এরপর তাকে একটি মালবাহী গাড়িতে করে সাতাশ দিনের পথ অতিক্রম করে গলায় শিকল বাধা অবস্থায় তুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে তখন এক লাল আলখাল্লা পরিয়ে দেওয়া হয়। তার পূর্বজীবনের যা কিছু মুছে দেওয়া হয়। তার নামটাও যেন মুছে গিয়েছিল। সে যেন আর জাঁ ভলজাঁ নামে কোনও লোক ছিল না। সে শুধু একজন কয়েদি যার নম্বর ছিল ২৪৬০১। তার বোন ও বোনের ছেলেমেয়েদের ভাগ্যে কী ঘটল তার। কিছুই জানতে পারল না। কোনও গাছকে যখন করাত দিয়ে কাটা হয় তখন তার পাতাগুলোর অবস্থা কী হয়, তা সবাই জানে।
এ সেই একই পুরনো কাহিনী। এইসব দুঃখী মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্ট জীব হলেও সহায়সম্বলহীন ও নিরাশ্রয় অবস্থায় যেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে কেন্দ্রচ্যুত হয়। নিষ্ঠুর ভাগ্যের বিধানে এইসব হতভাগ্যের দল আপন আপন জীবনের পথে চলে যায়। মানবজাতির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে সে পথ থেকে দূরে সরে পিছু কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায় তারা তা কে জানে! তাদের আপন আপন জেলা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তাদের গাঁয়ের গির্জার গম্বুজ, গাঁয়ের পাশের ঝোঁপঝাড়ের কথা সব যেন ভুলে গিয়েছিল ভুলজা। মাত্র কয়েক বছরের কারাবাস অতীত জীবনের সব কিছু ভুলিয়ে দিয়েছিল যেন। তার মনের মধ্যে যে ক্ষত ছিল এতদিন একেবারে উন্মুক্ত, ক্রমে সেখানে যেন একটা ঢাকনা পড়ে গেল। তুলোতে থাকাকালে সে মাত্র একবার তার বোনের খবর পেয়েছিল। তুলোতে চার বছর থাকাকালে চতুর্থ বছরের শেষের দিকে সে খবর পায়। কার কাছ থেকে কিভাবে খবরটা পেল সে কেউ বলতে পারে না। তবে সে জেনেছিল তার বোনকে প্যারিসের পথে দেখতে পাওয়া গেছে। তার বোনের কাছে তখন শুধু তার কনিষ্ঠ সন্তান সাত বছরের একটি ছেলে ছিল। বাকি ছয়টি ছেলেমেয়ে কোথায় গেল, তা কেউ জানে না। তাদের মা-ও হয়তো জানে না। তার বোন একটি ছাপাখানায় কাজ করে কোনও এক জায়গায় থাকে। তার বাচ্চা ছেলেটাকে একটি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। সকালে উঠেই তাকে দু’টার সময় দোকানে হাজির হতে হয়। ছেলেটির স্কুল খোলে সাতটায়। তাই ছেলেটিকে সঙ্গে করে তার দোকানের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয় এক ঘণ্টা, কারণ দোকানের ভেতর তাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। শীতের সময় ছেলেটির বড় কষ্ট হয়। সে শীতে কুঁকড়ে কাঁপতে থাকে। বৃষ্টি এলে এক বৃদ্ধা দয়ার বশে ছেলেটিকে তার আস্তানায় আশ্রয় দেয়।
ছেলেটি সাতটা বাজলেই স্কুলে চলে যেত। ভলজাঁ শুধু তার বোনের এইটুকু খবরই পেয়েছিল। তার দিদির এই কাহিনী তার মনের মধ্যে অতীতের একটা রুদ্ধ জানালা খুলে হঠাৎ এক ঝলক আলো এনে তার প্রিয়জনদের কথা মনে পড়িয়ে দেয় এবং পরক্ষণেই সে জানালাটা রুদ্ধ হয়ে যায় চিরদিনের জন্য। তার পর থেকে সে তার দিদির আর কোনও খবর পায়নি, সে-ও তাদের দেখতে পায়নি।
তুলোঁর জেলখানায় থাকাকালে চতুর্থ বছরেই জেল থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে জাঁ ভলজাঁ। এ ব্যাপারে জেলখানার অন্যান্য কয়েদি তাদের প্রথা অনুসারে সাহায্য করে তাকে। জেল থেকে পালিয়ে গিয়ে দু’দিন গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় সে। প্রতিমুহূর্তে ধরা পড়ার ভয়ে সচকিত হয়ে আহার-নিদ্রাহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়ানোটা যদি মুক্তি হয় তা হলে মাত্র দুদিনের জন্য সে-মুক্তি পেয়েছিল সে। প্রতিটি পথিক দেখলেই আঁতকে উঠত সে। কোনও কুকুর ডাকলে বা কোনও ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ পেলে চমকে উঠত। এইভাবে দু’দিন কাটাবার পর আবার সে ধরা পড়ে। ট্রাইব্যুনালের বিচারে আগেকার কারাদণ্ডের সঙ্গে নতুন করে তিন বছরের কারাদণ্ড যুক্ত হয়। এরপর ষষ্ঠ বছরে আবার একবার পালায় জেল থেকে। কিন্তু বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে পায়নি। জেলখানায় নাম ডাকার সময় তাকে না দেখে প্রহরীরা তার খোঁজ করে। রাত্রিবেলায় ডকের কাছে এক জায়গায় তাকে দেখতে পেয়ে তাকে ধরে আনে। এবার সে প্রহরীদের সঙ্গে লড়াই করে এবং তাদের বাধা দেয় বলে এবার তার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। তাকে দুটো শিকল দিয়ে বাঁধা হয়। দশম বছরে সে আবার পালায় এবং আবার ব্যর্থ হয়ে ধরা পড়ে। আবার তিন বছরে কারাদণ্ড বেড়ে গিয়ে সবসুদ্ধ মোলো বছরের কারাদণ্ড হয়। চতুর্থবার পালাবার অপরাধে আবার তিন বছর বেড়ে গিয়ে তার মোট কারাদণ্ড উনিশ বছরে গিয়ে দাঁড়ায়। ফলে ১৭৯৬ সালে কারাগারে প্রবেশ করে উনিশ বছর পর ১৮১৫ সালের অক্টোবর মাসে সে মুক্ত হয়। তার অপরাধ ছিল মাত্র একটা, একটি জানালার কাঁচের সার্সি ভেঙে একটা পাউরুটি চুরি করা।
এইভাবে একটি পাঁউরুটি চুরির ঘটনা একটি জীবনকে নষ্ট করে দেয়। জাঁ ভলজাঁর মতো ক্লদ গুয়েকও একটি পাউরুটি চুরি করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনে। ইংল্যান্ডের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় প্রতি পাঁচটি ডাকাতির মধ্যে চারটির প্রত্যক্ষ কারণ হল ক্ষুধা।
জাঁ ভলজাঁ যখন প্রথম জেলখানায় যায় তখন সে কাঁদতে থাকে, ভয়ে কাঁপতে থাকে। কিন্তু যখন মুক্ত হয় তখন সে কিছুই করেনি, পাথরের মতো শক্ত হয়ে ছিল। নিবিড় হতাশা নিয়ে সে জেলে গিয়েছিল, কিন্তু যখন সে ফিরে আসে তখন আশা বা নিরাশা কিছুই ছিল না তার মনে। তার অন্তর্লোকে কী আলোড়ন বা পরিবর্তনের খেলা চলেছিল, তা কে জানে?
