পথিক মুখ তুলে শান্তভাবে বলল, তোমরাও তা হলে জেনে ফেলেছ?
হ্যাঁ।
ওরা আমাকে ওদের হোটেল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
এখান থেকেও তোমায় তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু কোথায় যাব আমি?
অন্য কোথাও।
পথিক তখন হাতে লাঠিটা আর পিঠে ব্যাগটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বড় রাস্তায় আসতেই একদল ছেলে কোথা থেকে এসে ঢিল ছুঁড়তে লাগল পথিকের উপর। সে তখন তার লাঠিটা ঘোরাতেই ছেলেগুলো পাখির ঝাঁকের মতো পালিয়ে গেল।
পথিক এবার একটা জেলখানার সামনে এসে দাঁড়াল। সে ফটকের সামনে একটা শিকলে ঝোলানো ঘন্টাটা বাজাতেই দরজা খুলে একজন প্রহরী বেরিয়ে এল।
পথিক তখন তার টুপিটা মাথা থেকে সরিয়ে বলল, মঁসিয়ে, আপনি দয়া করে রাতটার মতো এখানে আমাকে থাকতে দেবেন?
প্রহরী বলল, এটা কারাগার, পান্থশালা নয়। গ্রেপ্তার না হলে এখানে থাকতে পাওয়া যায় না।
এই বলে সে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
পথিক এবার বড় রাস্তা ছেড়ে একটা গলিপথে ঢুকে একটা বাগান দেখতে পেল। সেই বাগানের ভেতর একটা একতলা বাড়ি ছিল। সে বাড়ির একটা ঘরের খোলা জানালা দিয়ে আলোর ছটা আসছিল। পথিক জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতর দৃষ্টি ছড়িয়ে দেখল, প্রশস্ত ঘরখানার মাঝখানে খাটের উপর একটা বিছানা পাতা ছিল। বিছানার উপর ক্যালিকো কাপড়ের একটা চাদর পাতা ছিল। ঘরের এককোণে একটা দোলনা ছিল। টেবিলে একটা পাত্রে মদ ছিল। প্রায় চল্লিশ বছরের একটা লোক টেবিলের ধারে একটা চেয়ারে বসে একটি শিশুকে তার হাঁটুর উপর দাঁড় করিয়ে তাকে নাচাচ্ছিল। তার সামনে এক যুবতী নারী একটি শিশুকে স্তনদান করছিল। পিতা তার শিশুকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল আর মা হাসিমুখে তা দেখছিল। একটি পিতলের ল্যাম্পের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল ঘরখানা।
পথিক জানালার ধারে দাঁড়িয়ে এই মধুর দৃশ্যটি দেখতে দেখতে ভাবতে লাগল। সে কী ভাবছিল সে-ই তা জানে। সে হয়তো ভাবছিল এই সুখী পরিবারে হয়তো আতিথেয়তার অভাব হবে না। যেখানে এত আনন্দ সেখানে একটুখানি বদান্যতা আশা করা হয়তো অন্যায় হবে না।
পথিক দরজার উপর মৃদু করাঘাত করল। কিন্তু ঘরের ভেতরে কেউ তা শুনতে পেল না। সে আবার দ্বিতীয়বার দরজায় করাঘাত করতে স্ত্রী তা শুনতে পেয়ে তার স্বামীকে বলল, কে হয়তো ডাকছে।
স্বামী বলল, ও কিছু না।
পথিক তৃতীয়বার দরজায় করাঘাত করতেই স্বামী এবার বাতিটা হাতে নিয়ে দরজা খুলল।
লোকটির চেহারাটা লম্বা। তাকে দেখে মনে হল সে একজন চাষি, কিন্তু কোনও কারখানায় মিস্ত্রির কাজ করে। সে চামড়ার একটা আলখাল্লা পরে ছিল। তার দ্রুযুগল ঘন।
পথিক বলল, মাপ করবেন মঁসিয়ে, আমি যদি আপনাকে টাকা দিই তা হলে আপনি কি আমাকে এক প্লেট ঝোল আর আপনার বাড়ির বাইরে বাগানের ধারে এই চাতালটায় রাতের মতো থাকতে দেবেন?
লোকটি বলল, টাকা দিলে কোনও ভদ্রলোককে অবশ্যই আমি আশ্রয় দেব। কিন্তু আপনি কেন কোনও হোটেলে গেলেন না?
হোটেলে কোন ঘর খালি নেই।
সে কি? আজ তো হাটবার নয়। আপনি লাবারতে গিয়ে একবার দেখেছিলেন?
হ্যাঁ গিয়েছিলাম।
তা হলে?
পথিক অস্বস্তিসহকারে বলল, কেন জানি না, ওরা আমাকে থাকতে দিল না।
অন্য হোটেলে দেখেছিলেন? যেমন র্যু দ্য শোফা?
পথিকের অস্বস্তি বেড়ে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, ওরাও আমাকে থাকতে দিল না।
লোকটির মুখের ওপর এবার এক অবিশ্বাসের ভাব ফুটে উঠল। লোকটি পথিকের আপাদমস্তক একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে বলল, তুমি কি তা হলে
এই কথা বলেই সে ঘরের ভেতর ঢুকে বাতিটা নামিয়ে রেখে দেয়াল থেকে তার দোনলা বন্দুকটা এনে পথিককে বলল, বেরিয়ে যাও। চলে যাও এখান থেকে।
স্বামীর কথায় তার স্ত্রী ছেলে দুটিকে ধরে বলে উঠল, তবে কি ডাকাত?
পথিক বলল, আমি অনুরোধ করছি মঁসিয়ে, আমাকে এক গ্লাস জল দিন।
লোকটি বলল, বন্দুকের গুলি ছাড়া আর কিছুই পাবে না তুমি।
এই কথা বলেই সে দরজাটা বন্ধ করে দরজায় খিল দিয়ে দিল।
রাত্রি ক্রমশই গম্ভীর হয়ে উঠছিল। আল্পস পর্বতের তুহিনশীতল কনকনে বাতাস বইছিল।
সেই বাগানটা থেকে বেরিয়ে এসে গলির ধারে আরও একটা বাগানের মধ্যে দেখল পাতায় ঢাকা একটা কুঁড়ে রয়েছে। রাস্তা মেরামতের যারা কাজ করে তারা পথের ধারে এই ধরনের কুঁড়ে তৈরি করে অস্থায়ীভাবে সেখানে থাকার জন্য। পথিক ভাবল এখন কুঁড়েটার মধ্যে কোনও লোক নেই। সে তাই কাঠের বেড়াটা ডিঙিয়ে পার হয়ে কুঁড়েটার মধ্যে গিয়ে ঢুকল। ভেতরটা বেশ গরম। তার মধ্যে খড়ের বিছানা পাতা ছিল। সে তার পিঠ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে সেটা মাথায় দিয়ে শুতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ একটা কুকুরের গর্জন শুনে কুঁড়ে থেকে বেরিয়ে এল সে। সে বুঝল এই কুঁড়েটা কুকুর থাকার ঘর।
কুকুরটা পথিককে আক্রমণ করে তার পোশাকগুলো আরও ছিঁড়ে দিল। পথিক তার লাঠি ঘুরিয়ে কোনওমতে বেরিয়ে গেল বাগান থেকে।
সে আবার গলিপথে এসে পড়ল। একটা পাথরের উপর বসে আপন মনে বলে উঠল, আমি কুকুরেরও অধম।
সেখান থেকে উঠে শহরটাকে পেছনে ফেলে ক্রমাগত হাঁটতে লাগল সে। শহর থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে তার সামনে একটা ফাঁকা মাঠ দেখতে পেল। সম্প্রতি ফসল উঠে যাওয়ায় মাঠটাকে ন্যাড়া মাথার মতো দেখাচ্ছিল। রাত্রির অন্ধকার আর আকাশটাকে মেঘে ছেয়ে থাকার জন্য দিগন্তটা কালো হয়ে ছিল। আকাশে চাঁদ না থাকায় অন্ধকারটাকে আরও ঘন দেখাচ্ছিল।
