যুক্তিভিত্তিক কুকর্ম করার আগে তার মনের সব ভাবনা-চিন্তা পরপর তিনটি স্তর অতিক্রম করে এক সিদ্ধান্তে উপনীত হত। এই তিনটি স্তর ছিল–যুক্তি, সংকল্প আর গোঁড়ামি। তার সমস্ত আবেগ ও প্রবৃত্তি ক্রোধ, তিক্ততা আর পীড়নজনিত এক চেতনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও অনুশাসিত হত। তার এই ক্রোধাবেগ অনেক সময় কোনও নিরীহ নির্দোষ লোক তার সামনে পড়ে গেলে তার ওপরেও বর্ষিত হত। তার সমস্ত চিন্তার শুরু এবং শেষে ছিল মানব সমাজে প্রচলিত আইন-কানুনের প্রতি এক তীব্র ঘৃণা। সাধারণত এই ভয়ঙ্কর ঘৃণা কোনও ঐশ্বরিক বিধানের দ্বারা প্রতিহত না হলে তা বাড়তে বাড়তে সমস্ত সমাজ, মানবজাতি ও ঈশ্বরের সৃষ্টি সকল বস্তুকে গ্রাস করে ধীরে ধীরে। তখন সে সমগ্রভাবে মনুষ্যবিদ্বেষী হয়ে ওঠে। যে কোনও লোকের ক্ষতি করার এক দুর্বার বাসনায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। জেল থেকে বেরিয়ে যে হলুদ টিকিট তার কাছে সব সময় থাকত সে টিকিটের উপর লেখা ছিল, অতিশয় বিপজ্জনক ও ভয়ঙ্কর লোক। দিনে দিনে তার অন্তরাত্মাটা একেবারে শুকিয়ে যায়। জগৎ ও জীবনকে দেখার সহজ, স্বাভাবিক ও স্বচ্ছ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে সে। তার উনিশ বছরের কারাজীবনের মধ্যে কোনওদিন একফোঁটা চোখের জল ফেলেনি সে।
