বিশপ যখন খাবার ঘরে ঢুকলেন তখন ম্যাগলোরি বাপতিস্তিনেকে জোর গলায়। একটা বিষয়ের কথা বলছিল যেটা সে এর আগেও বলেছে এবং সেটা বিশপ জানেন। বিষয়টা হল বাড়ি ও সামনের দিকে দরজাটা বন্ধ করে রাখার কথা। আজ সে সেই পুরনো বিষয়টার সঙ্গে একটা ঘটনার কথা যোগ করে দিল। সে বলল আজ সন্ধ্যায় বাজার করতে গিয়ে শহরে একটা গুঞ্জব শোনে। অদ্ভুত চেহারা আর বেশভূষাওয়ালা একটা ভবঘুরে শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই বলছে আজ বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকা বা দরজা খুলে রাখা উচিত নয়। আজকাল শহরের মেয়র আর পুলিশের বড় কর্তার সঙ্গে মনকষাকষির জন্য পুলিশি ব্যবস্থা ভালো নয়। কাজেই নাগরিকদেরই নিজেদের নিরাপত্তা সম্বন্ধে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। সদর দরজায় তালা দিতে হবে আর সব ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হবে।
বিশপ কথাগুলো শুনলেন। কিন্তু কোনও মন্তব্য না করে আগুনের ধারে গিয়ে বসলেন। ম্যাগলোরি দরজা বন্ধ করার কথাগুলো আবার বলতে লাগল।
বাপতিস্তিনে তার দাদাকে বিরক্ত না করে ম্যাগলোরিকে সমর্থন করার জন্য বিশপকে বলল, ম্যাগলোরি কী বলছে তা শুনেছ?
বিশপ বললেন, হ্যাঁ, কিছুটা শুনেছি।
তার পর তিনি হাসিমুখে ম্যাগলোরির দিকে তাকিয়ে বললেন, ব্যাপার কী? আমরা কি কোনও ঘোরতর বিপদে পড়েছি?
ম্যাগলোরি তখন ঘটনাটার পুনরাবৃত্তি করল। বলল, লোকটা এক ভবঘুরে, ভয়ঙ্কর ধরনের এক ভিখিরি। সে জ্যাকিন লাবারের হোটেলে গিয়েছিল। কিন্তু তারা তাড়িয়ে দিয়েছে। গাসেন্দি বাজারের পথে পথে তাকে অনেকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। তার পিঠে সৈনিকদের মতো একটা ভারী ব্যাগ আছে আর তার মুখটা ভয়ঙ্কর রকমের দেখতে।
বিশপ বললেন, তাই নাকি?
বিশপের আগ্রহ দেখে ম্যাগলোরি ভাবল, বিশপ তার ভয়ের কথাটা সমর্থন করছেন। সে তখন উৎসাহিত হয়ে বলতে লাগল, হ্যাঁ মঁসিয়ে, আজ রাতে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটবে। চারদিকে পাহাড়ঘেরা এই ছোট্ট শহরটার রাস্তাঘাটগুলো পিচের মতো অন্ধকার। পথে একটা আলো নেই। আমি যা বলছি ম্যাদময়জেলের তাতে সমর্থন আছে।
বাপতিস্তিনে বলল, আমি কিছু বলছি না, দাদা যা করবেন তাই হবে।
ম্যাগলোরি বলল, আমরা বলছি কি মঁসিয়ে অনুমতি দিলেই আমি এখনি একজন কামারের কাছে গিয়ে আমাদের দরজা কিছু তালাচাবি করাতে পারি এবং ভালো খিল লাগাবার ব্যবস্থা করতে পারি। আমাদের দরজায় যা খিল আছে তাতে কোনও লোককে আটকানো যাবে না। যে কোনও লোক রাত্রিবেলায় ঘরে ঢুকে পড়তে পারে। মঁসিয়ে আবার রাত দুপুরে বাইরে থেকে লোককে ডেকে আনেন।
এমন সময় দরজায় জোর করাঘাতের শব্দ হল।
বিশপ বললেন, ভেতরে এস।
.
৩
ঘরের দরজা খুলে একজন লোক প্রবেশ করল। এই লোকটিই হল সেই পথিক যাকে আমরা আগেই দেখেছি। পথিক ঘরে ঢুকেই দরজার কাছে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জ্বলন্ত আগুনের আভায় তার মুখটাকে খুব ক্লান্ত ও অবসন্ন দেখাচ্ছিল। তার পিঠে সেই ব্যাগটা আর হাতে একটা লাঠি ছিল। ছেঁড়া ময়লা বেশভূষায় তার চেহারাটা কুৎসিত আর ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল।
ম্যাগলোরি তাকে দেখে মুখটা হাঁ করে ভয়ে কাঁপতে লাগল। কোনও কথা বার হল না তার মুখ থেকে। বাপতিস্তিনে উঠে দাঁড়িয়ে ভয়ে চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার দাদার দিকে তাকিয়ে শান্ত হয়ে রইল।
বিশপ শান্তভাবে আগন্তুককে দেখতে লাগলেন। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই আগন্তুক ঘরের তিনজনকে দেখে নিয়ে কড়া গলায় বলতে লাগল, শুনুন, আমার নাম জাঁ ভলজাঁ। আমি একজন মুক্ত জেল-কয়েদি। আমি উনিশ বছর জেলে ছিলাম। চারদিন আগে ওরা আমায় জেল থেকে ছেড়ে দেয় এবং আমি পন্তালিয়ের যাচ্ছি। আমি ঠুলো থেকে চারদিন পথ হেঁটে এখানে আসি। আজ আমি সকাল থেকে তিরিশ মাইল পথ হেঁটেছি, এই শহরে এসে আমি একটি হোটেলে যাই, কিন্তু হোটেলমালিক আমাকে তাড়িয়ে দেয়। কারণ আমি প্রথমে আমার জেল-ফেরতের হলুদ টিকিটটি টাউন হলের কর্তৃপক্ষকে বিধিমতো দেখাই। আমি তখন আর একটি হোটেলে যাই, তারাও আমায় চলে যেতে বলে। কেউ আমায় স্থান দিতে চায়নি। আমি কারাগারে যাই, কিন্তু রক্ষীও দরজা বন্ধ করে দেয়। আমি একটা কুকুরের আস্তানায় রাত্রিবাসের জন্য যাই, কিন্তু কুকুরগুলোও আমায় তাড়িয়ে দেয় মানুষদের মতো। তার পর আমি শহরের বাইরে মাঠে যাই শোবার জন্য, কিন্তু আকাশে মেঘ থাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে দেখে চলে আসি। আমি একটা পাথরের বেঞ্চের উপর শুয়ে পড়ি। তখন একজন মহিলা আমাকে এই বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তাই আমি এখানে এসে দরজায় করাঘাত করি। এ বাড়িটা কি হোটেল? আমার কাছে টাকা আছে। উনিশ বছর জেলখানায় কাজ করে আমি একশো নয় ফ্রাঁ পনের স্যু পাই। আমি এখানে থাকা-খাওয়ার জন্য যা লাগবে, তা যাই হোক আমি দিতে রাজি আছি। আমি অতিশয় ক্লান্ত, বারো লিগ পথ আমি হেঁটেছি। আমি দারুণ ক্ষুধার্ত। আমাকে এখানে থাকতে দেবেন?
বিশপ বললেন, ম্যাদময়জেল ম্যাগলোরি, দয়া করে টেবিলে আর একটা খাবার জায়গা করবে?
ভলজাঁ কথাটা বুঝতে না পেরে জ্বলন্ত চুল্লিটার কাছে এল। বলল, আমার কথা আপনারা শোনেননি? আমি একজন জেলফেরত কয়েদি। আমি জেলে সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেছি।
সে তার পকেট থেকে একটা হলুদ কাগজ বার করে বলল, এই হল আমার হলুদ টিকিট। এই জন্যই সবাই আমাকে তাড়িয়ে দেয়। আপনারা এটা পড়তে চাইলে পড়ে দেখতে পারেন। আমিও পড়তে পারি। জেলখানায় শ্রেণিবিভাগ আছে। এতে লেখা আছে, জাঁ ভলজাঁ জেলের আসামি মুক্ত, তার জন্ম –সে উনিশ বছর কারাদণ্ড ভোগ করেছে, তার মধ্যে হিংসার আশ্রয় নিয়ে ডাকাতি করার জন্য পাঁচ বছর, জেল থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করার জন্য চৌদ্দ বছর অতিশয় বিপজ্জনক লোক। এই হচ্ছে আমার পরিচয়। সকলেই আমায় তাড়িয়ে দিয়েছে। আপনারা আমাকে থাকতে দেবেন? এটা কি একটা হোটেল? আমাকে কিছু খাবার আর রাত্রির মতো থাকতে দেবেন? আপনাদের কি আস্তাবল আছে?
