পথিক দেখল সারা মাঠটার মধ্যে একটা মাত্র গাছ ছাড়া আর কিছু নেই। নৈশ প্রকৃতির রহস্যময় আবেদনে সাড়া দেবার মতো কোনও সূক্ষ্ম সুকুমার অনুভূতি তার ছিল না। সমস্ত অন্ধকার আকাশ, নিঃসঙ্গ গাছ, শূন্য মাঠ, প্রান্তর সব কিছুকে এমন গভীরভাবে শূন্য মনে হচ্ছিল এবং সেই শূন্যতার কৃষ্ণকুটিল পটভূমিতে তার আপন অবস্থার নিঃসঙ্গতাটাকে এমন অসহনীয় মনে হচ্ছিল যে সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সেখানে। তার মনে হল মাঝে মাঝে প্রকৃতি এমনি করে প্রতিকূল হয়ে ওঠে মানুষের।
নিরুপায় হয়ে সে আবার দিগনে শহরে ফিরে এল। কিন্তু তখন নগরদ্বার রুদ্ধ হয়ে গেছে। সেকালে আক্রমণের আশঙ্কায় উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল শহরটা। দুদিকে দুটো ফটক ছিল। কিন্তু ফটক বন্ধ হয়ে গেলেও ভাঙা প্রাচীরের এক জায়গায় একটা ফাঁক দিয়ে শহরে প্রবেশ করল সে।
রাত্রি তখন আটটা বাজে। অজানা পথের এদিক-ওদিক ঘুরে এগোতে লাগল সে। একসময় সে বড় গির্জাটার পাশ দিয়ে যাবার সময় গির্জার দিকে ঘুষি পাকিয়ে হাতটা নাড়ল। সেই পথটার এককোণে একটা ছাপাখানা ছিল। এই ছাপাখানাতেই একদিন সম্রাট নেপোলিয়ঁনের ঘোষণাপত্র ছাপা হয়। অতিশয় ক্লান্ত আর হতাশ হয়ে ছাপাখানার দরজার বাইরে একটা পাথরের বেলচার উপর পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল সে।
একজন বয়স্ক মহিলা বড় গির্জা থেকে বেরিয়ে এসে পথিককে সেখানে শুয়ে থাকতে দেখে তাকে বলল, এখানে কী করছ তুমি?
পথিক বলল, হে আমার সদাশয় মহিলা, তুমি দেখতে পাচ্ছ আমি কী করছি। আমি এখানে শুয়ে ঘুমোব।
এই সদাশয় মহিলা একজন মার্কুইপত্নী ছিলেন। তিনি বললেন, এই বেঞ্চিতে শোবে?
পথিক বলল, আমি উনিশ বছর কাঠের উপর শুয়েছি। এখন পাথরের উপর শুয়েছি।
তুমি কি সৈনিক ছিলে?
হ্যাঁ সৈনিক।
তুমি কেন কোনও হোটেলে গেলে না?
কারণ আমার টাকা নেই।
মার্কুই বললেন, হায়, আমার কাছে এখন মাত্র চার স্যু আছে।
কিছু না থাকার চেয়ে এটা ভালো।
পথিক মার্কুই-এর কাছ থেকে চার স্যু-ই নিল। মার্কুই তখন বললেন, এ পয়সাতে হোটেলখরচ হবে না। কিন্তু তুমি হোটেলে গিয়ে চেষ্টা করে দেখেছ? রাত্রিতে তুমি এখানে থাকতে পারবে না। তুমি নিশ্চয় শীতার্ত এবং ক্ষুধার্ত। নিশ্চয় কোনও দয়ালু ব্যক্তি তার ঘরে থাকতে দেবেন তোমাকে।
আমি প্রতিটি বাড়িতে খোঁজ করে দেখেছি।
তুমি কি বলছ কেউ তোমাকে—
প্রতিটি বাড়ি থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
মহিলাটি তখন পথিকের কাঁধে একটা হাত দিয়ে রাস্তাটার ওপারে বিশপের প্রাসাদের পাশে একটা ছোট বাড়ির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, তুমি প্রত্যেকটি বাড়িতে গিয়ে দেখেই বলছ?
হ্যাঁ।
ওই বাড়িটায় গিয়ে দেখেছ?
না।
তা হলে ওখানে যাও।
.
২
দিগনের বিশপ সারাদিনের কাজ সেরে শহর থেকে সন্ধ্যার সময় ঘুরে এসে তার ঘরে জেগে ছিলেন। তিনি তখন খ্রিস্টানদের কর্তব্য সম্বন্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলেন। এ সম্বন্ধে অভিজ্ঞ ও পণ্ডিতদের মতামতগুলো খুঁটিয়ে দেখছিলেন। সব ধর্মীয় কর্তব্যগুলোকে দুভাগে বিভক্ত করে দেখতে হবে তাকে। প্রথমে সামাজিক কর্তব্য, তার পর ব্যক্তিগত কর্তব্য। খ্রিস্টানদের সামাজিক বা সম্প্রদায়গত কর্তব্যগুলোকে চার ভাগে বিভক্ত করেন সেন্ট ম্যাথিউ। এই সামাজিক কর্তব্যগুলো হল ঈশ্বরের প্রতি কর্তব্য, নিজের প্রতি কর্তব্য, প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য আর সমস্ত জীবের প্রতি কর্তব্য। ব্যক্তিগত কর্তব্যগুলো বিশপ অন্য এক জায়গায় প্রকাশিত দেখেছিলেন। সেন্ট পিটার রোমানদের কাছে লিখিত একটি চিঠিতে রাজা এবং প্রজাদের কর্তব্যগুলো লিপিবদ্ধ করেন। তার পর একেসীয়দের কাছে লিখিত একখানি চিঠিতে ম্যাজিস্ট্রেট স্ত্রী, মাতা ও যুবকদের কর্তব্যগুলো নির্ধারণ করেন। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্তের কর্তব্যের কথাগুলো হিব্রুদের কাছে একটি চিঠিতে আর কুমারীদের কর্তব্যগুলো কোরিন্থীয়দের কাছে লিখিত একটি চিঠিতে লিপিবদ্ধ করেন। বিশপ বিয়েনভেনু বিভিন্ন জায়গায় লিখিত এইসব কর্তব্য বাছাই করে এক জায়গায় সেগুলো লিখে রেখেছিলেন যাতে সকল শ্রেণির লোকের মঙ্গল হয়।
সেদিন রাত্রি আটটার সময় বিশপ তাঁর হাঁটুর উপর একটা বড় বই খুলে রেখে সেটা পড়তে পড়তে কয়েকটা টুকরো কাগজে কী লিখছিলেন। এমন সময় ম্যাগলোরি একবার বিশপের ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে আলমারি থেকে কী একটি জিনিস বার করে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বিশপ যখন বুঝলেন খাবার টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে। এবং তার জন্য তার বোন অপেক্ষা করে বসে আছে তখন তিনি আর দেরি না করে বইটা নামিয়ে রেখে খাবার ঘরে চলে গেলেন। তাদের খাবার ঘরটা ছিল আয়তক্ষেত্রাকার এবং তার একটা দরজা রাস্তার দিকে আর একটা দরজা বাগানের দিকে ছিল। ঘরের মধ্যে আগুন জ্বলছিল।
ম্যাগলোরি তখন খাবার দেবার আগে টেবিলটা সাজাচ্ছিল আর বাপতিস্তিনের সঙ্গে কথা বলছিল। টেবিলের উপর একটা বাতি জ্বলছিল। দু জন মহিলারই বয়স ষাটের ওপর হয়েছিল। ম্যাগলোরর চেহারাটা ছিল মোটা আর বলিষ্ঠ। বাপতিস্তিনের চেহারাটা ছিল রোগা রোগা। ম্যাগলোরিকে দেখে চাষি ঘরের মেয়ে আর বাপতিস্তিনেকে সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলা বলে মনে হত। ম্যাগলোরির উপরকার ঠোঁটটা মোটা আর নিচের ঠোঁটটা সরু ছিল। তার চোখে-মুখে এক উজ্জ্বল বুদ্ধি আর অন্তরে উদারতার ছাপ ছিল। ম্যাগলোরির চেহারার মধ্যে এক রাজকীয় ঔদ্ধত্যের ভাব ছিল। বাপতিস্তিনের মধ্যে এক শান্ত ও সাধু প্রকৃতির ভাব ছিল। সে কথা কম বলত। তার ধর্মবিশ্বাস প্রগাঢ় ছিল। প্রকৃতি তাকে মেষশাবক করে পৃথিবীতে পাঠায়, ধর্মবিশ্বাস তাকে দেবদূতে পরিণত করে।
