তুলোতে যাজকদের দ্বারা পরিচালিত একটা স্কুল আছে। যে হতভাগ্য শিক্ষাদীক্ষাহীন লোক পড়াশুনো করতে চায় তাদের সেখানে লেখাপড়া শেখানো হয়। সেই স্কুলে জাঁ ভলজাঁ কিছুদিন গিয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল চল্লিশ। সেখানে সে লিখতে, পড়তে ও কিছু অঙ্ক কষতে শেখে। কিন্তু তখন তার মনে শুধু এই চিন্তাই ছিল যে তার মনের উন্নতিসাধন করা মানে যুক্তি দিয়ে তার ঘৃণার ভাবটাকে সুরক্ষিত করা। অনেক অবস্থায় দেখা যায় মানুষের শিক্ষা আর জ্ঞান তার কুভাব ও কুমতিকে বাড়িয়ে দেয়।
সমাজকে তার দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী করে ধিক্কার দিতে গিয়ে ঈশ্বরের যে বিধান সমাজকে সৃষ্টি করেছে সেই বিধানের ওপরেই সে বিরূপ রায় দান করে বসে এবং সে বুঝতে পারে এটা তার অন্যায়। ফলে নিজেকেও সে ধিক্কার দেয়। সুতরাং তার উনিশ বছরের এই পীড়ন ও দাসত্বের কালে তার আত্মা একই সঙ্গে প্রসারিত ও সঙ্কুচিত হয়। একদিকে তার মধ্যে আলো প্রবেশ করে আর সঙ্গে সঙ্গে আর এক দিকে অন্ধকার প্রবেশ করে।
আমরা দেখেছি ভলজাঁ আসলে খারাপ প্রকৃতির লোক ছিল না। যখন সে কারাগারে যায় তখনও তার মধ্যে সদ্গুণ ছিল। কারাগারে থাকাকালে সমাজকে ধিক্কার দিতে গিয়ে পাপবোধ জাগে তার মধ্যে। ঈশ্বরকে ধিক্কার দিয়ে সে অধর্মাচরণ করছে একথা সে জানত।
এখানে একটা কথা ভাববার আছে।
কোনও মানুষের স্বরূপ বা স্বভাবটাকে কি সমগ্র ও মূলগতভাবে পাল্টানো যায়? যে মানুষ ঈশ্বরের বিধানে সৎ প্রকৃতির হয়ে জন্মেছে তাকে কি অন্য মানুষ অসৎ ও দুষ্ট প্রকৃতির করে তুলতে পারে? ভাগ্য কি মানুষের আত্মাকে নতুন করে অন্য রূপে গড়ে তুলতে পারে এবং কারও ভাগ্য খারাপ বলে সে-ও কি খারাপ হয়ে উঠতে পারে? প্রতিকূল অবস্থা বা দুর্ভাগ্যের চাপে কারও অন্তর কি একেবারে বিকৃত ও কুৎসিত রূপ ধারণ করতে পারে? কোনও উঁচু স্তম্ভকে কি নিচু ছাদ দিয়ে ঢাকা যায়? প্রতিটি মানবাত্মার মধ্যে কি দেবভাবের এমন এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নেই যা ইহলোকে ও পরলোকে অমর ও অবিনশ্বর, যা সহজাত সততার দ্বারা পুষ্ট ও সংরক্ষিত হয়ে গৌরবময় ও অনির্বাণ এক আলোকশিখায় পরিণত হয়, যাকে কোনও পাপ সম্পূর্ণরূপে নির্বাপিত করতে পারে না।
এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল প্রশ্ন। কোনও মনোবিজ্ঞানী যদি আইনের দ্বারা দণ্ডিত, সমাজ ও সভ্যতার দ্বারা ধিকৃত জাঁ ভলজাঁকে শ্রমহীন কোনও শান্ত অবকাশে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ বুকে নিয়ে চিন্তান্বিতভাবে বসে থাকতে দেখতেন তা হলে তিনি ওইসব জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন না।
এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তিনি তা পারতেন না। সেই মনোবিজ্ঞানী পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারতেন জাঁ ভলজাঁর মনের মধ্যে যে দুরারোগ্য ব্যাধি ঢুকেছে তার জন্য তিনি দয়া বোধ করতেন কিন্তু তার কোনও প্রতিকার করতে পারতেন না। দান্তে যেমন নরকের দ্বারে গিয়ে এক বিশাল অন্ধকার খাদ দেখে চমকে উঠেছিলেন। তেমনি তিনি জাঁ ভলজাঁর আত্মার মধ্যে এক বিশাল শূন্যতা দেখে ভয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। তার কপালে ঈশ্বর যে আশার কথা তার আঙুল দিয়ে লিখেছেন সে কথা তিনি মুছে দিতেন।
কিন্তু ভলজাঁর ব্যাপারটা কী? তার যে আত্মিক সরল অবস্থার কথা আমরা পাঠকদের কাছে চিত্রিত করেছি, সে অবস্থাটা কি তার কাছেও তেমনি সরল ছিল? তার নৈতিক অধঃপতনের মধ্যে মূলে যেসব উপাদান কাজ করেছিল তা কি সে স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিল? তার মতো অশিক্ষিত স্থল প্রকৃতির এক মানুষ কি কখন কিভাবে ক্রমান্বয়ে তার আত্মা ওঠানামা করতে করতে তার নীতিচেতনার শূন্য গভীরে তলিয়ে যায় তার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে পারে? আমরা তা পারব না এবং আমরা সেটা বিশ্বাস করতে পারব না। এত দুঃখকষ্টের পরেও তার অজ্ঞতার জন্য সে সরলভাবে চিন্তাগুলোকে সাজিয়ে কোনও কিছু বিশ্লেষণ করতে পারল না। অনেক সময় সে তার আপন অনুভূতিরই তল খুঁজে পেত না। সে যে ছায়ার মধ্যে বাস করত, ছায়ার মধ্যেই কষ্ট ভোগ করত, সে ছায়াকে ঘৃণা করত, সে যেন নিজেকে নিজে ঘৃণা করত। সে একজন অন্ধ লোকের মতো মনের অন্ধকারে কী যেন হাতড়ে বেড়াত, স্বপ্নবিষ্টের মতো সেখানে থাকত সব সময়। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত দুঃখভোগের জন্য এক প্রচণ্ড ক্রোধের আবেগে ফেটে পড়ত সে। সে ক্রোধের একটি অগ্নিশিখা তার সমস্ত আত্মাকে আলোকিত করে তার জীবনপথের সামনে-পেছনে যেসব নিয়তিসৃষ্ট ফাঁক ছিল তার উপর এক জ্যোতি বিকীরণ করত।
কিন্তু এইসব আলোর ছটা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই অপসৃত হয়ে পড়ত। ফলে আবার অন্ধকার ঘন হয়ে উঠত তার চারদিকে। সে কোথায় তা নিজেই বুঝতে পারত না।
এই ধরনের শাস্তির মধ্যে এমন এক নির্মম পাশবিকতা আছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের মনটাকে ক্ষয় করে ফেলে তাকে পশুতে পরিণত করে তোলে। এক একসময় হিংস্র হয়ে ওঠে সে পশু। জাঁ ভলোর বারবার পালিয়ে যাবার চেষ্টা মানবাত্মার ওপর আইনের কঠোরতার এক অভ্রান্ত প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নয়। সে কখনও কোনও সুযোগ পেলেই পরিণাম বা অতীত অভিজ্ঞতার কথা কিছু না ভেবেই বারবার পালাবার চেষ্টা করত। রুদ্ধদ্বার নেকড়ে বাঘের মতো দরজা খোলা পেলেই সে পাগলের মতো ছুটে যেত সেই দিকে। তার সহজাত প্রবৃত্তি তাকে সে দরজা দিয়ে পালাতে বলত, আর যুক্তিবোধ তাকে সেখানেই থাকতে বলত। এই ধরনের এক প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্বে অদৃশ্য হয়ে যেত তার যুক্তিবোধ। ফলে তার মধ্যে পশুটাই রয়ে যেত এবং সে ধরা পড়লে তাকে যে বাড়তি শাস্তি দেওয়া হত তা সেই পশুর হিংস্রতাকে বাড়িয়ে দিত।
