বিশপ যখন বাগান থেকে তাঁর শোবার ঘরে চলে এলেন তখন রাত্রি প্রায় দুপুর। কিছুক্ষণের মধ্যে গোটা বাড়িটাই এক গভীর ঘুমের মধ্যে ঢলে পড়ল।
শেষরাতের দিকে জাঁ ভলজাঁ জেগে উঠল।
.
ব্রাই নামে একটি গাঁয়ের এক গরিব কৃষক পরিবারে জাঁ ভলজাঁর জন্ম হয়। শৈশবে সে লেখাপড়া শিখতে পারেনি। একটু বড় হলে সে ফেবারোলে গাছ কাটার কাজ করতে যায়। তার মার নাম ছিল ম্যাথিউ এবং তার বাবার নাম ছিল জাঁ ভলজাঁ। ডাক নাম ছিল ভাজা।
বাল্যকালে ভাবুক প্রকৃতির ছিল জাঁ ভলজাঁ। মনের মধ্যে কোনও বিষাদ না থাকলেও সে প্রায়ই কী সব ভাবত, তবে তার অন্তরটা ছিল সরল। তার চেহারার মধ্যে আকর্ষণ করার মতো কিছু ছিল না। কিশোর বয়সেই সে বাবা-মা দু জনকেই হারায়। তার মা প্রথমে রোগভোগে মারা যায়। তার বাবাও গাছ কাটার কাজ করত এবং একদিন গাছ কাটতে গিয়ে একটা গাছ তার উপর পড়ে যাওয়ায় সে মারা যায়। জাঁ ভলজাঁর আত্মীয় বলতে ছিল তার এক দিদি। তার দিদির স্বামী তখন বেঁচে থাকলেও দিদির সংসারে অভাব ছিল। তার সাতটা ছেলেমেয়ে ছিল। দিদির স্বামীও হঠাৎ মারা যায়। তখন তাদের বড় ছেলের বয়স আট। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তার দিদিই জাঁ ভলজাঁকে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দেন। তখন তার বয়স চব্বিশ। দিদির সংসারেই থাকত-খেত সে। দিদির স্বামীর মৃত্যুর পর জাঁ ভলজাঁ খেটে দিদির সংসার চালাতে লাগল। বেশি খেটে কম মাইনে পেত সে। তার সারা যৌবন এই কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে কেটে যায়। যৌবনে কারও ভালোবাসা সে পায়নি। কোনও মেয়ের প্রেমের পড়ার কোনও সুযোগ পায়নি।
সারা দিনের কাজ শেষ করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে নীরবে রাতের খাওয়া সেরে ফেলত জাঁ ভলজাঁ। তার সামনে তার খাবারের পাত্র থেকে দু-এক টুকরো ভালো মাংস তুলে নিয়ে তার কোনও না কোনও ছেলেমেয়েকে দিত তার দিদি। জাঁ ভলজাঁ সেদিকে ইচ্ছা করেই কোনও নজর দিত না। তার দিদির বাড়ির কাছে একটা খামারে এক চাষি পরিবার বাস করত। দিদির ছেলে-মেয়েরা সেই চাষি পরিবার থেকে প্রায় দিনই তাদের মার নাম করে এক জগ করে দুধ এনে নিজেরা কাড়াকাড়ি করে খেত। তাদের মা জানতে পারলে তাদের মারত। কিন্তু জাঁ ভলজাঁ তা জানত এবং তার দিদিকে লুকিয়ে সেই দুধের দাম দিয়ে দিত।
গাছকাটার মরশুমে গাছকাটার কাজ করে রোজ চব্বিশ স্যু করে পেত। কিন্তু মরশুম শেষ হয়ে গেলে সে ফসল তোলা বা পশুচারণের কাজ করত। বছরের সব সময়েই সে কিছু না কিছু একটা করত এবং তার দিদিও কাজ করত। কিন্তু সাতটা ছেলেমেয়ের ভরণপোষণ চালাতে বড় কষ্ট হত তাদের। দারিদ্রগ্রস্ত এইসব ছেলেমেয়ে সব সময় অনাথ শিশুদের মতো ঘুরে বেড়াত। একবার শীতকালে জাঁ ভলজাঁদের সংসারে বড় দুঃসময় দেখা দিল। জাঁ ভলজাঁর তখন কোনও কাজ ছিল না। সে বেকার বসে ছিল। কোনও রোজগার ছিল না। সংসারে খাবার কিছু নেই, অথচ সাতটি ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়ের মুখে কিছু না কিছু দিতে হবে।
কোনও এক রবিবার রাত্রিতে মবেয়ার ইসাবো নামে ফেবারোলের এক রুটির কারখানার মালিক যখন শুতে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ রুটি রাখার ভাড়ারঘরের জানালার কাঁচের সার্সি ভাঙার শব্দ শুনতে পায়। ইসাবো দেখে একটা লোক জানালার কাঁচ ভাঙার সেই ফাঁকটা দিয়ে একটা হাত ঢুকিয়ে একটা রুটি তুলে নিল। রুটি নিয়ে হাতটা বেরিয়ে গেল জানালা থেকে। ইসাবো তখন চোরটাকে তাড়া করল। লোকটা রুটি চুরি করে পালাচ্ছিল। কিন্তু ইসাবো তাকে ধরে ফেলল। চোরটার হাত থেকে তখনও রক্ত বার হচ্ছিল।
তখন চলছিল ১৭৯৫ সাল। বাড়ির দরজা ভেঙে বে-আইনি প্রবেশ ও চুরির অপরাধে অভিযুক্ত ভলজাঁর বিচার হয় স্থানীয় আদালতে। তার একটা ছোট বন্দুক ছিল। সেটা নাকি সে বৈধ ব্যাপারে ব্যবহার করত না। প্রমাণ পাওয়া গেল সে মাছ চুরি করত। মাছ চুরির কাজটা চোরাই মাল চালান করার মতোই অপরাধজনক। তবে একটা কথা বলা যেতে পারে, যারা পরের বাগানে গিয়ে পশুপাখি মেরে আনে বা মাছ চুরি করে তারা শহরের চোরাই মাল চালানকারী খুনি অপরাধীদের মতো কখনই ভয়ঙ্কর নয়। শহর মানুষকে হিংস্র এবং দুর্নীতিপরায়ণ করে তোলে। বন, পাহাড়, নদী, সমুদ্র মানুষকে হঠকারী করে তোলে। প্রকৃতির ভয়ঙ্কর রূপ মানুষের মধ্যে বন্য দুর্বার ভাবটাকে জাগিয়ে তোলে বটে, কিন্তু তার মানবিক গুণ বা অনুভূতিগুলোকে ধ্বংস করে না।
বিচারে দোষী সাব্যস্ত হল জাঁ ভলজাঁ। সভ্য জগতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, এমন অনেক আইনের বিধান আছে, যা এক একটি মানুষের জীবনকে ভেঙে দেয়। এমন এক একটি মুহূর্ত আসে মানুষের জীবনে যখন সমাজ এক একটি মানুষকে ত্যাগ করে দূরে ঠেলে দেয়। তাকে নিঃস্ব ও সর্বহারা করে তোলে। জাঁ ভলজাঁ পাঁচ বছরের জন্য সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়।
১৭৯৬ সালের ২২ এপ্রিল যেদিন প্যারিসে মোতেনেত্তের বিজয়বার্তা ঘোষিত হয় সেদিন বিকেত্রের জেলখানায় জাঁ ভলজাঁ একজন শৃঙ্খলিত কয়েদি হিসেবে অবস্থান করছিল। যার বয়স এখন নব্বই এমন এক প্রাচীন কয়েদি তখন একই জেলখানায় ছিল। সেদিন জেলখানার উঠোনে কয়েদিদের চতুর্থ সারিতে শৃঙ্খলিত অবস্থায় জাঁ ভলজাঁ বসে ছিল। সে তার অজ্ঞ অশিক্ষিত সরল চাষি-মনে এই কথাই শুধু বুঝতে পেরেছিল যে তার অবস্থা সত্যিই ভয়ঙ্কর এবং তার অপরাধের অনুপাতে তার শাস্তিটা খুবই বেশি। যখন হাতুড়ির ঘা দিয়ে তার গলায় লোহার বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হত তখন সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। সে তার হাত তুলে বোঝাতে চাইত সে যা কিছু করেছে তার বোনের সাতটি ছেলেমেয়ের জন্যই করেছে।
