এ শহরের কেউ চিনত না তাকে। হয়তো সে দক্ষিণ দিকের উপকূলভাগ থেকে এসে শহরে ঢুকছিল। ঠিক সেই পথ দিয়ে শহরে ঢুকছিল যে পথ দিয়ে সাত সাল আগে নেপোলিয়ঁন কেন থেকে প্যারিসে গিয়েছিলেন। সে নিশ্চয় সারাদিন পথ হাঁটছিল, তাই তাকে খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। বাজারের কাছে সাধারণের জল খাবার জন্য একটা ঝরনা ছিল, তাতে সে দু বার জল খায়।
র্যু পয়শেভার্তের কোণের কাছে সে বাদিকে ঘুরে টাউন হলে যাবার পথ ধরে। সে টাউন হলে ঢুকে আধ ঘণ্টা পরে বেরিয়ে আছে। টাউন হলের দরজার কাছে একটা পাথরের বেঞ্চের উপর একজন পুলিশ বসেছিল সেখানে থেকে ৪ মার্চ জেনারেল দ্রাউন্ড সমবেত জনতাকে নেপোলিয়ঁনের গলফ জুয়ানে অবতরণের ঘোষণাপত্রটি পড়ে শুনিয়ে চমকে দেন। পথিক পুলিশের কাছে এসে টুপি খুলে অভিবাদন জানাল তাকে। পুলিশ তাকে প্রতি-অভিবাদন না জানিয়ে তার চেহারাটাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। পথিকটি সঙ্গে সঙ্গে চলে যেতেই সে তার নিজের কাজে অফিসের ভেতর ঢুকে গেল। সেকালে দিগনেতে একটি সুদৃশ্য পান্থশালা ছিল, তার নাম ছিল ক্ৰয় দ্য কোলবা আর তার মালিকের নাম ছিল জ্যাকিন লাবারে। গ্রেনোবেলের এয় ডফিন নামে পান্থশালার মালিক আর এক লাবারের সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক ছিল। সম্রাটের গলফ জুয়ানে অবতরণকালে। ত্রয় ডফিন সম্পর্কে অনেক গুজব রটেছে। লোকে বলত গত বছর জানুয়ারিতে জেনারেল বার্ট্রান্ড গোপনে ত্রয় ডফিন গাড়িচালকের ছদ্মবেশে এসে সৈনিকদের পদক আর কিছু নাগরিককে মুদ্রা দান করে যায়। আসল কথা হল এই যে সম্রাট নেপোলিয়ঁন গ্রোনোবেলে এসে মেয়র যেখানে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেছিল সেখানে না থেকে তিনি ক্রয় ডফিনে চলে যান। বলেন, সেখানে তার এক পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। তাতে ক্রয় ডফিনের খ্যাতি চারদিকে পঁচিশ মাইল দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে দিগনের হয় দ্য কোলবার খ্যাতিও বেড়ে যায়। লোকে বলে ত্রয় কোলবার মালিক ত্রয় ডফিনের মালিকের জ্ঞাতি ভাই।
পথিক দিগনের ত্রয় কোলবার দিকে এগিয়ে যায়। হোটেলের রান্নাঘরটি রাস্তার দিকে ছিল। পথিক সেই ভোলা রান্নাঘর দিয়ে হোটেলে প্রবেশ করল। রান্নার উনোনগুলোতে তখন আগুন জ্বলছিল। হোটেলের মালিক তখন রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল। সে তখন ওয়াগনে করে আসা একদল লোকের খাবার তৈরি করছিল। লোকগুলো পাশের ঘরে কথাবার্তা বলছিল আর হাসাহাসি করছিল। ওয়াগনে করে আসা লোকেরা হোটেলে বেশি খাতির পায় একথা সবাই জানে।
দরজা দিয়ে পথিক রান্নাঘরে প্রবেশ করতেই হোটেলমালিক বলল, আমি মঁসিয়ের জন্য কী করতে পারি?
পথিক বলল, খাবার আর একটা বিছানা চাই।
পথিককে খুঁটিয়ে দেখে হোটেলমালিক বলল, তা অবশ্যই পাওয়া যাবে, তবে তার জন্য আপনাকে টাকা দিতে হবে।
তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা চামড়ার থলে বার করে পথিক বলল, আমার কাছে টাকা আছে।
হোটেলের মালিক বলল, তা হলে আপনি থাকতে পারেন। আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।
চামড়ার থলেটা আবার তার পকেটে রেখে তার পিঠে সৈনিকদের মতো যে একটা ব্যাগ ছিল সেটা মেঝের উপর নামিয়ে রাখল। তার পর হাতের লাঠিটা ধরেই আগুনের পাশে একটা টুলের উপর বসে পড়ল পথিকটি। দিগনে শহরটা পাহাড়ের উপর অবস্থিত বলে অক্টোবর মাসেই সেখানে দারুণ শীত পড়ে। হোটেলমালিক রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকলেও মাঝে মাঝে পথিকের পানে তাকিয়ে কী দেখছিল।
হোটেলমালিক একসময় বলল, আপনার খাবার কি তাড়াতাড়ি চাই?
পথিক উত্তর করল, হ্যাঁ, খুব তাড়াতাড়ি।
ঘরের দিকে পেছন ফিরে বসে আগুনে গা-টা গরম করছিল পথিক। হোটেলমালিক জ্যাকিন লাবারে একটা খবরের কাগজ থেকে একটুকরো ছিঁড়ে তার উপর পেন্সিল দিয়ে দুই-এক লাইন কী লিখল। তার পর তার একটা বালকভৃত্যকে ডেকে সেই কাগজটা তার হাতে দিয়ে কী বলতেই ছেলেটা টাউন হলের দিকে তখনি চলে গেল। পথিক এসব কিছুই দেখতে পেল না।
সে হোটেলমালিককে জিজ্ঞাসা করল, খাবার শিগগির পাওয়া যাবে?
হোটেলমালিক বলল, হ্যাঁ, শিগগির পাওয়া যাবে।
ছেলেটি ফিরে এসে একটুকরো কাগজ এনে হোটেলমালিকের হাতে দিতেই সে সেটা ব্যগ্রভাবে ধরে নিল। তার পর একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে কী ভাবতে লাগল। পরে সে পথিকের কাছে গিয়ে দেখল পথিক এক মনে কী সব ভাবছে।
হোটেলমালিক বলল, দুঃখিত মঁসিয়ে, আমি এখানে আপনাকে থাকতে দিতে পারব না।
পথিকটি মুখ ঘুরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কিন্তু কেন? আমি টাকা দিতে পারব না বলে আপনি কি ভয় করছেন? আপনি কি আগাম টাকা চান? আমি তো বলেছি আমার কাছে টাকা আছে।
কথাটা তা নয়।
তা হলে কী?
আপনার কাছে টাকা আছে। কিন্তু—
কিন্তু কী?
আমার হোটেলে ঘর খালি নেই।
পথিক তখন শান্ত কণ্ঠে বলল, তা হলে আমাকে আস্তাবলে একটা জায়গা করে দিন।
সেখানে আমি থাকতে দিতে পারি না।
কেন পারেন না?
সেখানে ঘোড়াগুলো গোটা ঘরটা জুড়ে থাকে।
তা হলে খড়ের গাদার কাছে। খাওয়ার পর সেটা দেখা যাবে।
আপনাকে আমি খাবার দিতে পারব না।
হোটেলমালিকের দৃঢ় ও স্পষ্ট কণ্ঠস্বরে পথিকের সর্বাঙ্গ যেন কেঁপে উঠল। সে বলল, কিন্তু আমি ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছি। সকাল থেকে পথ হাঁটছি আমি। প্রায় চব্বিশ মাইল পথ হেঁটেছি। কিছু না কিছু আমাকে খেতেই হবে।
