বিশপ বললেন, তা থাক। শুনুন, একশো ধার্মিক যাজকের সাদা পোশাকের থেকে একজন পাপীর চোখে এক বিন্দু অনুতাপের অশ্রু ঈশ্বরের কাছে অনেক আনন্দদায়ক। আপনি যেখানে দুঃখভোগ করতেন সে জায়গাটি যদি আপনি সেখানকার মানুষদের প্রতি অন্তরে ঘৃণা আর ক্রোধ নিয়ে ত্যাগ করেন তা হলে আপনি আমাদের করুণার পাত্র হবেন, কিন্তু যদি আপনি কারও প্রতি কোনও অভিযোগ না রেখে শান্ত মনে সকলের প্রতি শুভেচ্ছা পোষণ করে সে জায়গা ত্যাগ করেন তা হলে আপনি মহত্ত্বে আমাদের সবাইকে ছাড়িয়ে যাবেন।
ম্যাগলোরি ততক্ষণে খাবারের সব ডিশ টেবিলের উপর সাজিয়ে দিয়ে গেছে। এক একটি ডিশে ছিল একটা করে বড় পাউরুটি, কিছু মাখন, কিছুটা তেল, নুন, কিছু শুয়োর ও ভেড়ার মাংস, আর ডুমুরের ঝোল। তার ওপর ছিল জল আর মদ। বিশপ দৈনন্দিন যে মদ ব্যবহার করতেন তার সঙ্গে অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত মদ থেকে আনা কিছু পুরনো ভালো মদ এনে পরিবেশন করল ম্যাগলোরি।
বিশপ তার নিজস্ব প্রথা অনুসারে অতিথিকে তার ডান দিকে বসালেন। তাঁর বোন বসল তার বাঁ দিকে। বিশপের মুখের প্রসন্ন ভাব দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল তিনি অতিথিবৎসল।
বিশপ খেতে খেতে একসময় বললেন, টেবিলে একটা জিনিসের অভাব দেখা যাচ্ছে।
ব্যাপারটা বুঝতে পারল ম্যাগলোরি। এই বাড়িতে মোট ছয় জনের খাবার মতো রুপোর কাঁটাচামচ আছে। এই বাড়ির প্রথা হল এই যে কোনও অতিথি এলে খাবার টেবিলে ছয় জনের কাঁটাচামচ সব বার করে সাজিয়ে রাখতে হবে টেবিলে। এ যেন সামান্য কিছু একমাত্র ঐশ্বর্যের শিশুসুলভ ও নির্দোষ প্রকাশ। এই ঐশ্বর্যের এক আবরণ দিয়ে বিশপ যেন তার সংসারের দীনতা ও দারিদ্রকে ঢাকার প্রয়াস পেতেন।
ম্যাগলোরি রুপোর সব কাঁটাচামচ এনে খাবার টেবিলে পাতা সাদা ধবধবে কাপড়ের উপর সাজিয়ে দিল সেগুলো।
.
৪
খাবার টেবিলে সেদিন কী কী কথা হয়েছিল তার বিবরণ মাদাম দ্য বয়শেনকে লেখা বাপতিস্তিনের একটি চিঠির অংশ থেকে বোঝা যাবে। বাপতিস্তিনে তাদের সেই অতিথি আর দাদার মধ্যে সে রাতে খাবার সময় যেসব কথাবার্তা হয়েছিল তার একটি পূর্ণ বিবরণ দান করে। সে লেখে,… লোকটা প্রথমে কোনও দিকে নজর না দিয়ে বুভুক্ষুর মতো খেয়ে চলেছিল একমনে। অবশেষে মদ পান করার পর সে বিশপকে বলল, মঁসিয়ে যাজক, ওয়াগনের লোকগুলো কিন্তু আপনাদের থেকে ভালো খায়।
সত্যি বলতে কি কথাটা শুনে আমি আঘাত পাই মনে। কিন্তু আমার দাদা সহজভাবে বললেন, তার কারণ আমার থেকে তারা বেশি পরিশ্রমের কাজ করে।
লোকটা বলল, না। কারণ তাদের বেশি টাকা আছে। আমি দেখছি আপনারা গরিব। হয়তো আপনি খুবই একটা ছোট গ্রাম্য যাজক। ঈশ্বর করেন যেন তাই হয়।
বিশপ বললেন, ঈশ্বর ন্যায়পরায়ণ, তিনি ঠিকই করেছেন।
একটু থেমে বিশপ আবার বললেন, মঁসিয়ে জাঁ ভলর্জ, আপনি কি পালিয়ে যাচ্ছেন?
ওই পথেই আমাকে যাবার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল সকাল হলেই আমাকে রওনা হতে হবে। এ পথে যাওয়া খুবই কঠিন। দিনে গরম, রাত্রিতে দারুণ ঠাণ্ডা।
আমার দাদা বললেন, আপনি এক ভালো অঞ্চলেই যাচ্ছেন। বিপ্লবে আমার পরিবার ধ্বংস হয়ে যায় একেবারে। আমি তখন ফ্রোশেকোঁতে চলে যাই এবং সেখানে দৈহিক শ্রমের দ্বারা জীবিকা অর্জন করি। ওখানে কাজের কোনও অভাব নেই। কাজ খুঁজতে আমার কষ্ট হয়নি, কারণ ওদিকে গোটা অঞ্চলটা কাগজের কল, তৈলশোধক কারখানা, লোহা আর তামার কারখানা, ঢালাই কারখানা প্রভৃতি কল-কারখানায় ভর্তি। ওই অঞ্চলের নাম লডস, শাতিলিয়ন, অজিনকোর্ট আর বোরে।
এইসব জায়গার নাম করার পর আমার দাদা আমার দিকে ফিরে বললেন, আচ্ছা ওই অঞ্চলে আমাদের কোনও আত্মীয় নেই?
আমি বললাম, আগে ছিল। অন্যদের মধ্যে মঁসিয়ে দ্য লুসেনেত আমাদের এক আত্মীয় ছিলেন। তিনি নগরদ্বারের এক ক্যাপ্টেন।
আমার দাদা বললেন, ১৭৯৩ সালের পর আমাদের আর কোনও আত্মীয় সেখানে ছিল না। আমাদের মধ্যে শুধু আমরাই অবশিষ্ট ছিলাম। ওখানে অনেক মাখনের কারখানা আছে। কারখানার মালিকরা হচ্ছে দুই শ্রেণির। একদল মালিক হল ধনী আর একদল মালিক হল গরিব চাষির দল। তারা কয়েকজন করে মিলে একটি করে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। মাখন তৈরির কাজ শুরু হয় এপ্রিলের শেষের দিকে। তার পর জুনের মাঝামাঝি চাষিরা তাদের গরুগুলো পাহাড়ের উপত্যকায় চরাতে নিয়ে যায়।
আরও বেশি খাবার জন্য আমার দাদা অনুরোধ এবং উৎসাহিত করছিলেন তাকে। তিনি নিজে যে মদ কোনওদিন বেশি দাম বলে খান না, মভ থেকে আনা ভালো মদ তিনি তাকে খেতে বললেন, তার পর আমার দাদা মাখন তৈরির কথা বলছিলেন এবং মাঝে মাঝে থামছিলেন যাতে আমি এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারি। একটা জিনিস দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। লোকটি কী ধরনের ছিল তা আমি আগেই তোমায় বলেছি। আমার দাদা কিন্তু সন্ধে থেকে কখনও বা খাবার সময়েও লোকটার কোনও পরিচয় জানতে চাননি এবং তিনিও নিজের সম্বন্ধে কিছু বলেননি। সাধারণত একজন বিশপের পক্ষে একজন দুষ্কৃতকারীকে হাতের কাছে পেয়ে কিছু উপদেশ দানের এটাই ছিল সুবর্ণ সুযোগ। একইভাবে তিনি তার মনে রেখাপাত করতে পারতেন। অন্য কেউ হলে মৃদু ভর্ৎসনা আর নীতি-উপদেশের বাক্যদ্বারা তার দেহ ও আত্মাকে পাপের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে পারতেন। সহানুভূতির সঙ্গে এই আশা করতেন যে ভবিষ্যতে সে তার পথ পরিবর্তন করে ভালোভাবে বাঁচবে।
