পরদিন মাদাম বুগনল দেখল মেরিয়াস ভালো বেশভূষা করে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে।
মাদাম বুগনল আপন মনে বলে উঠল, এই নিয়ে তিন দিন এইরকম চলছে। সে মেরিয়াসের পিছু পিছু কিছুটা গেল। সে কোথায় যায়, তা সে দেখতে চায়। কিন্তু এত দ্রুত পা ফেলে চলে গেল মেরিয়াস যে তাকে অনুসরণ করা সম্ভব হল না তার পক্ষে। ফলে হাঁপাতে হাঁপাতে বাসায় ফিরে এল সে। সে আবার হাঁপানির রোগী, সে শুধু ভাবতে লাগল, এর মানে কী? এত তাড়াতাড়ি ছুটতে ছুটতে কোথায় যাচ্ছে সে?
মেরিয়াস আবার লুক্সেমবুর্গের বাগানেই গেল। সে দেখল, মেয়েটি তার বাবার সঙ্গে সেইখানেই বসে আছে। মেরিয়াস সেখানে না গিয়ে সে সেই বেঞ্চটাতে আগের মতো বসে রইল। সে একটা বই পড়ার ভান করতে লাগল। চড়ুইপাখির নাচ দেখতে লাগল। তার কেবলি মনে হতে লাগল মেয়েটি তাকে উপহাস করছে।
এইভাবে এক পক্ষকাল কেটে গেল। মেরিয়াস লুক্সেমবুর্গ বাগানে আর পায়চারি করত না। সে সেখানে গিয়ে সেই বেঞ্চটায় বসে থাকত। কিন্তু কেন বসে আছে সে প্রশ্ন সে নিজেকে করত না কখনও এবং প্রতিদিনই সে ভালো পোশাক পরে যেত।
মেয়েটি যে আশ্চর্যজনকভাবে সুন্দরী, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে তার সম্বন্ধে সমালোচনা করলে একটা কথাই মনে হত তার চোখের বিষাদগ্রস্ত দৃষ্টি আর হাসির উজ্জ্বলতার মধ্যে কেমন যেন একটা বৈপরীত্য আছে। এটা হতবুদ্ধি করে দিত মেরিয়াসকে। তার সুন্দর মুখখানা আনন্দদায়ক হলেও রহস্যজনক মনে হত তার।
.
৬.
দ্বিতীয় সপ্তার শেষের দিকে একদিন মেরিয়াস সেই বেঞ্চটায় তার হাঁটুর উপর একটা বই খুলে রেখে বসে ছিল। কিন্তু সে বই-এর একটা পাতাও পড়েনি। সহসা সামনে তাকিয়ে সে শিউরে উঠল। সে দেখল বাপ আর মেয়ে তাদের বেঞ্চ থেকে উঠে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে এবং তার দিকেই আসছে। মেরিয়াস বইটা বন্ধ করে আবার খুলে পড়ার চেষ্টা করল। তার সর্বাঙ্গ কাঁপছিল। সে ভাবতে লাগল ওরা যদি কাছে এসে পড়ে তা হলে সে কী করবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটি এসে পড়বে তার কাছে। তার মনে হল ভদ্রলোক তার দিকে রাগান্বিতভাবে তাকাচ্ছে। সে কি কথা বলবে তার সঙ্গে মেয়েটিও তার দিকে এক বিষাদমেদুর দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। তা দেখে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠল। মনে হল মেয়েটির সে দৃষ্টি ভর্ৎসনা করছে তাকে। সে যেন বলছে, এতদিন তুমি আমার কাছে আসনি, আজ আমি তোমার কাছে এসেছি। তার চোখে আলোছায়ার খেলা দেখে হতবাক হয়ে গেল মেরিয়াস।
তার মনে হল তার মাথার মধ্যে যেন আগুন জ্বলছে। সে অবশেষে তার কাছে এসেছে। এটা ভাবতেই আনন্দের আবেগে শিহরিত হয়ে উঠল সে। মেয়েটিকে আগের থেকে বেশি সুন্দর বলে মনে হল তার। সে সৌন্দর্যের মধ্যে একই সঙ্গে এক নারীতু আর দেবদূতের একটা ভাব ছিল। তার মধ্যে সেই পরিপূর্ণ সৌন্দর্য ছিল যার আবেদন প্রেত্ৰার্ককে গীতিময় আর দান্তেকে নতজানু করে তোলে। সেই সঙ্গে তার জুতোজোড়াটা ময়লা এবং অপরিচ্ছন্ন ছিল বলে তার মনটা দমে গেল। তার মনে হল মেয়েটি তার জুতোটা দেখেছে।
মেরিয়াস মেয়েটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এদিকে মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে তার দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল ধীরে ধীরে। এবার সে বাগানে পাগলের মতো পায়চারি করতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যে সে বাগান ছেড়ে পথে বেরিয়ে গেল। তার মনে হল পথে সে মেয়েটির দেখা পাবে। কিন্তু পথে সে মেয়েটির দেখা না পেয়ে সোজা কুরফেরাকের কাছে চলে গেল। সে তাকে একসঙ্গে খাবার জন্য আহ্বান জানাল। তারা দু জনে এক সঙ্গে শেজ রুশোতে খেল। তাতে ছয় ফ্ৰাঁ লাগল আর ছয় স্যু পরিচারিকাকে উপহার হিসেবে দিল। মেরিয়াস ক্ষুধার্ত মানুষের মতো গোগ্রাসে খেল। তার মাথায় তখন অনেক কথা ভিড় করে আসছিল। সে কুরফেরাককে বলল, আজকের খবরের কাগজটা দেখেছ? অত্রে দ্য পুরাভো একটা ভালো বক্তৃতা দিয়েছে।… সে আকণ্ঠ প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল।
খাওয়ার পর কুরফেরাককে নিয়ে থিয়েটার দেখতে গেল মেরিয়াস। থিয়েটারটার নাম পোর্তে সেন্ট মার্তিন। সে থিয়েটারে তখন রবার্ট ম্যাকেয়ারের আবেগপ্রধান নাটক লা অকার্দে দে আদ্ৰেস্ত অভিনীত হচ্ছিল। নাটক দেখে প্রচুর আনন্দ পেল মেরিয়াস। কিন্তু তার আচরণটা অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। কুরফেরাক যখন একটি দোকানের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, মেয়েটাকে পেলে মন্দ হত না, তখন মেরিয়াস তার দিকে তাকালও না।
কুরফেরাক তাকে পরদিন দুপুরে তার সঙ্গে খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাল। কাফে ভলতেয়ারে তারা দুজনে একসঙ্গে খেল। গত সন্ধ্যার থেকে আরও বেশি খেল মেরিয়াস। একই সঙ্গে তাকে অন্যমনা, আরও আবেগে উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কথায় কথায় সে জোর হাসিতে ফেটে পড়ছিল। কুরফেরাক এক গ্রামের যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলে সে তাকে আবেগে জড়িয়ে ধরল। একদল ছাত্র এসে তাদের কাছে ভিড় করে দাঁড়াল। একথা-সেকথা আলোচনার পর তারা কুইশেরাতের অভিধান রচনায় ভুল ভ্রান্তির কথা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল।
মেরিয়াস একসময় বলল, যাই বল, লিজিয়ন দ্য অনারের ক্রস পাওয়াটা সত্যিই ভাগ্যের কথা।
কুরফেরাক প্রফেয়ারকে বলল, তার পক্ষে এ পুরস্কারটা কিন্তু সত্যিই অদ্ভুত।
