১.
ইতোমধ্যে এক সুদর্শন যুবকে পরিণত হয়েছে মেরিয়াস। তার মাথায় ঘন কালো চুল, উঁচু চওড়া কপাল, তার মুখের ভাব দেখে বোঝা যায় সে বুদ্ধিমান, উচ্চমনা এবং কুশলী। তাকে দেখলেই মনে হয় সে জাতিতে ফরাসি, কিন্তু তার শান্ত স্বভাবটা জার্মানদের মতো। সে তখন তার যৌবন-জীবনের এমন একটা স্তরে এসে পড়েছিল যখন যুবকদের চিন্তার জগৎটা গভীরতা আর নির্দোষিতা এই দুই-এর মধ্যে বিভক্ত হয়ে থাকে। কোনও সংকটজনক অবস্থায় পড়লে অনেক সময় সে বোকার মতো আচরণ করত ঠিক, কিন্তু কোনও জরুরি অবস্থায় পড়লে সে যথেষ্ট মানসিক শক্তির পরিচয় দিতে পারত। তার আচরণ ছিল শান্তশীতল, সৌজন্যমূলক, ধীর স্থির এবং সব রকমের হঠকারিতা থেকে মুক্ত। কিন্তু তার মুখখানা সুন্দর এবং ঠোঁট দুটো লাল আর দাঁতগুলো ঝকঝকে হওয়ার জন্য সে যখন হাসত তখন তার অন্তরের শুচিতা আর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এক তপ্ত আবেগের একটা বৈপরীত্য প্রকট হয়ে উঠত।
তার চরম দারিদ্র্যের সময়ে তার পাশ দিয়ে কোনও মেয়েকে যেতে দেখলে সে তাকে এড়িয়ে যেত, তার কাছ থেকে দূরে সরে যেত। তার মনে হত মেয়েটা তার দীনহীন পোশাক দেখে তাকে উপহাস করছে। কিন্তু আসল কথা হল মেয়েটি তার সুন্দর মুখ দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তার এই ভুল ধারণা তাকে আরও লাজুক করে তুলঁত। সে মেয়েদের কাছ থেকে দূরে পালিয়ে যেত বলে কোনও মেয়ের সঙ্গে কোনওদিন ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেনি সে। ফলে সে একবোরে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করত।
কুরফেরাক তাকে প্রায়ই বলত, আমার একটা কথা শোন ছোকরা। শুধু বইয়ের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে থেকো না। মেয়েদের একটা সুযোগ দাও। তাতে তোমার অনেক উপকার হবে। তুমি যেভাবে লজ্জায় লাল হয়ে তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাও তাতে তুমি ভবিষ্যতে একজন যাজক হয়ে উঠবে।
কুরফেরাক তাকে ঠাট্টা করে তাই ‘মঁসিয়ে আব্বে’ বলে ডাকত।
কুরফেরাকের কাছ থেকে এক কথা শোনার পর আগের থেকে আরও বেশি করে সব মেয়েদের এড়িয়ে চলত, এমনকি সে কুরফেরাককেও এড়িয়ে চলত।
মেয়েদের মধ্যে মাত্র দু জনকে এড়িয়ে যেত না মেরিয়াস। তারা হল একজন বৃদ্ধা যে তার ঘর পরিষ্কার করত, যাকে মেয়ে বলে ভাবতেই পারত না। আর একটি হল এক বালিকা যাকে সে প্রায়ই দেখত, কিন্তু ভালো করে তাকে কখনও দেখত না।
গত এক বছর হতে মেরিয়াস লুক্সেমবুর্গ বাগানের একধারে একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে একটি বালিকাকে প্রায়ই দেখত। তারা বাগানের নির্জন দিকটায় পাশাপাশি বসে থাকত। মেরিয়াস তখন ভাবতে ভাবতে প্রায়ই চলে যেত সেদিকটায়। সেদিকে গিয়ে পড়লেই সে তাদের দেখতে পেত। লোকটার বয়স ষাট বছর হলেও তার চেহারাটা বলিষ্ঠ, মুখখানা গম্ভীর। তাকে দেখে মনে হত সে একদিন সৈনিক ছিল। সে সব সময় একটা নীল পায়জামা আর নীল টেলকোট আর একটা চওড়া টুপি পরত। তার মাথার চুলগুলো ছিল একেবারে সাদা।
একটা বেঞ্চের উপর সেই লোকটির পাশে তেরো-চৌদ্দ বছরের একটি মেয়ে বসে থাকত। মেয়েটির চোখদুটো সুন্দর হলেও তার দেহটা ছিল রোগা এবং চর্মসার। তার পোশাকটা ছিল কনভেন্টের মেয়েদের মতো। তাদের দেখে মনে হত তারা হল বাপ আর মেয়ে। মেরিয়াস তাদের দেখত। বাপ খুব বেশি বৃদ্ধ হয়নি আর মেয়েটি তখনও যুবতী হয়ে ওঠেনি। তাই সে মেয়েটিকে এড়িয়ে চলার কোনও কারণ দেখতে পেত না। তারাও মেরিয়াসকে ভালো করে লক্ষ করত না। তারা দু জনের শান্তভাবে বসে থাকত। মেয়েটি আনন্দের সঙ্গে উচ্ছলভাবে কথা বলত আর তার বাবা পিতৃসুলভ স্নেহের সঙ্গে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে অল্প কথায় তার উত্তর দিত।
মেরিয়াস তাদের সামনে দিয়ে পায়চারি করতে করতে যাওয়া-আসা করত। কিন্তু কোনওদিন কোনও কথা বলেনি তাদের সঙ্গে। সেদিকে ছাত্ররাও মাঝে মাঝে গিয়ে পড়ত। কুরফেরাকও তাদের দেখেছিল। কিন্তু মেয়েটির মধ্যে কোনও সৌন্দর্য না দেখে আকৃষ্ট হয়নি তার প্রতি। কুরফেরাক তাদের একটা করে নাম বার করেছিল। সে মেয়েটিকে বলত ম্যাদময়জেল লানয়ের আর লোকটিকে বলত মঁসিয়ে লেবলাঁ। এই নাম দুটোই ছাত্রদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে যায়।
মেরিয়াস রোজই একটা নির্দিষ্ট সময়ে সেই জায়গায় দেখত তাদের। লোকটির চোখের দৃষ্টিটা তার ভালো লাগত। কিন্তু মেয়েটির প্রতি কোনও আগ্রহ ছিল না তার।
.
২.
এক বছর এইভাবে কেটে যাবার পর দ্বিতীয় বছরে মেরিয়াস সেদিকে যাওয়া বন্ধ করেছিল। সে প্রায় ছ মাস আর বাগানের সেদিকে যায়নি। তার পর গ্রীষ্মের কোনও এক আলোকোজ্জ্বল সকালে বাগানের সেদিকটায় হঠাৎ গিয়ে পড়ল। তখন পাখি ডাকছিল বাগানে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নীল উজ্জ্বল আকাশটাকে দেখা যাচ্ছিল।
বাগানের সেদিকটায় গিয়েই সে দেখতে পেল সেই বেঞ্চের উপর তারা বসে রয়েছে। দেখল বাপের চেহারাটা তেমনিই আছে। কিন্তু মেয়ের চেহারাটা একেবারে বদলে গেছে। মেয়েটি লম্বা এবং এক সুন্দরী যুবতীতে পরিণত হয়ে উঠেছে, কিন্তু তার মধ্যে সেই শিশুসুলভ সরলতাটা তখনও রয়ে গেছে। তার মাথায় বাদামি চুলের গুচ্ছ সোনার মতো চকচক করছিল, কপালটা মর্মরপ্রস্তরের মতো মসৃণ, গাল দুটো গোলাপের পাপড়ির মতো সুন্দর, মোলায়েম গায়ের ত্বক, তার সুন্দর মুখের হাসিটা সূর্যালোকের মতো ছিল উজ্জ্বল। তার মাথাটা রাফায়েলের নির্মিত ভার্জিনের মূর্তির উপর স্থাপন করতে পারতেন এবং গুজ তার ভেনাসের মূর্তির উপর স্থাপন করতে পারতেন। তার খাড়া নাকটা খুব একটা সুন্দর না হলেও সেটা ছিল সূক্ষ্ম এবং সংবেদনশীল। তাতে চিত্রকরেরা কোনও শিল্পের উপাদান খুঁজে না পেলেও কবিদের কাছে সেটা ছিল আনন্দের বস্তু। মেয়েটির বয়স তখন পনেরো।
