.
১২
কোনও সেনাপতির অধীনে যেমন অনেক ছোটখাটো অফিসার থাকে তেমনি একজন বিশপের অধীনেও অনেক ছোট ছোট যাজক থাকে। প্রত্যেক বিশপের অধীনে চার্চে একজন করে লোক থাকে যারা তাঁর ফাইফরমাশ খাটে। এইভাবে তারা বিশপের কাজকর্ম করে তাঁর মন জয় করতে পারলে তাদের পদোন্নতি ঘটে।
সেকালে প্রতিটি চার্চ এক একটি রাষ্ট্রের মতো ছিল। চার্চের বিশপরা যেমন ধর্মীয় কাজকর্ম করে যেতেন তেমনি শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিশপের চারদিকে ভিড় করে রাজনীতির কথাবার্তা বলত, তারা দেশের ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে যোগসূত্র বজায় রেখে চলত। ছোটখাটো যাজকরাও আপন আপন পদোন্নতির চেষ্টা করত। বিশপরাও প্রায় সকলেই উচ্চাভিলাষী ছিলেন এবং আপন আপন উচ্চাভিলাষ পূরণের চেষ্টা করে যেতেন। একজন বিশপ ভালো কাজ দেখিয়ে বিশপ থেকে আর্চবিশপ ও পরে কার্ডিনাল হতে পারতেন। এইভাবে সেকালে একজন যাজক ভবিষ্যতে রাজা পর্যন্ত হতে পারতেন। এইভাবে প্রতিটি বড় চার্চে ছোট-বড় যাজকদের মধ্যে উচ্চাভিলাষ আর দিবাস্বপ্নের স্রোত বয়ে যেত।
কিন্তু মঁসিয়ে বিয়েনভেনুর মনে উচ্চাভিলাষের কোনও আগুন জ্বলত না। তিনি ছিলেন শান্ত, বি মিতব্যয়ী। গরিবানার মধ্য দিয়ে তিনি তার জীবনযাত্রা নির্বাহ করতেন। তাঁর চার্চে রাজনীতি বা কূটনীতির কোনও আলোচনা বা জল্পনা-কল্পনা চলত না। তার ফাইফরমাশ খাটা বা হুকুম তামিল করার জন্য কোনও লোক ছিল না। বিশপের মনটি ছিল যেন এক শান্ত সাজানো সুন্দর বাগান। সে বাগান তার সারা জীবনব্যাপী যে এক স্নিগ্ধ ছায়া বিস্তার করেছিল সে ছায়ায় ভবিষ্যতের কোনও গোলাপি স্বপ্নের কোনও আলো দেখা যেত না। কোনও উচ্চাভিলাষের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে ওঠার কোনও সুযোগ পেত না সে বাগান। তাঁর অধীনে যেসব যাজক কাজ করত তারাও তাদের পদোন্নতি ঘটিয়ে কোনও উচ্চাশা পূরণের সুযোগ পেত না। আর তার জন্য কোনও যুবকবয়সী যাজক বেশিদিন থাকতে চাইত না তার কাছে। চার্চে কোনও বিশপের অত্যধিক আত্মনিগ্রহ এবং দারিদ্র্যসুলভ জীবনযাত্রা অন্য যাজকদের মধ্যে সংক্রামিত হয় সমাজে। তাদের ভোগবৃত্তিগুলো অবদমিত ও কঠিন হয়ে পড়ে ক্রমশ, এই ত্যাগ ও তিতিক্ষাকে যাজকরা তাদের উন্নতির পথে বাধা বলে মনে ভাবত। তাই তারা বিশপ বিয়েনভেনুকে ছেড়ে চলে যেত। আমরা এমন এক অদ্ভুত সমাজে বাস করি যেখানে সাফল্যলাভ না উচ্চাভিলাষ পূরণ মানেই দুর্নীতি। দুর্নীতির উচ্চভূমি থেকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যে রস পড়ে, তাই হল এখানে সাফল্য।
প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে সাফল্য মানেই এক কুৎসিত ব্যাপার। মানুষ ভুল করে এটাকে একটা বড় রকমের গুণ বা যোগ্যতা বলে ভাবে। সাধারণ মানুষের জীবনের সাফল্যের প্রভাব ও প্রভুত্ব অসাধারণ। সাফল্য অর্জনের যে ক্ষমতা এক ভণ্ড প্রতিভা ছাড়া আর কিছুই নয়, যে ক্ষমতা বা প্রতিভা আবহমান কাল হতে প্রভুত্ব করে আসছে। মানবসমাজের ওপর, ইতিহাস হল তারই সবচেয়ে বড় শিকার। সাফল্য মানেই রক্তপাতের পথে উচ্চাভিলাষ পূরণ আর এই রক্তপাতের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকেই মানুষ যোগ্যতা ও প্রতিভা বলে এসেছে, বীরত্ব হিসেবে তা খ্যাত হয়ে এসেছে ইতিহাসে। একমাত্র জুভেনাল আর ট্যাসিটাস এই প্রতিভাতে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন না। আজকাল আবার এই সাফল্যের ঘরে এসে এক দরকারি জীবনদর্শন বাসা বেঁধেছে। সাফল্যলাভই তার নীতি। সমৃদ্ধি লাভই হল যোগ্যতা। লটারিতে জিতে যাও, তা হলেই তোমাকে সবাই বলবে চতুর লোক। বলবে যোগ্য আর বুদ্ধিমান। ভাগ্যই হচ্ছে সব; কোনও রকমে একবার সৌভাগ্য লাভ করতে পারলেই তোমাকে বড় বলবে সবাই। এ শতাব্দীতে দেখা যায় সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাভক্তির ব্যাপারটা বড় ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন। গিল্টি করা নকল সোনাকেই তারা আসল সোনা ভাবে। কোনও রকমে পেলেই হল। জনগণ হচ্ছে এক বৃদ্ধ নার্সিসাসের মতো যে শুধু নিজেকেই ভালোবাসে, নিজের আত্মার উপাসনা করে। মোজেস, এসকাইলাস, দান্তে, মিকালাঞ্জেলো অথবা নেপোলিয়ঁনের বিরাট গুণ ও প্রতিভাগুলোকে সাধারণ মানুষ ছোট করে দেখে এবং তারা মনে করে এ গুণ এ প্রতিভা যে কোনও মানুষ চেষ্টা করলেই অর্জন করতে পারে। সাধারণ মানুষ ভাবে, যে কর্মচারী কোনও রকমে ডেপুটির পদ পায়, যে বাজে ব্যর্থ নাট্যকার কোনওরকমে কর্নেলের মতো এক হাসির নাটক লিখে নাম পান, যে সেনাপতি কোনও মতে একটা যুদ্ধ জয় করে, অথবা যে যোদ্ধাপ্রহরী কোনওরকমে হারেম জয় করে বসে তারা সবাই প্রতিভাবান। যে ধুরন্ধর ব্যবসায়ী সৈন্যবিভাগে জুতো সরবরাহ করে বছরে চার হাজার পাউন্ড আয় করে, যে সুদখোর বছরে কোনওরকমে আট মিলিয়ন পাউন্ড আয় করে, যে যাজক জোর গলায় ধর্মপ্রচার করে বিশপ পদে উন্নীত হয়, কোনও এস্টেটের যে গোমস্তা টাকা রোজগার করতে করতে অবসর গ্রহণ করার পর অর্থমন্ত্রী হয় লোকে এদের সবাইকে প্রতিভাবান বলে। লোকে আজকাল কোনও মেয়ে মুখে রঙ মাখলেই তাকে সুন্দরী বলে, আর ভালো দামি পোশাক পরলেই তাকে রাজসম্মান দান করে। কাদার উপরে পাতিহাঁসের নক্ষত্রাকার ছাপ দেখলে লোকে তাকে আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র ভাবে।
.
১৩
দিগনের বিশপের ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচনা করা আমাদের কাজ নয়। তার মতো এক মহান আত্মা শুধু শ্রদ্ধা জাগায় আমাদের মনে। একজন খাড়াখাড়ি লোকের জীবনসত্যকে তার নিজস্ব খাতিরেই মেনে নিতে হবে নির্বিবাদে। বিভিন্ন মানুষের স্বভাবের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানবজীবনের মহত্ত্বের যে একটি নিজস্ব সৌন্দর্য আছে সে সৌন্দর্য সহজ বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে, বরণীয় হয়ে উঠতে পারে।
