বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিশপের যে কতকগুলি গোপন রহস্যের দিক ছিল, তা একমাত্র মৃত্যুর পরেই প্রকটিত হয়ে উঠতে পারে। তবে আমরা শুধু এইটুকু জোর করে বলতে পারি যে তার ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোনও ভণ্ডামি ছিল না। হিরেতে যেমন কোনও খাদ থাকে না, তার ধর্মবিশ্বাসেও কোনও খাদ ছিল না। এই নিখাদ ধর্মবিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই তিনি তাঁর দৈনন্দিন কাজকর্ম করে যেতেন। তাতে তাঁর বিবেক তৃপ্ত হত। তিনি যে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত সে বিষয়ে নিশ্চিত হতেন তিনি।
ধর্মবিশ্বাস ছাড়া বিশপের আর একটি গুণ ছিল। মানুষের প্রতি এক নির্বিশেষে নিখাদ ভালোবাসার অন্তহীন প্রবাহে তাঁর অন্তর প্লবিত হত সতত। এই ভালোবাসার জন্য শহরের আত্মম্ভরী, অহঙ্কারী ও তথাকথিত শিক্ষিত নাগরিকরা তাঁকে দুর্বলমনা ভাবত। বিশপের এই ভালোবাসার আতিশয্যটা আসলে কী, তা অনেকে বুঝে উঠত না। আসলে এটা ছিল এমনই পরোপকার প্রবৃত্তি যা সকল মানুষ ও এমনকি ইতর প্রাণীদের পর্যন্ত আলিঙ্গন করত এবং সর্বত্র প্রসারিত ছিল। কোনও কিছুকেই ঘৃণা করতেন না তিনি, ঈশ্বরের সৃষ্টি হিসেবে সব কিছুকেই তিনি ভালোবেসে যেতেন। এমনকি অনেক ভালো ভালো মানুষের প্রতি উদাসীন থেকে পশুদের ভালোবাসা দান করতেন। অন্য যাজকদের মধ্যে এ বিষয়ে যে অসহিষ্ণুতা দেখা যেত দিগনের বিশপের মধ্যে তা ছিল না। তিনি ব্রাহ্মণদের মতো অত সাত্ত্বিক পূজারি না হলেও তিনি প্রায়ই স্তোত্রগান করতেন আপন মনে। কে জানে মহান ব্যক্তিদের আত্মা কেন ঊর্ধ্বে গমন করে আর পশুদের আত্মা কেন নরকের দিকে গমন করে। কোনও কোনও কুৎসিত চেহারা বা বিকৃত কোনও প্রবৃত্তি তাঁকে ভীত করে তুলতে পারত না। তিনি অবশ্য তাতে বিচলিত হতেন, মাঝে মাঝে দুঃখবোধ করতেন এবং জীবনের এইসব অবাঞ্ছিত বহিরঙ্গের অন্তরালে কী কারণ থাকতে পারে, তা খোঁজার চেষ্টা করতেন। তিনি মাঝে মাঝে ঈশ্বরের কাছে জীবন ও জগতের সব কিছু পুনর্গঠিত করার জন্য প্রার্থনা করতেন। এক স্থিতধী প্রজ্ঞা আর প্রশান্তির সঙ্গে তিনি জীবনের যত সব অসংগতি, প্রকৃতি জগতের যত কিছু বিশৃঙ্খলার কথা চিন্তা করতেন এবং সেই চিন্তাভাবনার কথা মাঝে মাঝে তার মুখ থেকে স্বগতোক্তির মতো বেরিয়ে আসত। একদিন তিনি যখন বাগানে বেড়াচ্ছিলেন তখন এই ধরনের একটা কথা বেরিয়ে আসে তাঁর মুখ থেকে। তিনি ভাবছিলেন তিনি একা আছেন। কিন্তু তার থেকে কয়েক পা দূরে তাঁর বোন ছিল তিনি তা দেখতে পাননি। মাটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন তিনি। একটা বড় কালো মাকড়সা দেখতে পেলেন।
বাপতিস্তিনে শুনতে পেলেন তার ভাই বলছেন, হায় হতভাগ্য প্রাণী, বেচারার কোনও দোষ নেই।
এইসব আপাত-অবান্তর মহত্ত্ব ও মহানুভবতার কথাগুলো নথিভুক্ত করে রাখা হয়নি কেন কে জানে। এইসব কথাগুলো যদি ছেলেমানুষির পরিচায়ক হয় তা হলে সেন্ট ফ্রান্সিস ও মার্কাস অরেলিয়াসের কথাগুলোকে ছেলেমানুষি হিসেবে ধরতে হবে। একবার একটি পিঁপড়েকে তাঁর পথে দেখতে পেয়ে তাকে পা দিয়ে না মাড়িয়ে কষ্ট করে সেটাকে পাশ কাটিয়ে যান। এক একসময় তিনি বাগানের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তেন। কিন্তু তাঁকে সে অবস্থায় দেখে আরও শ্রদ্ধা জাগত মনে।
মঁসিয়ে বিয়েনভেনুর বাল্যজীবন ও যৌবনের যেসব কথা শোনা যায় তার থেকে জানা যায় তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ছিলেন এবং তিনি হিংসার আশ্রয় নিতেন না। সকল মানুষ ও জীবের প্রতি তার যে করুণার স্রোত সতত প্রবাহিত হত, সে করুণার স্রোত তাঁর কোনও সহজাত প্রবৃত্তি হতে উৎসারিত হত না, উৎসারিত হত এমন এক গভীর প্রত্যয় থেকে যে প্রত্যয় তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যে বিভিন্ন চিন্তার ভেতর দিয়ে জলের ফোঁটার মতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ত তার অন্তরে। পাহাড়ের উপর থেকে জল ঝরে পড়ার জন্য যেমন ঝরনা বা গিরিখাতের সৃষ্টি হয়, মানুষের স্বভাবের মধ্যেও তেমনি প্রত্যয়ের জল ঝরে পড়ে পড়ে একটি নদীখাতের সৃষ্টি হয়।
১৮১৫ সালে তার বয়স হয় পঁচাত্তর। কিন্তু তাকে দেখে ষাট বছরের বেশি বলে মনে হত না। তার চেহারাটা লম্বা ছিল না, তবে স্থূলতার দিকে একটা ঝোঁক ছিল এবং এই স্থূলতার ভাবটাকে কমাবার জন্য তিনি রোজ অনেকটা করে হাঁটতেন। তিনি যখন লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতেন তখন তাঁর পিঠটা একটু ধনুকের মতো বাঁকা দেখাত। এর থেকে অবশ্য কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। যোড়শ পোপ গ্রেগরি আশি বছর বয়সেও খাড়া হয়ে হাসিমুখে চলতেন। তবু পোপ হিসেবে খ্যাতিলাভ করতে পারেননি। বিশপ বিয়েনভেনুর চেহারাটা সুদর্শন ছিল, কিন্তু তাঁর ব্যবহারটা এমনই মধুর ছিল যে তার চেহারার কথাটা কেউ মনে রাখত না।
তার কথাবার্তায় যে শিশুসুলভ এক সরলতা আর সুষমা ছিল তাতে সকলেই স্বচ্ছন্দ অনুভব করত। তার সমস্ত দেহ হতে একটা জ্যোতি বিচ্ছুরিত হত। তিনি যখন হাসতেন, তখন তাঁর সাদা ঝকঝকে সুন্দর দাঁতগুলো বেরিয়ে আসত, তখন সবাই তার শিশুসুলভ সরলতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তাদের আপনজন ভাবত। অনেকে বলত, “যেন এক সুন্দর ছেলে। আবার অনেক বলত, কী ভালো লোক! নেপোলিয়ঁন যখন তাঁকে প্রথম দেখেন তখন তার মনেও এই ভাব জাগে। যে কোনও লোক তাঁকে প্রথম দেখলেই এইরকম ভাব মনে জাগত তার। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা তার কাছে থাকলে দেখা যেত তাঁর চিন্তামগ্ন চেহারা ক্রমশ পাল্টে আরও মনোহারী হয়ে উঠছে। তার মাথায় পাকা চুল থাকায় তার প্রশস্ত উদার ললাট আরও গম্ভীর দেখাত। তিনি প্রায়ই ঈশ্বরচিন্তায় বিভোর ও ধ্যানমৌন থাকার জন্য সে ললাট আরও মহান ও উন্নত দেখাত। অন্তরের সততা থেকে এক স্তব্ধমহান গাম্ভীর্য উৎসারিত হয়ে ছড়িয়ে থাকত তার সারা দেহে। তাকে দেখলেই এক সদাহাস্যময় দেবদূতের কথা মনে পড়ত যে দেবদূত পক্ষবিস্তার করে হাসি ছড়াচ্ছে। তাকে দেখলেই এক অবর্ণনীয় শ্রদ্ধা জাগত সকলের মনে, মনে হত তারা যেন এসে পড়েছে পরম করুণাময় এক মহান ব্যক্তির কাছে যার সর্বাঙ্গ থেকে সতত এক সর্বব্যাপী করুণা ও মমতার মধু ঝরে পড়ছে।
