মানুষের চিন্তার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। মানুষ কোনও কিছু বুঝতে না পারলেও সেই দুর্বোধ্য বিষয়কে সে তার উদ্ধত চিন্তা দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। প্রাকৃত বা বস্তুজগৎকে ফেলে সে এক তুরীয়লোকে উঠে যায়। সেখানে চিন্তার কর্তা এবং চিন্তার বস্তু মিলে মিশে এক হয়ে যায়। যাই হোক, কিছু লোক অবশ্য আছেন যারা তাদের চিন্তা দিগন্তের ওপারে পরম সত্যের চূড়াটি স্পষ্ট দেখতে পান। সে যেন এক ভয়ঙ্কর অন্তহীন সীমাহীন এক বিশাল পাহাড়। মঁসিয়ে বিয়েনভেনু এইসব নেতাদের একজন ছিলেন না; তাঁর সে প্রতিভা ছিল না। তিনি সেই বিশাল পাহাড়ের অভ্রভেদী চূড়াগুলোকে বিশ্বাস করতে পারতেন না, যার থেকে সুইডেনবার্গ ও পাস্কেলের মতো মহান পণ্ডিতরা পড়ে গিয়ে উন্মাদ হয়ে যান। অবশ্য এইসব শক্তিশালী চিন্তাশীলের চিন্তার একটা মূল্য আছে, কারণ এই চিন্তার থেকেই আমরা পূর্ণতার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি। কিন্তু বিশপ বিয়েনভেনু সে পথে না গিয়ে এক সহজ পথ ধরেন। সে পথ হচ্ছে বাইবেলের হোলি গসপেলের পথ।
তিনি এলিজার পোশাক পরে বর্তমানের কুয়াশাচ্ছন্ন কঠিন ঘটনাজালের ওপর ভবিষ্যৎ দৃষ্টির কোনও আলোকসম্পাত করতে চাইতেন না। সেই দূরদৃষ্টির আলোকটিকে এক উজ্জ্বল জ্যোতিতে পরিণত করতে পারতেন না। তিনি ভবিষ্যদ্রষ্টা বা ঋষি ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক সাধারণ সরল প্রকৃতির মানুষ যিনি সকলকে নির্বিশেষে ভালোবেসে যেতেন।
তিনি ধর্মগত সীমাকে অতিক্রম করে তার প্রার্থনার বস্তুকে অতিমানবিক আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্য পর্যন্ত প্রসারিত করতেন ঠিক। কিন্তু আমাদের ভালোবাসার যেমন একটা সীমা আছে, তেমনি প্রার্থনারও একটা সীমা আছে। তবে ধর্মগত সীমার বাইরে ধর্মগ্রন্থনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু বাইরে প্রার্থনা করাটা যদি খ্রিস্টীয় ধর্মমতের বিরোধিতা হয় তা হলে সেন্ট টেরেস ও সেন্ট জেরোফ খ্রিস্টবিরোধী ছিলেন।
তাঁর অন্তর শুধু মানুষের দুঃখমোচনের চিন্তায় সব সময় বিব্রত থাকত। তাঁর মনে হত সারা জগৎ অন্তহীন দুঃখদুর্দশায় ভরা। তিনি সর্বত্রই দেখতেন শুধু দুঃখকষ্টের উত্তাপ এবং সে দুঃখকষ্টের কারণ জানতে না চেয়ে সেই দুঃখের ক্ষত নিরাময় করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যেতেন তিনি। বাস্তব দুঃখদুর্দশার ভয়ঙ্কর অবস্থা দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মমতা ও সমবেদনা বেড়ে গেল। সেই দুঃখদুর্দশার হাত থেকে কিভাবে মুক্ত করা যায় মানুষকে তিনি তার উপায় খুঁজতেন এবং আর পাঁচজনকে সে উপায় বলে দিতেন। তাঁর কেবলি মনে হত পৃথিবীর সব মানুষ যেন এক অসহনীয় দুঃখের নিবিড়তায় সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
অনেক মানুষ সোনার জন্য খনি খোঁড়ে। কিন্তু বিশপ বিয়েনভেনুর কাছে দুঃখ-দারিদ্রই ছিল সোনার খনি। সে খনি খুঁড়ে তার থেকে শুধু করুণা কুড়িয়ে আনতেন তিনি। বিশ্বব্যাপী দুঃখকষ্টের জন্য বিশ্বব্যাপী বদান্যতার এক প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন। ‘পরস্পরকে ভালোবাস’–এই ছিল তার নীতি এবং এই নীতিই ছিল তার জীবনের সব। এর বেশি আর কিছু চাইতেন না তিনি।
যে সিনেটরের কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, যিনি বিশপকে দার্শনিক বলতেন, তিনি একদিন তাকে বলেন, আপনি দেখুন, এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ একে অপরের সঙ্গে সংগ্রামে মত্ত এবং যে বলবান সে-ই জয়লাভ করে সে সংগ্রামে। পরস্পরকে ভালোবাস–এই নীতি এক নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই না।
বিশপ তখন তাঁর সঙ্গে কোনও বিতর্ক না করে বলেন, ঠিক আছে, এটা যদি নির্বুদ্ধিতা হয়, তা হলে সব মানুষের আত্মার উচিত ঝিনুকের মধ্যে মুক্তোর মতো সে নির্বুদ্ধিতাকে বুকের মধ্যে ধরে রেখে তা বহন করা। তিনি তাই করতেন। সেই নির্বুদ্ধিতাকে বুকের মধ্যে ঢেকে রেখে তিনি চলতেন, যেসব বড় বড় প্রশ্ন এক একটি অন্তহীন বিশাল শূন্যতা গভীরতা নিয়ে চিন্তাশীল মানুষদের মোহমুগ্ধ ও ভীত করে তোলে, তিনি সেগুলোকে এড়িয়ে যেতেন। আস্তিকরা এইসব প্রশ্নের বিশাল গভীরতার মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতে পায়, আর নাস্তিকরা সেখানে ঈশ্বরকে না পেয়ে নরকে গমন করে। মানুষের ভাগ্য, ভালো-মন্দ, মানুষ মানুষে বিবাদ-বিসম্বাদ, মানুষের ও পশুর চেতনা, মৃত্যুতে মানুষের রূপান্তর, সমাধিতে মানুষের পুনর্জীবনের কল্পনা, গতিশীল আত্মার নতুন নতুন প্রেমের অভিজ্ঞতা, বস্তু ও তার সত্তা, মানুষের আত্মার স্বরূপ, স্বাধীনতা, প্রয়োজন, খাড়াই পাহাড়ের মতো এইসব সমস্যামূলক প্রশ্নগুলো বিরাট চিন্তাশীল ব্যক্তিদের অভিভূত করে। লুক্রেশিয়া, পল ও দান্তের মতো দার্শনিক ও চিন্তাশীল এইসব প্রশ্নের অন্তহীন অন্ধকার শূন্যতার মাঝে সন্ধানী দৃষ্টির আলো ফেলে তার সমাধান খুঁজতে গিয়ে সেই অনন্ত শক্তির সন্ধান পান, যা সমস্ত আলোর উৎস।
মঁসিয়ে বিয়েনভেনু ছিলেন এক সরল মানুষ, যিনি এইসব প্রশ্ন ও সমস্যাগুলোকে বাইরে থেকে দূর থেকে দেখতেন, তাদের খুব কাছে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতেন না। এইসব প্রশ্নের দ্বারা মনকে কখনও পীড়িত হতে দিতেন না। ইহলোক অতিক্রম করে পরলোকের চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকতেন।
১.২ দিগনে শহরের পথে
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
১
১৮১৫ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা আগে একজন পথিক পদব্রজে দিগনে শহরের পথে প্রবেশ করল। শহরের কিছুসংখ্যক লোক যারা খোলা জানালা বা দরজা দিয়ে তাকে দেখল, এক অস্পষ্ট সংশয়ে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল তাদের মন। এমন অবাঞ্ছিত অশোভন বেশভূষায় কোনও পথিককে সাধারণত দেখা যায় না। বয়সে লোকটি ছিল মধ্যবয়সী, প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। চেহারাটা ছিল বলিষ্ঠ, কাঁধ দুটো চওড়া, দেহের উচ্চতা মাঝামাঝি। মাথায় ছিল একটা চামড়ার টুপি। তাতে তার মুখের আধখানা প্রায় ঢাকা ছিল। রোদে পোড়া মুখখানা থেকে ঘাম ঝরছিল। তার গায়ের চাদরটা দড়ির মতো পাকানো ছিল এবং তার পরনের জ্যাকেট পায়জামা সবই ছেঁড়া ছিল। তার পায়ে মোজা ছিল না, জুতোয় পেরেক আঁটা ছিল। তার মাথার চুলগুলো লম্বা করে ছাঁটা ছিল, কিন্তু মুখের দাড়িটা লম্বা হয়ে উঠেছিল। বেশ কিছুদিন কাটা হয়নি দাড়িটা। ঘাম আর পথের ধুলো আরও শোচনীয় করে তুলেছিল তার চেহারাটাকে।
