বিশপ বললেন, ম্যাগলোরি, অতিথিদের বিছানাটায় একটা পরিষ্কার চাদর পেতে দাও।
বিশপের কথা বিনা প্রতিবাদে মহিলা দু জন মেনে চলত, একথা আগেই আমরা বলেছি। ম্যাগলোরি বিশপের আদেশ পালন করতে চলে গেল।
বিশপ এবার লোকটির দিকে ঘুরে বললেন, আপনি বসুন মঁসিয়ে, শরীরটাকে একটু গরম করুন। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার দেওয়া হবে এবং আপনি খেতে খেতেই বিছানা প্রস্তুত হয়ে যাবে।
লোকটি এবার বিশপের কথাটা বুঝল। তার চোখ-মুখের কঠোর ভাবটা সহসা কেটে গিয়ে তার জায়গায় বিস্ময়, অবিশ্বাস এবং আনন্দের ভাব ফুটে উঠল। সে শিশুসুলভ উচ্ছৃঙ্খলতার সঙ্গে কথা বলতে লাগল। সে বলল, আপনারা সত্যিই আমাকে খাবার আর থাকার জায়গা দেবেন? আমি একজন জেল-কয়েদি হওয়া সত্ত্বেও আমাকে তাড়িয়ে দেবেন না? আপনি আমাকে মঁসিয়ে বলে সম্বোধন করলেন। কিন্তু অন্য সবাই আমাকে বলেছে, বেরিয়ে যাও, কুকুর কোথাকার! আমি ভেবেছিলাম আপনারাও তাড়িয়ে দেবেন, তাই আমি আগেই সব কথা বললাম। আমার আসল পরিচয় দান করলাম। যে মহিলা আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। রাতের খাওয়া আর বিছানা।
তোশক, চাদর, বালিশ–উনিশ বছর আমি কোনও বিছানায় শুইনি। ঠিক আছে, আমার টাকা আছে, আমি দাম দিতে পারব। আপনার নামটা জানতে পারি স্যার? আপনি খুব ভালো লোক। টাকা আমি দেব। আপনি নিশ্চয় একজন হোটেলমালিক। তাই নয় কি?
বিশপ বললেন, আমি একজন যাজক এবং এখানেই থাকি।
যাজক! কিন্তু সত্যিই খুব ভালো যাজক। তা হলে আমাকে টাকা দিতে হবে না! আপনিই এই বড় গির্জার ভারপ্রাপ্ত যাজক? আমিই বোকা, আপনার মাথায় যাজকের টুপিটা আমি এতক্ষণ দেখিনি।
কথা বলতে বলতে পথিক তার পিঠের ব্যাগটা আর হাতের লাঠিটা ঘরের এক কোণে রাখল। তার পর হলুদ টিকিটটা পকেটের মধ্যে ভরে রেখে বসল। বাপতিস্তিনে তার দিকে তাকিয়ে তাকে দেখছিল। সে বলল, আপনি একজন মানুষের মতো মানুষ মঁসিয়ে। আপনি কোনও মানুষকে ঘৃণা করেন না। যাজক যদি মানুষ হিসেবে ভালো হয় তা হলে সত্যিই মানুষের উপকার হয়। তা হলে আমাকে কোনও টাকা-পয়সা দিতে হবে না?
বিশপ বললেন, না। কত পেয়েছেন আপনি? একশো নয় ফ্রাঁ?
আর পনেরো স্যু।
এ টাকা কতদিনে রোজগার করেছেন?
উনিশ বছরে।
পথিক বলল, টাকাটা আমার কাছে এখনও প্রায় সবটাই আছে। এই ক’দিনে আমি এর থেকে শুধু পঁচিশ স্যু খরচ করেছি। এ পয়সাটা আমি গ্রেসি নামে এক জায়গাতে গাড়ি থেকে মাল নামিয়ে দিয়ে রোজগার করেছিলাম। আমাদের জেলখানায় মার্শেল থেকে একজন বিশপ আসতেন। জেলখানার ভেতরে যে বেদি ছিল তার সামনে তিনি সমবেত প্রার্থনার অনুষ্ঠান করতেন। তাঁর মাথার টুপিটাতে সোনার জরির কাজ করা ছিল। দুপুরের রোদে তাই চকচক করত টুপিটা। তাকে আমরা ভালো করে দেখতেই পেতাম না। তিনি আমাদের কাছ থেকে অনেকটা দূরে থাকায় কী বলতেন, তা শুনতেও পেতাম না।
ঘরের দরজাটা খোলা ছিল। বিশপ উঠে গিয়ে সেটা বন্ধ করে দিলেন। ম্যাগলোরি বাড়তি এক প্লেট খাবার নিয়ে এলে বিশপ বললেন, ওটা যথাসম্ভব আগুনের কাছে রাখ।
বিশপ এবার অতিথিকে বললেন, আল্পস পর্বত থেকে ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস বইছে। আপনার নিশ্চয় খুব শীত লাগছে মঁসিয়ে?
বিশপ যতবার পথিককে ‘মঁসিয়ে’ বলে সম্বোধন করেন পরম বন্ধুর মতো ততবারই তার মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক ভূতপূর্ব জেলের কয়েদিকে এই ধরনের সৌজন্য দান করাটা লবণসমুদ্রে ভাসমান কোনও জাহাজডুবি মানুষকে সুপেয় জলদানের মতো বাঞ্ছিত অথচ অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা। অপমানিত মানুষই সম্মানের পিপাসায় আর্ত হয়ে ওঠে।
বিশপ বললেন, এই বাতিটার আলো তেমন জোর নয়।
তার মনের কথা বুঝতে পেরে ম্যাগলোরি বিশপের শোবার ঘর থেকেই দুটো রুপোর বাতিদান নিয়ে এসে তাতে দুটো বাতি জ্বালিয়ে খাবার টেবিলের উপর রাখল।
পথিক আবার বলল, মঁসিয়ে, আপনি বড় ভালো লোক। আপনি আমাকে ঘরে জায়গা দিয়ে আমার জন্য বাতি জ্বেলেছেন, আমাকে খাবার দিয়েছেন, অথচ আমি আমার কথা সব বলেছি।
বিশপ তাঁর একটি হাত পথিকের একটি বাহুর উপর রেখে বললেন, আপনার কিছুই বলার দরকার ছিল না। এ বাড়ি আমার নয়, খ্রিস্টের, তাঁর নামেই আমি ভোগ করি। এখানে। এলে কোনও মানুষকে তার নাম-ধাম বলতে হয় না, বলতে হয় শুধু কী বিপদে সে পড়েছে। আপনি বিপদে পড়েছেন, আপনি ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, নিরাশ্রয়; সুতরাং আপনি এখানে স্বাগত। আপনাকে এ বাড়িতে স্থান দেওয়ার জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানাবার কিছু নেই। যে কোনও নিরাশ্রয় ব্যক্তিই এখানে আশ্রয় চাইলে পাবে। এ বাড়িতে আমার থেকে আপনাদের অধিকারই বেশি। এখানকার সব কিছুই আপনাদের। কেন আমি আপনার নাম জিজ্ঞাসা করব? তাছাড়া আপনার নাম তো আমার আগেই জানা ছিল।
পথিক বিস্ময়ে চমকে উঠে বলল, আমার নাম আপনি জানেন?
বিশপ বললেন, অবশ্যই জানি। আপনার নাম হল ভাই।
পথিক বলল, মঁসিয়ে যাজক, আমি এখানে বড় ক্ষুধার্ত অবস্থায় আসি। কিন্তু এখন সে ক্ষুধা আমি অনুভব করতেই পারছি না। সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে।
বিশপ অন্তরঙ্গভাবে বললেন, আপনি অনেক কষ্ট ভোগ করেছেন।
হ্যাঁ, অনেক কষ্ট–কৃষিশ্রমিকদের মতো লম্বা আলখাল্লার মতো নোংরা পোশাক, হাতে শিকল, কাঠের তক্তার উপর শোয়া, তীব্র শীত-গ্রীষ্ম সহ্য করা, কঠোর পরিশ্রম, তার উপর মাঝে মাঝে চাবুকের আঘাত–এইসব কিছু সহ্য করতে হয়েছে আমাকে। এমনকি যখন আমি শুয়ে থাকতাম তখনও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত আমায়। কুকুরেরাও আমার থেকে ভালো থাকত। এইভাবে উনিশ বছর কাটাতে হয়েছে আমাকে। এখন আমার বয়স ছেচল্লিশ। আবার তার ওপর এক হলুদ টিকিট সঙ্গে আছে আমার। এই হল আমার কাহিনী।
