মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ ভাবলেন, যেহেতু মেরিয়াস একজন আইনের ছাত্র, সে-ও নিশ্চয় এ বিতর্কে যোগদান করবে। তার মতে এই ধরনের ব্যাপার নিয়ে ছাত্রদের আলোচনা ও বিতর্ক করার কোনও অধিকারই নেই।
এমন সময় ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ থিওদুলকে সঙ্গে করে এনে ঘরের দরজার কাছে দিয়ে গেল। তার বাবাকে বলে গেল, থিওদুল এসে গেছে।
যাবার সময় থিওদুলকে চাপা গলায় বলে গেল, উনি যা বলবেন তা যেন সমর্থন কর।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ থিওদুলকে বললেন, তা হলে তুমি এসে গেছ। বসো। কথাটা বলেই তিনি চেয়ার থেকে উঠে ঘরের মধ্যে অশান্তভাবে পায়চারি করতে লাগলেন। আর মাঝে মাঝে ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে হাতঘড়ি বার করে দেখতে লাগলেন। পায়চারি করতে করতে আপন মনে বলে যেতে লাগলেন, গাল টিপলে নাক টিপলে দুধ বেরোয় এই ধরনের একজন যুবক প্লেস দ্য প্যান্থিয়নে আবার সভা করবে। দেশের অবস্থাটা হল কী? অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী মানে কী? মানে যত সব আজেবাজে লোকের হাতে বন্দুক দেওয়া হয়েছে। তার মানে আমি জোর গলায় শপথ করে বলতে পারি যত সব জ্যাকোবিনপন্থী আর প্রজাতন্ত্রী –যত সব পলাতক আসামি আর জেল থেকে ছাড়া পাওয়া কয়েদি।
থিওদুল বলল, আপনি ঠিক বলেছেন।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তার দিকে একবার তাকালেন। তার পর আবার বলে যেতে লাগলেন। সেই হতভাগা পাজি ছোকরাটার এতদূর স্পর্ধা যে সে বিপ্লবীদের দলে যোগ দিয়েছে। সে আমার বাড়ি কেন ছেড়ে গেছে? তার কারণ সে প্রজাতন্ত্রী হতে চায়। কিন্তু
জনগণ তাদের প্রজাতন্ত্র চায় না। তাদের এটুকু বোঝার ক্ষমতা আছে রাজা ছিল, রাজতন্ত্র। ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে আর জনগণ জনগণই থাকবে। তারা এইসব নির্বোধ যুবকদের প্রজাতন্ত্রকে হেসে উড়িয়ে দেবে। এই যুবকদের মুখে থুতু দেবে আজকের জনসাধারণ। এই উনিশ শতক হচ্ছে বিষাক্ত যুগ। এ যুগের যুবকরা তাদের বাবা-মা ছেড়ে বাড়ি থেকে চলে এসে মুখে ছাগলের দাড়ি গজিয়ে ভাবে তারাই দেশের সব। এটা যদি প্রজাতন্ত্র হয় তা হলে এটা রোমান্টিসিজম্। আর রোমান্টিসিজম্ মানেই পাগলামি।
থিওদুল আবার বলল, আপনি ঠিক বলেছেন।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বলতে লাগলেন আবার, মিউজিয়ামের উঠোনে কামানই-বা রাখে কেন? তার কারণ কী বলতে পার? তারা কি অ্যাপোলো বা ভেনাসের মূর্তিগুলোকে কামান দিয়ে উড়িয়ে দিতে চায়? আজকের সব যুবক বেনজামিন কনস্ট্যান্টের মতোই অপদার্থ। তাদের বেশভূষা ও পোশাক-আশাকের মধ্যে কোনও পারিপাট্য নেই। তারা নারীবিমুখ, লাজুক, তারা যেভাবে মেয়েদের কাছ থেকে পালিয়ে যায় তা দেখে মেয়েরা হাসিতে ফেটে পড়ে। তারা ভালোবাসাকে ভয় পায়। তারা মূর্খ। তাদের পোশাকের মতোই তাদের কথাগুলোও অমার্জিত। তারা বলে তাদের আবার রাজনৈতিক মতবাদ। আছে। তারা আবার নতুন তত্ত্ব ও পদ্ধতি আবিষ্কার করে সমাজকে নতুন করে গড়ে তুলঁতে চায়। রাজতন্ত্র আর আইনের অনুশাসনের উচ্ছেদ চায়। বাইরের সব জিনিসকে। ভেতরে আর ভেতরের সব জিনিসকে বাইরে এনে পৃথিবীর সব কিছু ওলটপালট করে দিতে চায়। হায় মেরিয়াস, মেরিয়াস, সেই হতভাগ্য যুবক আবার প্রকাশ্য সভায় আলোচনা করবে! চরম বিশৃঙ্খলা আজ ছেলেমানুষিতে পরিণত হয়েছে। স্কুলের কতকগুলি ছেলে কিনা জাতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবে। আবার ফ্রান্সেই এইসব যুবকের জন্ম হয়েছে। ঠিক আছে হে যুবকবৃন্দ, তোমরা তর্ক করে যাও। এইসব খবরের কাগজগুলো যতদিন থাকবে ততদিন এইসব ব্যাপার চলতে থাকবে। এর দাম মাত্র এক স্য, কিন্তু এই কাগজ মানুষের সব বুদ্ধি লোপ পাইয়ে দেয়। বাঃ, বেশ ছোকরা, মাতামহকে হতাশায় ডুবিয়ে দিয়ে বেশ গর্ব অনুভব করছ।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ একটু চুপ করতেই থিওদুল বলে উঠল, একমাত্র মন্ত্রিউল ছাড়া সব খবরের কাগজ নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত। সৈন্যদের তালিকাগ্রন্থ ছাড়া সব বই নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ আবার বলে যেতে লাগলেন, যে সায়েস তার বাচ্চাকে হত্যা করে সে আবার পরে সিনেটর হয়। এদের নীতিই হল এই। ওরা প্রথমে সবাইকে নাগরিক বলে, পরে বলে মঁসিয়ে। একদিন যারা খুনি ছিল তারা আজ পেটমোটা কাউন্ট হয়েছে। সায়েস আবার দার্শনিক! আমি এই দার্শনিকদের ভাঁড়ের মতো জ্ঞান করি। আমি কয়েকজন সিনেটরকে দেখেছি। তাদের দেখে আমার মনে হয়েছে বাঘের চামড়াপরা বাঁদর। তারা কোয়ে মালাকোয়ের পথ দিয়ে যাচ্ছিল। নীল মখমলের পোশাক পরা সেইসব সিনেটর! সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। হে নাগরিকবৃন্দ, আমি তোমাদের বলে দিচ্ছি, তোমরা যাকে প্রগতি বলছ তা হল উন্মত্ততা, তোমাদের মানবতা হচ্ছে স্বপ্ন, তোমাদের বিপ্লব হচ্ছে অপরাধ, তোমাদের প্রজাতন্ত্র হল একটা রাক্ষস, তোমাদের যুবতী কুমারী ফ্রান্স এক বেশ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসেছে। তোমরা জননেতা, অর্থনীতিবিদ, আইনপ্রণেতা, সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতার উদ্গাতা, যা-ই হও না কেন, গিলোটিনের ক্ষুর ছাড়া আর কিছুই নও। এই হল আমার বক্তব্য।
লেফটন্যান্ট থিওদুল বলল, চমৎকার! আপনার প্রতিটি কথাই সত্যি।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ ঘুরে দাঁড়িয়ে থিওদুলের মুখপানে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, তুমি একটা আস্ত বোকা।
৩.৬ এক সুদর্শন যুবক
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
