প্রুভেয়ার বলল, না, মোটেই অদ্ভুত নয়। এটা গুরুত্বপূর্ণ। মেরিয়াসের কাছে তখন সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। সে তখন এক প্রবল প্রেমাবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
কোনও নারীর চোখের দৃষ্টি আপাতত মনে হয় এক যান্ত্রিক ব্যাপার এবং নির্দোষ; কিন্তু আসলে তা ভয়ঙ্কর। আমরা প্রতিদিন সে দৃষ্টির সম্মুখীন হই এবং তাকে কোনও গুরুত্ব দিই না। তার অস্তিত্বের কথা মোটেই ভাবি না। আমরা সে দৃষ্টির ফাঁদে ধরা না পড়া পর্যন্ত মোটেই বিচলিত হই না। পরে দেখি এমন এক শক্তির কবলে আমরা পড়ে গিয়েছি, যার থেকে মুক্ত হবার জন্য বৃথাই সগ্রাম করি আমরা। একের পর এক দুঃখের পীড়নে যন্ত্রণায় জর্জরিত হই। আমরা বুঝতে পারি না সেই অজানা অচেনা শক্তি সৌভাগ্যের বা দুর্ভাগ্যের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। বুঝতে পারি না কোনও হীন হিংস্র জন্তু বা কোনও শান্তশ্রী অন্তরের কবলে তা ফেলে দেবে আমাদের; ভেবে পাই না এক অপরিহার্য লজ্জার আঘাতে জর্জরিত ও ক্ষতবিক্ষত হবে অথবা প্রেমের অভিষেকে রূপান্তরিত হয়ে উঠবে আমাদের অন্তর।
.
২.
নিঃসঙ্গতা এবং অনাসক্তি, অভিমান, স্বাধীনতাস্পৃহা, প্রকৃতিপ্রেম, কর্মহীন আলস্য প্রবণতা, জীবনের খাতিরেই জীবনযাপনের ইচ্ছা, নিজের সত্তা বা স্বাতন্ত্র্যরক্ষার জন্য এক গোপন অন্তঃসলিলা সংগ্রাম, সমস্ত সৃষ্ট জীবনের প্রতি শুভেচ্ছার এক আবেগ–এইসব কিছু মেরিয়াসের জীবনে প্রেমের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আসন পেতে বসল। তার পিতার প্রতি অনুরাগ বা আসক্তির অনুভূতিটা ক্ৰমে এক ধর্মানুভূতিতে পরিণত হল এবং সকল ধর্মানুভূতির মতোই তা পশ্চাৎপটে সরে গেল। তার সামনের দিকের শূন্য ভূমিটা পূরণ করার জন্য কিছু একটার দরকার। সে শূন্যতা পূরণের জন্য তার জীবনে যা এল তা হল প্রেম।
একটা মাস কেটে গেল। এই এক মাসের মধ্যে রোজ একবার করে লুক্সেমবুর্গ বাগানে গেল মেরিয়াস। কোনও বাধা মানল না সে। মেয়েটি তাকে দেখছে–একথা মনে করতেই আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠল তার অন্তর।
ক্রমশ তার সাহস বেড়ে যাওয়ায় সে মেয়েটি যে বেঞ্চে বসত তার অনেকটা কাছাকাছি যেত, কিন্তু তাদের সামনে যেত না। কিছুটা লজ্জাবশত এবং কিছুটা প্রেমিকসুলভ সাধারণ সতর্কতাবশত সে মেয়েটির বাবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইত। সে তাই মেকিয়াভেলিসুলভ চাতুর্যের সঙ্গে যথাসম্ভব গাছপালা আর বাগানের মূর্তিগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকত এমনভাবে যাতে মেয়েটি তাকে ভালোভাবে দেখতে পায় অথচ তার বাবা তাকে কম দেখতে পায়। এক একসময় সে লুনিদাস অথবা স্পার্টাকাসের মর্মরমূর্তির আড়ালে প্রায় পুরো আধঘণ্টা একটা বই খুলে দাঁড়িয়ে থাকত আর মাঝে মাঝে মেয়েটির দিকে তাকাত আর মেয়েটিও তার দিকে মাথাটা ঘুরিয়ে ঠোঁটে ক্ষীণ একফালি হাসি নিয়ে তার পানে তাকাত মাঝে মাঝে। সে যখন শান্তভাবে তার বাবার সঙ্গে কথা বলত, সে তখন তার কুমারী হৃদয়ের এক তপ্ত আবেগের সঙ্গে মেরিয়াসের দিকে তাকাত আর তার কথা ভাবত। সৃষ্টির আদিকাল থেকে ইভ বা নারীদের অন্তরে যে কামনার কুঁড়িটি সুপ্ত হয়ে থাকে সে কুঁড়িটি ফুল হয়ে ফুটে উঠত তার দৃষ্টিতে। তার ঠোঁট দুটি যখন তার বাবার সঙ্গে কথা বলত, তার দু চোখের দৃষ্টি কথা বলত অন্য একজনের সঙ্গে।
কিন্তু মঁসিয়ে লেবলাঁ অর্থাৎ মেয়েটির বাবার মনে সন্দেহ জাগল। সে তাই মেরিয়াস বাগানে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্চ থেকে উঠে পায়চারি করত। মেরিয়াস ও তার মেয়ের মধ্যে মাঝে মাঝে যে দৃষ্টি বিনিময় হত সে বিষয়ে কিছুটা সন্দেহ জেগেছিল তার। সে তাই মাঝে মাঝে বেঞ্চটা পাল্টে অন্য বেঞ্চে গিয়ে বসত তার মেয়েকে নিয়ে। দেখত মেরিয়াস তাদের কাছে যায় কি না। মেরিয়াস কিন্তু এই সন্দেহের কথাটা বুঝতে পারেনি। এরপর মঁসিয়ে লেবলাঁ নিয়মিত আসা বন্ধ করল এবং যেদিন আসত তার মেয়েকে সঙ্গে আনত না।
মেরিয়াস কিন্তু এইসব ঘটনার কিছুই ভাবত না। প্রথম প্রথম সে সদাসতর্ক হয়ে থাকত, ক্রমে সে আবেগে অন্ধ হয়ে উঠল। তার প্রেমাবেগ ক্রমশই বেড়ে যেতে লাগল। সে রাত্রিতেও মেয়েটির স্বপ্ন দেখত। তার ওপর একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা তার প্রজ্বলিত প্রেমাবেগের আগুনে তেল ঢেলে যেন তাকে ইন্ধন জুগিয়ে দিল। তার সামনে কুয়াশা ঘেরা চিন্তার রাশ তাকে যেন আরও অন্ধ করে দিল। একদিন মেরিয়াস দেখল যে বেঞ্চটায় মেয়েটি তার বাবার সঙ্গে বসেছিল তারা উঠে চলে গেলে তার উপর একটা রুমাল পড়ে আছে। রুমালটা সাদা এবং তাতে কোনও সূচিশিল্পের কারুকার্য ছিল না; শুধু তার উপর ইউ আর এফ এই দুটো অক্ষর লেখা ছিল। রুমালটা থেকে একটা সুগন্ধ বার হচ্ছিল। তখনও পর্যন্ত মেরিয়াস মেয়েটির নাম-ধাম কিছুই জানত না। সে ‘ইউ’ অক্ষরটা দেখে ভাবল মেয়েটির নাম নিশ্চয় আরসুলা। কী সুন্দর নাম! সে রুমালটা চুম্বন করল, তার গন্ধ শুকল। রুমালটা সে তার বুকের কাছে রেখে দিত আর রাত্রিতে বালিশের তলায় রেখে দিত। সে যখন বাগানে যেত তখন রুমালটা সঙ্গে নিয়ে যেত।
আসলে কিন্তু রুমালটা ছিল মেয়েটির বাবার এবং সেটা তার পকেট থেকে একসময় পড়ে যায়।
কিন্তু মেরিয়াস তা জানতে না পারায় ভাবত সেটা মেয়েটির রুমাল এবং সে তাই বাগানে গিয়ে রুমালটা তার বুকের উপর জড়িয়ে ধরত। মেয়েটি কিন্তু এর কোনও মানে বুঝতে পারত না। ফলে তার মুখে-চোখে কোনও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করত না। মেরিয়াস আপন মনে বলত, কী সমবোধ!
