আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো মঁসিয়ে বিয়েনভেনুও কোনও এক রাজনৈতিক দলমতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তেন। মাঝে মাঝে অনেক তিক্ততা আর মোহমুক্তির বেদনা অনুভব করতেন। বিশপের মহান আত্মা সব সময় যতসব চিরন্তন ও শাশ্বত আধ্যাত্মিক বিষয়ে নিমগ্ন থাকলেও সমকালীন সমাজজীবনের বিক্ষুব্ধ ঢেউগুলোর আঘাতে একেবারে অবিচলিত থাকতে পারত না। অবশ্য তাঁর মতো লোকের রাজনৈতিক মতামতের সঙ্গে জড়িয়ে না-পড়াই উচিত ছিল। তবে এ বিষয়ে ভুল বুঝলে চলবে না আমাদের। আমরা যেন রাজনৈতিক মতামতের সঙ্গে প্রগতিবাদ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, মানবতাবাদ প্রভৃতি যেসব প্রত্যয় বা বিশ্বাসগুলো সব মনীষী ও মহাপুরুষের সকল চিন্তাশীলতার মূল ভিত্তি সেগুলোকে গুলিয়ে না ফেলি বা এক করে না দেখি। যেসব বিষয়ের সঙ্গে আমাদের এই বইটি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়, শুধু পরোক্ষ বা গৌণভাবে জড়িত সেইসব বিষয়ের গভীরে না গিয়ে আমরা শুধু এই কথাই বলতে পারি যে মঁসিয়ে বিয়েনভেনু রাজতন্ত্রবাদী না হলেই ভালো হত। ধ্যানস্নিগ্ধ প্রশান্ত চিন্তার যে উদার ক্ষেত্রটি জুড়ে সত্য, ন্যায় ও বদান্যতার শাশ্বত নীতিগুলো এক অম্লান অন্তহীন ভাস্বরতায় উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করে সেই মহান ধ্যানসমুন্নতির স্তর থেকে তাঁর দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য বিক্ষুব্ধ মানবজীবনের সমস্যাবলির ওপর নেমে না এলেই আরও ভালো হত তার পক্ষে।
যদিও আমরা স্বীকার করি, ঈশ্বর মঁসিয়ে বিয়েনভেনুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পাঠাননি তবু সম্রাট নেপোলিয়ঁন ক্ষমতার উচ্চ শিখরে আরোহণ করেন তখন তিনি যদি বিপদের ঝুঁকি নিয়েও সম্রাটের বিরোধিতা করে উচ্চ মনের পরিচয় দিতেন তা হলে আমরা তাঁর গুণগান না করে পারতাম না। কিন্তু উদীয়মান কোনও নক্ষত্রের ক্ষেত্রে যা প্রশংসনীয় ও গৌরবময়, সে নক্ষত্র অস্তম্লান হয়ে পড়লে তা আর তেমন প্রশংসনীয় বা গৌরবময় মনে হয় না। যে যুদ্ধ বিপজ্জনক আমরা সেই যুদ্ধকেই শ্রদ্ধা করি এবং সে ক্ষেত্রে যারা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করে যায় তারাই চূড়ান্ত জয়ের গৌরব লাভ করে। যে মানুষ কারও সুখসমৃদ্ধির সময়ে কোনও কথা বলে না তার বিরুদ্ধেই তার দুঃখ-বিপদের সময় কোনও কথা বলা উচিত নয়। সাফল্যের সময়ে যে কাউকে আক্রমণ করতে পারে একমাত্র সে-ই তার পতন ঘটাবার বৈধ অধিকারী। ঈশ্বরের বিধানের কাছে আমরা মাথা নত করে থাকি। ১৮১২ সাল থেকেই যে আইনসভা এতদিন সমর্থন করে আসছিল ১৮১৩ সালে সম্রাটের বিপর্যয়ে উৎসাহিত হয়ে সহসা নীরবতা ভঙ্গ করে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এটা খুবই পরিতাপ আর লজ্জার কথা। এ কাজ কোনওমতেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। ১৮১৪ সালে মার্শালরা বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং সিনেটের অধঃপতন ঘটে। এ যেন এতদিন কাউকে দেবতা বলে মেনে পরে তাকে অপমান করা; পৌত্তলিক হয়ে পুতুল বা প্রতিমার উপর থুতু ফেলার মতো এ এক আশ্চর্য ব্যাপার। ১৮১৬ সালে যখন শেষ বিপর্যয়ের ধ্বনি শোনা যায় আকাশে-বাতাসে, যখন সমস্ত ফ্রান্স তা শুনে ভয়ে কেঁপে উঠতে থাকে, নেপোলিয়ঁনের ওপর ঘনিয়ে ওঠা ওয়াটারলু যুদ্ধের ছায়া দূর থেকে দেখতে পাওয়া যায়, যখন ভাগ্যাহত যে পুরুষের দিকে সেনাদল ও সাধারণ মানুষ বেদনার্ত হৃদয়ে শেষবারের মতো হাত বাড়িয়ে সম্ভাষণ জানায় তখন সে পুরুষ কখনই উপহাসের পাত্র নন। এক বিশাল শূন্যতার মাঝে পতনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এক মহান জাতির সঙ্গে এক মহান পুরুষের যে মিলন ঘটে সেই মিলনের নিবিড়তার মাঝে যে একটি মহৎ ও মর্মস্পর্শী দিক ছিল সে দিকটি না দেখা বা উপেক্ষা করা দিগনের বিশপের মতো একজন মহাত্মা ব্যক্তির পক্ষে ভুল হয়েছে।
এছাড়া বিশপের আর কোনও দোষ ছিল না। তিনি ছিলেন সত্যবাদী, সরলমনা, বুদ্ধিমান, বিনয়ী এবং যোগ্য। তিনি ছিলেন পরোপকারী, সত্যিকারের একজন যাজক, সাধুপ্রকৃতির লোক এবং মানুষের মতো মানুষ। এমনকি তার রাজনৈতিক মতামতের আমরা সমর্থন করতে পারি না, এবং যার জন্য আমরা তার নিন্দা করে থাকি, সেইসব রাজনৈতিক মতামতের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন উদার।
সম্রাট সৈন্যবিভাগের এক ভূতপূর্ব সার্জেন্টকে টাউন হলের কর্মকর্তা নিযুক্ত করেন। লোকটি আগে অস্টারলিজের যুদ্ধে এক বিরাট বাহিনীতে যোগদান করে বীরত্ব দেখিয়ে সম্মানসূচক পদক পায়। কিন্তু সে যখন-তখন এমন সব মন্তব্য করত যেসব মন্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কথা বলে মনে করত লোকে। তার পদক থেকে সম্রাটের মুখটা মুছে গেলে সে আর পদক তিনটে পরত না। সে বলত, আমার বুকের উপর এই তিনটে বিষাক্ত ব্যাঙ চাপিয়ে রাখার থেকে মরা ভালো। নেপোলিয়ঁনের দেওয়া ক্রসটাও সে পরত না। আবার সপ্তদশ লুই সম্বন্ধে কোনও কথা উঠলেও সে বুদ্ধি করে কিছু বলতে পারত না। বরং সে বলত, উনি তো প্রুশিয়া চলে যেতে পারতেন। এর দ্বারা প্রুশিয়া আর ইংল্যান্ডের প্রতি তার ঘৃণার ভাবটাকে প্রকাশ করে। সে এসব কথা প্রায়ই বলত বলে তার চাকরি যায় এবং তার ফলে স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে সে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। বিশপ তখন তাকে ডেকে গির্জার দেখাশোনার ভার দেন।
মঁসিয়ে বিয়েনভেনু ছিলেন একজন সার্থক যাজক, সকল মানুষেরই বন্ধু। দিগনেতে তিনি নয় বছরের যে যাজকজীবন যাপন করেন তাতে তাঁর সরলতা আর শান্ত স্বভাব দেখে সেখানকার জনগণের মনে ভক্তি জাগে তার প্রতি। এমনকি নেপোলিয়ঁনের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাবটাকে লোকে ক্ষমার চোখে দেখতে থাকে। সাধারণ সরলমনা জনগণ তার কাছে ভিড় করত। তারা যেমন তাদের সম্রাটকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করত দেবতার মতো, তেমনি বিশপকেও ভালোবাসত।
