.
৬
এ প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করা উচিত আমাদের। আমাদের মনে হয় এ সব দিকে সমাজের নজর দেওয়া উচিত। এটা সমাজেরই কাজ।
আমরা আগেই বলেছি জাঁ লেখাপড়া শিখতে পারেনি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে সে নির্বোধ ছিল। সহজাত বুদ্ধির একটা স্ফুলিঙ্গ তার মধ্যে ছিল। যে দুঃখ আগুনের দেহ এনেছিল তার জীবনে, সেই দুঃখই আলোর এক অপূর্ব জ্যোতি নিয়ে আসে। প্রথম প্রত্যূষের আলোর মতো সে জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তার মনের প্রতিটি দিক-দিগন্ত। যতই সে বেত্রাঘাতে জর্জরিত হয়েছে, শৃঙ্খলের বন্ধনে আপীড়িত হয়েছে, কঠোর পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, নির্জন কারাকক্ষের নিঃসঙ্গতায় অশান্ত হয়ে উঠেছে, ভূমধ্যসাগরীয় সূর্যের জ্বলন্ত আগুনে দগ্ধ হয়েছে এবং কাঠের তক্তার কাঠিন্যে নিদ্রা তার বিঘ্নিত হয়েছে প্রতি রাত্রে, ততই সে নিজের বিবেকের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে শুধু ভেবেছে।
সে একাধারে নিজেই নিজের বিচারক ও জুরি হয়ে নিজের মামলার নিজেই বিচার করেছে।
সে যে অন্যায়ভাবে দণ্ডিত এক নির্দোষ নিরপরাধ লোক নয়, একথা সে স্বীকার করেছে। আবেগের আতিশয্যবশত যে কাজ সে করে ফেলেছে তা অবশ্যই নিন্দার্য।
যে পাঁউরুটি সে চুরি করেছিল তা চাইলে হয়তো সে পেত আর যদি চাইলে তাকে না দিত সে দান অথবা কর্মপ্রাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারত। কিন্তু কোনও অর্ধভুক্ত মানুষ কি অপেক্ষা করতে পারে, এ প্রশ্ন কেউ করলে তার উত্তরে বলা যায় ক্ষুধার জ্বালায় খুব কম লোকই মরে। মানুষের দেহমন এমনভাবে গঠিত যে দীর্ঘকাল দুঃখকষ্ট ও নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করেও সে কখনও মৃত্যুমুখে পতিত হয় না। তাকে আরও কিছুদিন ধৈর্য ধরতে হত এবং তা হলে তার দিদির ছেলেমেয়েদের সুবিধা হত। সমাজকে গলা টিপে ধরে মারতে যাওয়ার আগে তার সীমিত ক্ষমতার কথাটা ভাবা উচিত ছিল। চুরির রাস্তা ধরে সে দারিদ্রের কবল থেকে মুক্ত হবে, তার এই ধারণাটাকে প্রশ্রয় দিয়ে নির্বোধের মতো কাজ করেছে সে। যে মানুষকে অখ্যাতির পথে নিয়ে যায় সে পথ কখনও মুক্তির পথ হতে পারে না। মোট কথা, সে যে অন্যায় করেছে একথা অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করেছে সে।
কিন্তু এরপর নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে কতকগুলি। সে কি শুধু একাই এ কাজ করে বসেছে? কাজ করতে ইচ্ছুক কোনও লোক যদি কাজ বা খাদ্য না পায় তা হলে সেটা কি একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়? তাছাড়া দোষ স্বীকার করাটাই কি একটা ভয়ঙ্কর শাস্তি নয়? সে অপরাধ করে যত না অন্যায় করেছে, আইন তাকে লঘু পাপে গুরু শাস্তি দিয়ে কি তার থেকে অনেক বেশি অপরাধ করেনি? ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লায় শাস্তির দিকটা কি ঝুঁকে পড়েনি? এইভাবে একদিকের পাল্লা ভারী হয়ে ঝুঁকে পড়ায় তার ফল কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে যায়। সে অপরাধী তার দিকে পাল্লাটা না ঝুঁকে ঝুঁকল সেই দিকে যেদিকে চাপানো ছিল শাস্তির বোঝা। পালাবার চেষ্টার জন্য কারাদণ্ডের দেয়ালটা বারবার বাড়িয়ে দেওয়া কি দুর্বলের ওপর সবলের এক ধরনের আক্রমণাত্মক অত্যাচার নয়? এটা কি ব্যক্তির ওপর সমাজের অবিচার নয় এবং উনিশ বছর ধরে এই অত্যাচার-অবিচার অনুষ্ঠিত হয়ে আসেনি?
সে নিজেকে প্রশ্ন করল, কারও ওপর অর্থহীন প্রাচুর্য আর কারও ওপর নিষ্ঠুর অভাব আর নিঃস্বতা চাপিয়ে দেবার অধিকার সমাজের আছে কি না, একজন নিঃস্ব গরিবকে প্রয়োজন আর আতিশয্যের জাঁতাকলে পিষ্ট করার অধিকার আছে কি না–কাজের প্রয়োজন আর শাস্তির আতিশয্য। যেসব লোক সম্পদের সমবণ্টন চায় তাদের সঙ্গে এইরকম নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করাটা কোনও সমাজের পক্ষে এক দানবিক নির্মমতার কাজ নয়?
সে এইসব প্রশ্ন করল এবং সমাজকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দান করল।
সে ঘৃণার সঙ্গে সমাজকে ধিক্কার দিল। সে যেসব দুঃখকষ্ট ভোগ করেছে তার জন্য সমাজকেই দায়ী করল এবং সংকল্প করল যদি কোনওদিন সুযোগ পায় তা হলে সে সমাজের কাছে কৈফিয়ত চাইবে। পরিশেষে সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে, যে অপরাধ সে করেছে তার ওপর যে শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে কোনও প্রকৃত সামঞ্জস্য নেই। আইনের দিক থেকে যদিও এই শাস্তিটা কোনও অন্যায় নয় তথাপি নীতির দিক থেকে অসংগতিপূর্ণ এবং অন্যায়।
জাঁ ভলজাঁ’র ক্রোধটা হয়তো অবান্তর এবং অবিবেচনাপ্রসূত মনে হতে পারে। কিন্তু তার ক্রোধের মধ্যে গভীর একটা জোরালো যুক্তি ছিল। তাই সে সংগত কারণেই ক্ষুব্ধ হয়েছিল সমাজের ওপর।
তাছাড়া সমগ্রভাবে সমাজ তার ক্ষতি ছাড়া কিছুই করেনি। যে সমাজে প্রতিটি লোকই ন্যায়বিচারের নামে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে তার প্রতি। যারাই তার দেহ স্পর্শ করেছে তারাই তাকে আঘাত করেছে। শৈশব থেকে একমাত্র তার মা আর দিদি ছাড়া কারও কাছ থেকে শুনতে পায়নি সে একটু ভালোবাসার কথা বা কারও চোখে একটু সদয় দৃষ্টি দেখতে পায়নি। চরম দুঃখভোগের সময় তার শুধু বারবার মনে হয়েছে। গোটা জীবনটাই একটা সংগ্রাম এবং সে সংগ্রামে সে হেরে গেছে। এই সংগ্রামে ঘৃণাই ছিল তার একমাত্র হাতিয়ার এবং জেলখানায় যতদিন সে ছিল সে হাতিয়ারটাকে শান দিয়ে তীক্ষ্ণ করেছে এবং সেখান থেকে আসার সময়েও সেই তীক্ষ্ণ হাতিয়ারটাকে সঙ্গে করে এনেছে।
