তার চোখের দিকে কখনও তাকায়নি মেরিয়াস। তার মনে হত চোখের ঘন পাতাগুলো দিয়ে তার চোখের তারাগুলো ঢাকা আছে। তার চোখের তারা না দেখলেও তার হাসিটা ছিল বড় সুন্দর। তার বাবার কথা শুনে সে যখন হাসত তখন তার সে হাসি দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত মেরিয়াস।
মেরিয়াসের প্রথমে মনে হয়েছিল এ মেয়ে আগের দেখা সেই মেয়েটি নয়, হয়তো তার বোন। এত তাড়াতাড়ি অর্থাৎ মাত্র ছ মাসের মধ্যে এতখানি বেড়ে উঠবে, তা সে ভাবতেই পারেনি। কিন্তু পরে খুঁটিয়ে দেখল, না, এ হল সেই মেয়েটি। সে শুধু মাথায় বেড়ে ওঠেনি, তার চেহারাটা একেবারে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। যেন কোনও কুঁড়ি রাতারাতি পূর্ণ বিকশিত ফুলে পরিণত হয়েছে, যেন গতকালকার একটি বালিকা আজ হঠাৎ পূর্ণ যুবতীতে পরিণত হয়ে আমাদের মন ভুলিয়ে দিচ্ছে। এমনিই হয়। বসন্তের সামান্য দু-তিনটি দিন পাতাঝরা একটা শুকনো গাছকে কচি কিশলয়ে ভরে দিতে পারে, কেবল দুটি মাসের ব্যবধান মেয়েটির গোটা গা-টাকে ভরে দিয়েছে নবোদ্ভিন্ন যৌবনের সুষমায়। মেয়েটির যৌবন এসে গেছে।
তার পোশাক দেখে মেরিয়াস বুঝল সে এখন আর স্কুলে পড়ে না। তবে তার হাতের দস্তানা আর পায়ের চটি দেখে বোঝা যায় তার হাত আর পাগুলো ছোট ছোট। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে হয় নবযৌবনসমৃদ্ধ দেহ থেকে একটা সুগন্ধ বার হচ্ছে।
লোকটির অবশ্য কোনও পরিবর্তন হয়নি।
মেরিয়াস যখন সেদিন পর পর দু বার তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল তখন চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। মেরিয়াস এতক্ষণে দেখল তার চোখ দুটো যেমন নীল তেমনি তার দৃষ্টি ছিল গভীর। কিন্তু মেয়েটি এমন উদ্দাম দৃষ্টিতে তাকাল যাতে মনে হল সে একটা গাছের তলায় খেলতে থাকা এক শিশুকে দেখছে। মেরিয়াসও চিন্তান্বিতভাবে তাদের সামনে দিয়ে কয়েকবার যাওয়া-আসা করল। কিন্তু মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকাল না একবারও।
এরপর মেরিয়াস লুক্সেমবুর্গের সেই বাগানটায় যথারীতি যেত এবং সেই পিতা ও কন্যাকে বেঞ্চের উপর আগের মতোই বসে থাকতে দেখত। কিন্তু তাদের প্রতি কোনও মনোযোগ দিত না সে। আগে সে যখন দেখতে খারাপ ছিল তখন যেমন তার প্রতি তার কোনও আগ্রহ ছিল না তেমনি আজ তার যৌবনসৌন্দর্য বা দেহলাবণ্যের প্রতিও তার কোনও আগ্রহ নেই। অভ্যাসের বশেই সে রোজ একবার করে যেত সেদিকে।
.
৩.
সেদিনটা ছিল বেশ উজ্জ্বল আর তপ্ত। লুক্সেমবুর্গের বাগানে চলছিল আলোছায়ার খেলা। আকাশটা পরিষ্কার, যেন সকালে কোনও দেবদূত সেটাকে ঝকঝকে করে মেজে দিয়েছে। বাদামগাছে চড়ইপাখিগুলো কিচমিচ শব্দ করছিল। তখন কোনও বিশেষ চিন্তা ছিল না মেরিয়াসের মনে। মেরিয়াস তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। সহসা মেয়েটি তার মুখপানে তাকাল। মেরিয়াসও তার মুখপানে তাকাল। দু জনের চোখের দৃষ্টি মিলিত হল।
তার সে দৃষ্টিতে কী কথা ছিল মেরিয়াস তা বলতে পারল না। হয়তো কোনও কথাই ছিল না অথবা অনেক কথা ছিল। তবে দু জনের দৃষ্টির মাধ্যমে একটা স্ফুলিঙ্গ খেলে গেল।
মেয়েটি একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল। মেরিয়াস তার পথে চলে গেল। সে বুঝল আজ তার চোখে যে দৃষ্টি দেখেছে তা কোনও বালিকাসুলভ নিরীহ নিষ্কাম দৃষ্টি নয়। সে দৃষ্টির মধ্য দিয়ে আজ যেন তার মনের গভীরের একটি রুদ্ধ দরজা খুলে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়। সব মেয়েরই চোখে একদিন না একদিন এই ধরনের এক দৃষ্টির ফুল ফুটে ওঠে।
এইভাবে যে মেয়ে প্রথম তাকায় এবং তার দৃষ্টির মধ্যে তার আত্মার এক অকথিত বাণী ফুটে ওঠে যার অর্থ সে নিজেই জানে না, তার সে দৃষ্টি এমনই এক নবোদিত সূর্যরশ্মির মতো, যা একই সঙ্গে আলোছায়ার এক জটিল দ্বন্দ্বে আকীর্ণ। সেই অপ্রত্যাশিত দৃষ্টির ভয়ঙ্কর সুন্দর আবেদনটিকে ভাষায় ঠিক প্রকাশ করা যায় না। সহসা নারীত্বে উপনীত এক তরুণী তার সেই দৃষ্টির মোহমেদুর আবেদনের মধ্য দিয়ে নিরীহ নির্দোষ হাতে যে ফাঁদ পাতে তাতে একটি হৃদয় ধরা পড়ে যায়, অথচ সে নিজেই জানে না, কেন সে এ ফাঁদ পাতল। কিন্তু যার জন্য এই দৃষ্টির ফাঁদ পাতা হয় সে কিন্তু কিন্তু খুব গভীরভাবে বিচলিত হয় না এ দৃষ্টির দ্বারা। কিন্তু এ দৃষ্টির মধ্যে একই সঙ্গে বর্তমানের এক নিরাবেগ নিস্পৃহতার সঙ্গে ভবিষ্যতের এক প্রেমাবেগ থাকে লুকিয়ে। এ দৃষ্টির মধ্যে এক পবিত্রতার সঙ্গে প্রাণাবেগ কেন্দ্রীভূত হয়ে তাকে এমনই করে তোলে, যা কোনও চটুল প্রেমাভিনয়পটীয়সী নায়িকার দৃষ্টির থেকে অনেক বেশি শক্তিশালিনী এবং যা অন্য একটি অন্তরে এমন এক ফলগাছের চারা রোপণ করে, যা একই সঙ্গে সুগন্ধ ও বিষের ভারে অবনত এবং যার নাম প্রেম।
সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই প্রথমে তার পোশাকের কথাটা চিন্তা করতে লাগল মেরিয়াস। জীবনে আজ এই প্রথম সচেতন হল সে তার পোশাকের প্রতি। সে একটা নির্বোধ বলেই তোবড়ানো টুপি, ময়লা পায়জামা আর ছেঁড়া জ্যাকেট পরে লুক্সেমবুর্গের বাগানে গিয়েছিল।
.
৪.
পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে মেরিয়াস সম্পূর্ণ নতুন একপ্রস্থ পোশাক পরে লুক্সেমবুর্গ বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। নতুন জামা, নতুন পায়জামা, নতুন জুতো আর নতুন টুপি। সবশেষে হাতে তার দস্তানা ছিল, যা তার কখনও থাকে না। পথে কুরফেরাককে দেখতে পেল সে। কিন্তু সে দেখেও দেখল না।
