আমরা আগেই দেখেছি দৈনন্দিন জীবনে সব সময় তিনি কোনও না কোনও কাজে ব্যস্ত থাকতেন। প্রার্থনা, অফিসের কাজ, ভিক্ষাদান, আর্তদের সান্ত্বনাদান, বাগানের কাজ, তার দেহটি যখন এইসব কাজে সর্বদা ব্যস্ত থাকত, মনটি তখন তাঁর সৌভ্রাতৃত্ব, মিতব্যয়িতা, আতিথেয়তা, ত্যাগ, বিশ্বাস আর পড়াশোনার কথায় ভরে থাকত। এইভাবে সৎ চিন্তা আর সৎ কর্মের মধ্য দিয়েই দিনগুলো কেটে যেত তার। কিন্তু সারাদিন সব কাজ করেও তার মনে হত কিছু করা হল না যদি না রাত্রিতে শোবার আগে আবহাওয়া ভালো থাকলে বাগানে দু’এক ঘণ্টা একা না কাটাতেন। ঘুমোবার আগে স্তব্ধগম্ভীর নৈশ আকাশের তলে কিছুক্ষণ ধ্যান ও ঈশ্বরচিন্তা করাটা এক অত্যাবশ্যক আনুষ্ঠানিক কর্ম বলে ধরে নিয়েছিলেন তিনি।
বাড়ির মহিলা দু জন তখন শুতে চলে যেত। তারা উপরতলায় গিয়ে যদি ঘুমিয়ে না। পড়ত তা হলে তারা শুনতে পেত বাগানের পথে একা একা পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন বিশপ। আপন নিঃসঙ্গতায় আপনি বিভোর হয়ে তিনি যেন আকাশে উদার প্রশান্তির সঙ্গে আপন অন্তরের প্রশান্তিকে মিলিয়ে নিয়ে দৃশ্য-অদৃশ্য সকল বস্তুর মাঝে ঈশ্বরের ঐশ্বর্যের সন্ধান করে চলতেন মনে মনে। অজ্ঞাতলোক হতে যেসব চিন্তা ঝরে পড়ত নিঃশব্দে তার সামনে তাঁর অন্তরকে প্রসারিত করে দিতেন তিনি। এইসব মুহূর্তে বিশ্বসৃষ্টির সর্বব্যাপী ঐশ্বর্যের দ্বারা পরিবৃত হয়ে নক্ষত্রালোকিত রাত্রির মাঝে ক্রমোন্মীলিত গন্ধবিহীন কুসুমরাজির মতো তিনি যখন ধীরে ধীরে আপন অন্তরকে উন্মীলিত করে দিতেন তখন তিনি বুঝতে পারতেন না, তিনি কী পেলেন বা কী দিলেন, বাইরে থেকে কী এসে প্রবেশ করল তার অন্তরে আর তাঁর অন্তর থেকেই-বা কী বেরিয়ে গেল, বুঝতে পারতেন না কী ঘটত তার অন্তর্জগতে। এইভাবে বিশ্বসৃষ্টির অনন্তত্বের সঙ্গে তার আপন অন্তরের অনন্তত্ত্বের এক রহস্যময় আদান-প্রদান চলত।
জাগতিক সব বস্তুর মধ্যে ঈশ্বরের মহত্ত্ব এবং জীবন্ত অস্তিত্ব উপলব্ধি করার চেষ্টা। করতেন বিশপ। অনন্ত অতীত ও অনন্ত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতেন। তাঁর বোনের সামনে পরিদৃশ্যমান শান্ত সসীম বস্তুর মাঝে অসীম অনন্তকে ধরার চেষ্টা করতেন। কিন্তু বোধাতীত এইসব বিষয়কে বুঝতে না পেরে তিনি শুধু চিন্তা করে যেতেন। তিনি ঈশ্বরকে নিয়ে বিচার-বিবেচনা করতেন না, তিনি শুধু মুগ্ধ বিস্ময়ে ঈশ্বরের মহিমা উপলব্ধি করে যেতেন। অণু-পরমাণুর যে সুষম সমন্বয় প্রতিটি বস্তুর অবয়বকে গড়ে তুলে তাকে সত্তা দান করে, তাকে শক্তি দেয়, একের মধ্যে অসংখ্য এবং সমগ্রের মধ্যে ভিন্নতার সৃষ্টি করে এবং এক আলোক বিকীরণ করে তার মাধ্যমে সৌন্দর্যের জন্ম দেয়, সেই আণবিক সমন্বয়ের কথা ভাবতেন তিনি। এই সময় এবং অন্তহীন যোগ-বিয়োগের লীলাই জীবন এবং মৃত্যু।
বাগানে একটি বেঞ্চের উপর বসে তার ভাঙা রডের গায়ে পিঠটা হেলান দিয়ে ফলের গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আকাশের তারার পানে তাকিয়ে থাকতেন তিনি। সারা বাড়িটার মধ্যে এই জায়গাটা বড় প্রিয় ছিল তার কাছে।
সারা দিনরাতের মধ্যে এই অবসরটুকু ছাড়া আর কিছুই চান না বিশপ। রোজ দু বার করে বাগানে যেতেন তিনি–একেবার দিনের বেলায় বাগানের কাজ করতেন, গাছের যত্ন নিতেন আর রাত্রিবেলায় বাগানে বসে ঈশ্বরচিন্তা করতেন। তাঁর কর্মব্যস্ত দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে মুক্ত আকাশের চন্দ্রাতপতলে এই ছোট্ট জায়গাটুকু ঈশ্বরোপাসনার পক্ষে যথেষ্ট। পায়ের তলায় ছড়ানো অসংখ্য ফুল আর মাথার উপরে অসংখ্য তারা নিয়ে এই স্বল্পপরিসর জায়গাটুকুতে পায়চারি আর চিন্তা করা–আর কী চান তিনি।
.
১৪
আমরা বিশপের যে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিবরণ দান করেছি তাতে মনে হবে তিনি ছিলেন সর্বেশ্বরবাদী। কিন্তু আসলে বিশপ এক নিজস্ব জীবনদর্শন গড়ে তুলেছিলেন। তার নিঃসঙ্গ নির্জন মনের উদার পটভূমিতে সঞ্জাত এই জীবনদর্শন অনেক সময় প্রথাগত প্রচলিত ধর্মমতের সঙ্গে খাপ খেত না। যারা মঁসিয়ে বিয়েনভেনুকে চিনত ও জানত তাদের এই ধারণাই হত তার সম্বন্ধে। তারা বুঝত তাঁর অন্তরই ছিল সব চিন্তার উৎস, অন্তরের আলো থেকেই তাঁর সব ভাব ও প্রজ্ঞার উদ্ভব হত।
কিন্তু কোনও এক বিশেষ দার্শনিক তত্ত্ব সৃষ্টি করেননি তিনি। অনেক দার্শনিক কথা চিন্তা করতেন তিনি শুধু নির্জনতার শান্ত আকাশে। এইসব নির্জন চিন্তার ফলে সহজ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেসব তত্ত্বকথা তাঁর অন্তর থেকে বেরিয়ে আসত সেইসব কথাই বাইরে বলতেন তিনি। কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে তার যুক্তিকে বিব্রত করে তুলতেন না কখনও। একজন ঈশ্বরপ্রেরিত পুরুষ অনেক বেশি সাহসের পরিচয় দিতে পারেন। কিন্তু একজন বিশপকে সতর্কতার সঙ্গে চলতে হয়। যেসব সমস্যা দেশের বড় বড় চিন্তাশীল ও ধর্মগুরুদের ভাবনার বস্তু সেইসব সমস্যা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাতেন না তিনি। সেইসব জটিল সমস্যার দ্বারপ্রান্তে এসে এক ধর্মগত ভয়ে থমকে দাঁড়াতেন তিনি। যে দ্বারপ্রান্তের ওপারে অন্ধকার প্রশস্ত বারান্দা প্রসারিত হয়ে আছে, কিন্তু কোনও এক অদৃশ্য অশ্রুত কণ্ঠস্বর যেন যেখানে প্রবেশ করতে নিষেধ করতে তাকে। যে দুঃসাহসী ব্যক্তি সেখানে জোর করে প্রবেশ করে তাকে দুঃখ পেতে হয় পরিশেষে। কিছু কিছু প্রতিভাধর পুরুষ সীমাহীন নির্বিশেষ কল্পনা আর অন্তহীন ধ্যান-ধারণার গভীরে গিয়ে যেসব তত্ত্ব উপলব্ধি করেন সেগুলোকে তারা প্রথমে ঈশ্বরকেই সমর্পণ করেন। সেই তত্ত্বকথাগুলোই এক একটি ব্যক্তিগত ধর্মমতে পরিণত হয়। তবু তার মধ্যে অনেক প্রশ্নের অবকাশ আছে, অনেক দায়িত্ব জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে।
