হোটেলমালিক বলল, আপনাকে কিছুই দিতে পারব না আমি।
কিন্তু ব্যাপারটা কী?
সব খাবার ও ঘর সংরক্ষিত করে রেখেছে।
কাদের দ্বারা সংরক্ষিত হয়েছে।
ওয়াগনে করে আসা লোকেদের।
ওরা সংখ্যায় কত জন?
বারো জন।
কিন্তু কুড়ি জনের মতো খাবার ও ঘর আছে এখানে।
ওরা সব কিছুর জন্য আগেই অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছে।
পথিক আবার বসে পড়ে আপন মনে বলতে লাগল, আমি একজন ক্ষুধার্ত পথিক। আমি এখানেই বসে থাকব।
হোটেলমালিক পথিকের ঘাড়ের উপর ঝুঁকে পড়ে বলে উঠল, চলে যাও এখান থেকে।
তা শুনে চমকে উঠল পথিক। সে কী বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সে মুখ খোলার আগেই হোটেলমালিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলতে লাগল, আর কথা বলে লাভ নেই। তুমি কে, কী কর তা কি আমার কাছ থেকে শুনতে চাও? তোমার নাম হচ্ছে জাঁ ভলজাঁ। আমি টাউন হলে লোক পাঠিয়েছিলাম এবং দেখ কী লিখে দিয়েছে।
একটা কাগজের টুকরো পথিকের সামনে হোটেলমালিক ধরতেই তার উপরকার লেখাটা পড়ে ফেলল সে। তাতে লেখা ছিল, আমি সকলের সঙ্গেই দ্র ব্যবহার করতে চাই। দয়া করে চলে যান।
আর কিছু না বলে পথিকটি টুল থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আর পেছন ফিরে না তাকিয়ে আনমনে বড় রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল সে। অপমানবোধের এক জ্বালাময় বিষাদ আচ্ছন্ন করে ছিল তার মনকে। কিন্তু যদি একবার সে মুখ ঘুরিয়ে পেছন ফিরে তাকাত তা হলে সে দেখতে পেত হোটেলের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হোটেলমালিক তার দিকে আঙুল বাড়িয়ে কী সব বলছে আর তার চারদিকে একদল লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারল তার এই আকস্মিক আসার কথাটা অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচারিত হয়ে পড়বে সারা শহরে।
এসব কিছুই দেখতে পায় না সে। দুর্ভাগ্যপীড়িত মানুষ পেছন ফিরে কখনও তাকায় না। কারণ সে জানে দুর্ভাগ্য পেছন থেকে তাড়া করে মানুষকে। নিঃসীম নিবিড় হতাশার চাপে ক্লান্তির কথা ভুলে গিয়ে অজানা শহরের পথ দিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে এগিয়ে চলল সে। হঠাৎ ক্ষুধার জ্বালাটা আবার অনুভব করতে লাগল সে। সে দেখল সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। রাত্রির মতো একটা আশ্রয় দরকার।
সে জানত কোনও ভালো বাসস্থান আর সে পাবে না। তার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সে চায় গরিব-দুঃখীরা যেখানে থাকে সেই ধরনের ছোটখাটো একটা পান্থশালা। যেতে যেতে হঠাৎ সে দেখল যে পথ দিয়ে সে হাঁটছিল তার শেষ প্রান্তে একটা ঘরে একটা টর্চের আলো ঝুলছে। সেই আলোটা লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল সে।
র্যু দ্য সোফা অঞ্চলে ওটা হচ্ছে একটা ছোটখাটো হোটেল। হোটেলটার কাছে এসে পথিক জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ঘরের ভেতরটা দেখল। দেখল ঘরের ভেতরে টেবিলের উপর একটা আলো জ্বলছে। জনকতক লোক মদ পান করছে। হোটেল মালিক আগুনের পাশে বসেছিল আর উনোনে কী একটা রান্নার জিনিস সিদ্ধ হচ্ছিল। হোটেলে ঢোকার দুটো প্রবেশপথ ছিল –একটা সামনের দিকে আর একটা পেছন দিকে একটা উঠোনের উপর দিয়ে গোবরের স্কুপের পাশ দিয়ে। পথিক সামনের দিক দিয়ে যেতে সাহস পেল না। সে তাই পেছন দিকে উঠোন পার হয়ে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল।
হোটেলমালিক বলল, কে আসে?
পথিক বলল, খাবার আর একটা বিছানা চাই শোবার জন্য।
তা হলে ভেতরে আসতে পার। দুটোই পাবে।
পথিক ঘরের ভেতর ঢুকে উনোনের জ্বলন্ত আগুনের আভা আর টেবিল ল্যাম্পের আলোর মাঝখানে দাঁড়াতেই উপস্থিত সকলেই তার পানে তাকাল। সে তার পিঠের ব্যাগটা যখন নামাল তখনও সকলে নীরবে তাকিয়ে ছিল তার পানে।
হোটেলমালিক বলল, উনোনে ঝোল সিদ্ধ হচ্ছে। এস বন্ধু, শরীরটা একটু গরম করে নাও।
পথিক আগুনের ধারে বসে তার ক্লান্ত পা দুটো ছড়িয়ে দিল। ঝোল সিদ্ধর একটা মিষ্টি গন্ধ আসছিল। মাথার টুপিটা মুখের উপর অনেকটা নামানো থাকায় তার মুখের যতটা দেখা যাচ্ছিল তাতে বোঝা যাচ্ছিল সে সচ্ছল সুখী পরিবারের লোক। কিন্তু দীর্ঘকাল দুঃখকষ্টে জর্জরিত হওয়ার ফলে তার অবস্থা এমন শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুখখানায় বিষাদ জমে থাকলেও সে মুখ দেখে বোঝা যায় তার চেহারা বেশ বলিষ্ঠ। বৈপরীত্যমূলক অদ্ভুত একটা ভাব ছিল সে মুখে। সে মুখে একদিকে ছিল আপাতোর একটা ছাপ আর অন্যদিকে ছিল আপাতপ্রভুত্বের এক ঔদ্ধত্য। তার ঘন ভ্রুযুগলের নিচে তার চোখ দুটো ঝোঁপের তলায় আগুনের মতো জ্বলছিল।
ঘরের মধ্যে যেসব লোক মদ পান করছিল তাদের মধ্যে একজন মৎস্য ব্যবসায়ী ছিল। আজ সকালে সে যখন ঘোড়ায় চেপে এক জায়গা দিয়ে আসছিল তখন এই পথিকের সঙ্গে দেখা হয়। পথিক নিদারুণ ক্লান্তির জন্য ওই মৎস্য ব্যবসায়ীকে তার ঘোড়ার উপর তাকে চাপিয়ে নেবার জন্য অনুরোধ করে কিন্তু মৎস্য ব্যবসায়ী তার উত্তরে জোরে চালিয়ে দেয় তার ঘোড়াটাকে। আবার কিছুক্ষণ আগে জ্যাকিন বারে যখন তার হোটেল থেকে এই পথিককে তাড়িয়ে দেয় তখনও ওই মৎস্য ব্যবসায়ী হোটেলের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এখানে এসে সবাইকে সেকথা বলে দেয়। হোটেলমালিক সে কথা জানত না। পথিক এ হোটেলে এসে ঢুকে আগুনের ধারে বসতেই সে হোটেলমালিককে ডেকে তাকে জানিয়ে দিল কথাটা।
সে কথা শুনে হোটেলমালিক পথিকের কাছে এসে তার কাঁধে একটা হাত দিয়ে বলল, এখান থেকে তোমাকে চলে যেতে হবে।
