কিন্তু আমার দাদা লোকটা কোথায় জন্মেছে, সে কথাও তাকে একবার জিজ্ঞাসা করলেন না। তার জীবনকাহিনীর কথা জানতে চাইলেন না। তার জীবনকাহিনীর মধ্যে নিশ্চয় কিছু অপরাধের কথা ছিল। আমার দাদা সেইসব অপরাধের কথাগুলোকে পরিষ্কার এড়িয়ে গেলেন। আমার দাদা একবার পন্তালিয়েরের নির্দোষ, নিরীহ পার্বত্য অধিবাসীরা কিভাবে মুক্ত আকাশের তলে সন্তুষ্ট চিত্তে আনন্দের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করে চলে তার কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেন পাছে তাতে লোকটা রুষ্ট হয়। আমার দাদার মনে তখন কী ছিল আমি পরে সেখানে জানতে পেরেছিলাম। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন জাঁ ভলজাঁ নামে সেই লোকটা আগে থেকেই হয়তো তার পাপচেতনায় জর্জরিত ছিল। তাই হয়তো তিনি তাকে তখনকার মতো সেই পাপচেতনার বোঝা থেকে তার মনটাকে মুক্ত করে তাকে অনুভব করাতে চাইছিলেন সে-ও আর পাঁচজনের মতো মানুষ। এটাও কি এক ধরনের বদান্যতা নয়? এক সূক্ষ্ম মানবতাবোধের বশবর্তী হয়ে এইভাবে ধর্মপ্রচার ও নীতি-উপদেশ দানের কাজ থেকে বিরত থাকা কি প্রকৃত যাজকের কাজ নয়? তার মনের ক্ষতটা নিয়ে ঘাটাঘাটি না করাটাও কি প্রকৃত সহানুভূতির ধর্ম নয়? আমার মনে হয় এটাই ছিল তার মনের আসল ভাব। তবে এটাও ঠিক যে তিনি তার এই ভাবের কোনও লক্ষণ আমার কাছেও কিছুমাত্র প্রকাশ করেননি। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি জাঁ ভলজাঁর সঙ্গে একজন সাধারণ লোকের মতো খেয়ে গেলেন যেমন তিনি কোনও যাজক বা পদস্থ সরকারি অফিসারের মতো কোনও সম্মানিত অতিথির সঙ্গে খেতেন।
আমাদের খাওয়া যখন শেষ হয়ে আসছিল তখন দরজায় আবার করাঘাত হল। দরজা খুলতে দেখা গেল মাদাম গার্লদ ছেলে কোলে করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমার দাদা ছেলেটার কপালে চুম্বন করে আমার কাছ থেকে পনেরো সু ধার করে মাদাম গার্লদকে দিলেন। জাঁ ভলজাঁ এদিকে কোনও নজর দিল না। তাকে তখন খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। মাদাম গার্লদ চলে গেলে আমার দাদা ভলজাঁর দিকে ঘুরে বললেন, আপনি তো এবার শুতে যাচ্ছেন। ম্যাগলোরি তাড়াতাড়ি খাবার টেবিলটা পরিষ্কার করে ফেলল। আমি বুঝলাম এবার আমাদের চলে যেতে হবে। লোকটাকে ঘুমোতে দিতে হবে। এই ভেবে আমরা উপরতলায় চলে গেলাম। কিন্তু কিছু পরেই আমি আমার ছাগলের চামড়ার কম্বলটা লোকটার কাছে পাঠিয়ে দিলাম, কারণ সেদিন খুব শীত ছিল এবং তাতে তার শরীরটা বেশ গরম হবে। আমার দাদা সেই জার্মানি থেকে কিনে এনেছিলেন। সেই সঙ্গে খাবার টেবিলে ব্যবহার করার জন্য হাতির দাঁতের বাটওয়ালা একটা ছুরিও কিনে এনেছিলেন। ম্যাগলোরি ফিরে এলে আমরা প্রার্থনার কাজ সেরে চলে গেলাম আর কোনও কথা না বলে।
.
৫
তার বোনকে রাত্রির মতো বিদায় দিয়ে মঁসিয়ে বিয়েনভেনু দুটি রুপোর বাতিদানের মধ্যে একটি তুলে নিয়ে তাঁর অতিথিকে তার শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। অতিথিদের শোবার ঘরে যেতে হলে বিশপের শোবার ঘরের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। ম্যাগলোরি তখন রুপোর কাঁটাচামচগুলো আলমারিতে গুছিয়ে রাখছিল।
অতিথির জন্য বিছানাটা পাতা হয়ে গিয়েছিল। লোকটা বিশপের সঙ্গে সেই শোবার ঘরটায় গিয়ে বাতিটা টেবিলের উপর রাখল।
বিশপ বললেন, ভালো করে শান্তিতে ঘুমোন। কাল সকালে এখান থেকে যাবার আগে আমাদের গরুর দেওয়া একপাত্র গরম দুধ পান করে যাবেন।
লোকটি বলল, ধন্যবাদ হে যাজক।
এই কথাটা বলার পরই হঠাৎ সে এক ভয়ঙ্কর ভঙ্গিতে দাঁড়াল, যা মেয়েরা দেখলে সত্যিই দারুণ ভয় পেয়ে যেত। কী আবেগের বশবর্তী হয়ে সে সেই মুহূর্তে এক ভয়ঙ্কর ভাব ধারণ করলে তা জানা যায় না, সে নিজেও হয়তো তা জানতো না। সে কি এর দ্বারা সতর্ক করে দিচ্ছিল বিশপকে অথবা ভয় দেখাচ্ছিল? অথবা এটা একটা তার সহজাত দুর্বার প্রবৃত্তির অদম্য আত্মপ্রকাশ? যা হোক, লোকটা সহসা ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশপের দিকে ভয়ঙ্করভাবে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, চমৎকার! কী আশ্চর্যের ব্যাপার।
আপনি আমায় আপনার শোবার ঘরের পাশেই শুতে দিচ্ছেন!
হঠাৎ সে এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সে হাসিতে এক দানবিক উচ্ছ্বাস ছিল। সে আবার বলল, আপনি কী করছেন তা একবার ভেবে দেখেছেন? আপনি কী করে। জানলেন যে আমি কখনও কাউকে হত্যা করিনি।
বিশপ শান্তভাবে বললেন, এটা ঈশ্বরের কাজ।
বিশপের ঠোঁট দুটি একবার প্রার্থনার স্বগত উচ্চারণে নড়ে উঠল, তিনি নিজেকে নিজে কী বলছিলেন। তার পর তিনি তাঁর ডান হাতটি তুলে দুটি আঙুল প্রসারিত করে লোকটিকে আশীর্বাদ করলেন। লোকটি তার মাথাটা একবারও নত করল না। বিশপ সেদিকে আর না তাকিয়ে নীরবে তাঁর শোবার ঘরে চলে গেলেন।
অতিথির বিছানার পাশে একটা পর্দা ফেলে দিয়ে বেদি থেকে বিছানাটাকে পৃথক করে রাখা হত। বিশপ একবার সেই পর্দার পাশে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করলেন। তার পর তিনি অন্যদিনকার মতো বাগানে চলে গেলেন। সেখানে পায়চারি করতে করতে সেইসব রহস্যের কথা ভাবতে লাগলেন যেসব রহস্য ঈশ্বর রাত্রির নীরব শান্ত অবকাশে সজাগ ব্যক্তির সামনে উদ্ঘাটিত করেন।
লোকটি এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে সে পরিষ্কার চাদরপাতা ভালো নরম বিছানাটার আরাম তার সজাগ সচেতন অনুভূতি দিয়ে উপভোগ করতে পারল না। সে বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
