কুরফেরাক পরে তার বন্ধুদের বলেছিল, মেরিয়াসকে নতুন পোশাক পরে কোথায় যেতে দেখলাম। মনে হল পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে।
লুক্সেমবুর্গ বাগানে যাওয়ার পর প্রথমে বাগানের পুকুরটার চারদিকে একবার ঘুরল। পুকুরে চরতে থাকা হাঁসগুলোর পানে একবার তাকাল। তার পর একটা ভগ্ন প্রস্তরমূর্তিকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখল। সে দেখল একজন ভদ্রলোক পাঁচ বছরের একটি ছেলেকে হাত ধরে নিয়ে যেতে যেতে তাকে উপদেশ দিচ্ছে, কখনও চরম পন্থা অবলম্বন করবে না। স্বৈরাচার আর স্বেচ্ছাচার–দুটোকেই সব সময় এড়িয়ে চলবে।
পুকুরটার চারদিকে আর একবার ঘোরার পর ধীর পায়ে অনিচ্ছার সঙ্গে বাগানের সেই বেঞ্চটার পানে এগিয়ে যেতে লাগল মেরিয়াস। একই সঙ্গে সে যাবার একটা আকর্ষণ আর বিকর্ষণ অনুভব করছিল। একই সঙ্গে কে তাকে যেন টানছিল এবং কে যেন তাকে বাধা দিচ্ছিল। একই সঙ্গে সেখানে যেতে আসক্তি আর বিক্তি বোধ করছিল। সে ধীর পায়ে এমনভাবে যেতে লাগল যাতে মনে হচ্ছিল সে রোজ সেখানে যায় বলেই আজও যাচ্ছে।
সেই পক্ককেশ বৃদ্ধ তার মেয়েকে নিয়ে সেই বেঞ্চটায় আগের মতোই বসেছিল। আজ ভালো পোশাক পরে থাকার জন্য একটা গর্ববোধ করছিল মেরিয়াস। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল হ্যাঁনিবল যেন রোম জয় করতে চলেছে। এছাড়া মোটামুটি সে শান্ত এবং সরল ছিল। অন্যদিনকার মতোই সে অন্য সব চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পাঠ্যবই-এর কথা ভাবছিল, সেই সঙ্গে সঙ্গে রেসিনের ট্র্যাজেডি আর মলিয়ারের কমেডির কথা ভাবছিল। এমন সময় একটা গানের শব্দ তার কানে গেল। সে তার পোশাকটা ঠিক করে নিয়ে এগিয়ে গেল বেঞ্চের দিকে। বেঞ্চের কিছুটা দূর থেকেই সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। তার পরই হঠাৎ সে পেছন ফিরে উল্টোদিকে হাঁটতে লাগল। মেয়েটি তার দিকে তাকায়নি, তাকে নতুন পোশাকে কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে, তা সে দেখেনি। তবু একবার পেছন থেকে কেউ দেখছে কি না তা সে পেছনে ফিরে দেখল।
হাঁটতে হাঁটতে বাগানটার এক প্রান্তে চলে গেল মেরিয়াস। তার পর আবার সেই বেঞ্চটার কাছে এসে পড়ল। তার মনে হল মেয়েটি এবার তাকে দেখছে। কিন্তু সে জোর করে খাড়া হয়ে ডাইনে-বায়ে কোনও দিকে না তাকিয়ে সোজা হাঁটতে লাগল। বেঞ্চটার কাছ দিয়ে যাবার সময় তার অন্তরটা ভারী হয়ে উঠছিল। তার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল। মেয়েটির পরনে ছিল সেই সিল্কের পোশাক, মাথায় সেই টুপি। মেয়েটির মিষ্টি কথার সুরটা তার কানে আসছিল। সে তার বাবার সঙ্গে মিষ্টি সুরে কথা বলছিল শান্তভাবে। সে দেখতে সত্যিই অপূর্ব সুন্দরী। মেরিয়াস সেটা বুঝতে পারল, কিন্তু সে ভালো করে তাকিয়ে দেখল না। সে ভাবতে লাগল, মেয়েটি যদি জানতে পারে মার্কো ওরেগন দ্য লা বোস্তার ওপর সে বইটা বেরিয়েছে এবং যেটা ফ্ৰাসোয়া দ্য লোফশ্যাতো নিজের লেখা বই হিসেবে চালাচ্ছে সে বই-এর সে-ই রচয়িতা, তা হলে হয়তো সে তাকে শ্রদ্ধা করবে।
মেরিয়াস আবার বেঞ্চের কাছে গেল। মেয়েটির কাছে এসে এবার সত্যিই বিচলিত হল। সে আবার বেঞ্চ আর মেয়েটির কাছ থেকে দূরে চলে গেল। যাবার সময় যখন সে ভাবল মেয়েটি তাকে পেছন থেকে দেখছে তখন সে শিউরে উঠল।
এবার সে এমন একটা কাজ করল যা সে আগে কখনও করেনি। সে আর মেয়েটির কাছে না গিয়ে কিছুটা দূরে অন্য একটা বেঞ্চে বসে মাঝে মাঝে তাদের পানে আড়চোখে তাকাতে লাগল। তার কেবলি মনে হতে লাগল সে ভদ্রলোক এমনিতেই ভালো পোশাক পরে এবং তার পোশাকের যে প্রশংসা করত সে কখনও তার এই নতুন পোশাকের জৌলুস দেখে মুগ্ধ হবে না।
এবার সে উঠে বেঞ্চটার দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এইভাবে পনেরো মাস কেটে যাবার পর হঠাৎ সেদিন মনে হল মেরিয়াসের, মেয়েটির সঙ্গে যে ভদ্রলোক আসে তার চোখে তার আচরণ হয়তো ভালো লাগেনি। তার আরও মনে হল ভদ্রলোককে মঁসিয়ে লেবলাঁ নামে অভিহিত করা তার প্রতি অশ্রদ্ধারই পরিচায়ক।
সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে রওনা হল সে। সেদিন রাত্রের খাওয়া খেতে ভুলে গেল। যখন তার খাওয়ার কথা মনে পড়ল তখন আর সময় নেই। র্যু সেন্ট জ্যাক রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। সে রাতে একটুকরো রুটি চিবিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ল সে। বিছানায় শুতে যাবার আগে সে তার জামাটা ঝেড়ে এবং পায়জামাটা যত্নের সঙ্গে ভাঁজ করে রেখে দিল।
.
৫.
পরদিন গর্বোর সেই বাড়িতে মাদাম বুগনল নামে যে বৃদ্ধা মেরিয়াসের ঘর পরিষ্কার ও দেখাশোনা করত, সে দেখল মেরিয়াস আবার তার ভালো পোশাক পরে বেরিয়ে গেছে। দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল সে।
সেদিনও বিকালে লুক্সেমবুর্গ বাগানে গেল মেরিয়াস। মেয়েটি তার বাবার সঙ্গে যে বেঞ্চে বসত সেখানে গেল। সে আগের দিন একা যে বেঞ্চটায় বসেছিল সেই বেঞ্চটাতেই বসল। বাগানের গেট বন্ধ হবার সময় পর্যন্ত বসে রইল। তার পর বেরিয়ে গেল। যাবার সময় দেখে গেল ভদ্রলোক তার মেয়েকে নিয়ে তখনও বসে আছে। হয়তো র্যু লা কোয়েস্ট-এর দিকের গেটটা দিয়ে তারা বেরিয়ে যাবে।
সেদিনও সে তার রাতের খাওয়া খেয়েছিল কি না, তা তার মনে নেই।
