কিছু অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার যারা অতীতে একদিন তার বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে তারা তার পরিচয় পেয়ে তাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। তাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানায় তাকে। তাদের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেনি মেরিয়াস। কারণ তাদের বাড়িতে গেলে তার বাবার কথা আরও অনেক জানতে পারবে সে। সেসব বাড়িতে নাচগানও হত। এইসব ক্ষেত্রে সে ভালো পোশাক পরে যেত এবং সে যেত রাত্রিকালে। তার পায়ের জুতোজোড়া চকচকে পালিশ করা থাকত।
১৮৩০ সালের বিপ্লবের ফলে মেরিয়াসের রাজনৈতিক মতবাদ এবং উত্তপ্ত আবেগ উদ্যম সব উবে যায়। সে শান্ত হয়ে ওঠে অনেকখানি। সেই একই যুবক, কিন্তু তার মধ্যে আর কোনও উত্তাপ নেই। তার রাজনৈতিক মত একটা আছে, কিন্তু সেটাতে আর সে জোর দেয় না। আসলে সে কোনও রাজনৈতিক দলের সমর্থক নয়, শুধু কিছু কিছু সহানুভূতি আছে মাত্র। আসলে সে মানবতাবাদী। আবার সমস্ত মানবজাতির মধ্যে ফরাসি জাতিকে শ্রদ্ধা করে। আবার ফরাসি জাতির মধ্যে জনসাধারণকে সে ভালোবাসে বেশি। আর সাধারণ জনগণের মধ্যে নারীদের প্রতি তার মমতা ও সহানুভূতি বেশি। সে ঘটনার থেকে বই পছন্দ করে বেশি এবং বীর যোদ্ধাদের থেকে কবিদের শ্রদ্ধা করে বেশি। এই কারণে ম্যারেঙ্গোর যুদ্ধজয়ের ঘটনার থেকে ‘জন’ গ্রন্থখানি সে বেশি ভালোবাসে। কোনওদিন চিন্তামগ্ন হয়ে কাটাবার পর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সে যখন গাছের ফাঁক দিয়ে অনন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে অজানা নক্ষত্রের আলো আর এক রহস্যময় অন্ধকারের খেলা দেখেছে তখন তার মনে হয়েছে সেসব বস্তুর সঙ্গে মানুষের কোনও সম্পর্ক নেই, সেইসব বস্তুর কোনও গুরুত্ব নেই। তার মনে হত সে মানবজীবন এবং জীবনদর্শনের গভীরে প্রবেশ করেছে, অথচ আকাশ ছাড়া আর কোনও কিছুর দিকে তাকাচ্ছে না।
তবু তার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে অনেক রকম পরিকল্পনা করত মেরিয়াস। সে কাজের থেকে স্বপ্ন দেখত বেশি। এই সময় কেউ তার অন্তরের দিকে তাকালে তার শুচিতায় মুগ্ধ হয়ে যেত। আমরা যদি কোনও মানুষের অন্তর বিচার করতে চাই তা হলে তার চিন্তা-ভাবনার থেকে তার স্বপ্নকে অবলম্বন করেই সে বিচার করা ভালো। স্বপ্নের মধ্যেই মানুষের স্বরূপটা খুব ভালো করে ধরা পড়ে। সব চিন্তার মধ্যেই ইচ্ছার একটা উপাদান থাকে, কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে সে উপাদান থাকে না। স্বপ্নের মধ্যে আমাদের কল্পনা যখন ইচ্ছামতো অবাধে উড়ে চলে তখন আমাদের অচিন্তিত অসংযত উদ্দাম উচ্চাভিলাষগুলো আত্মার গম্ভীর হতে উঠে আসে। নিয়মিত সব পরিহাসকে ব্যর্থ করে দিয়ে তারা এক স্বকীয় ঐশ্বর্যে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। স্বপ্নের মধ্যে আমরা আমাদের এক অজানিত অসম্ভব পরিণতির কল্পনা করে থাকি আর এই কল্পনার মধ্যেই আমাদের স্বরূপটি প্রতিভাত হয়ে ওঠে এক আশ্চর্য সাদৃশ্যময়তায়।
১৮৩১ সালের মাঝামাঝি যে বৃদ্ধা মেরিয়াসের ফাইফরমাস খাটত তার বাসায় সে একদিন তাকে বলল, তার পাশের ঘরের এক ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
মেরিয়াস বাড়ির অন্য ভাড়াটেদের কোনও খোঁজখবর রাখত না। সে তবু জিজ্ঞাসা করল, কেন তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে?
বৃদ্ধা বলল, কারণ তাদের বাড়িভাড়া অনেক বাকি পড়েছে। দুই কোয়ার্টারের ভাড়া বাকি পড়েছে।
মেরিয়াস বলল, মোট কত টাকা বাকি আছে?
কুড়ি ফ্রাঁ।
একটা ড্রয়ারের মধ্যে মেরিয়াসের তিরিশ ফ্র জমানো ছিল। সে তার থেকে পঁচিশ ফ্ৰাঁ বার করে বৃদ্ধার হাতে দিয়ে বলল, এর থেকে কুড়ি ফ্ৰাঁ ভাড়া দেবে আর পাঁচ ফ্রাঁ ওদের দেবে। ওরা বড় গরিব। কিন্তু আমি টাকাটা দিয়েছি সে কথা বলবে না।
.
৬.
ঘটনাক্রমে থিওদুল যে সেনাবাহিনীতে কাজ করত সে বাহিনী প্যারিসে স্থানান্তরিত হল। এর ফলে এক নতুন মতলব খেলে গেল ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদের মাথায়। তার প্রথমদিকটা হল থিওদুলকে দিয়ে সে মেরিয়াসের খোঁজ করাবে। মেরিয়াস এখন কোথায় আছে, কী করছে সে বিষয়ে খোঁজখবর নেয়াবে থিওদুলকে দিয়ে। তার দ্বিতীয় মতলব হল মেরিয়াসের পরিবর্তে থিওদুলকে তাদের বিষয়সম্পত্তির ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী হিসেবে তাদের বাড়িতে রাখবে।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ যদি একজন যুবকের মুখ দেখতে পেলেই ক্লান্ত হন তা হলে মেরিয়াস আর থিওদুলের মধ্যে তফাত কী? তাছাড়া তার ভাইপো’র ছেলে মেয়ের ছেলের থেকে রক্তের দিক থেকে নিকটতম সম্পর্ক। এক উকিলের মতোই একজন সামরিক অফিসার গ্রহণীয়।
একদিন সকালবেলায় মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ যখন তাঁর ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন তখন তার মেয়ে ঘরে ঢুকে নরম সুরে বলল, বাবা, আজ সকালে থিওদুল তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছে।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ অন্যমনস্কভাবে বললেন, কে থিওদুল?
তোমার ভাইপো’র ছেলে।
আহা!
বৃদ্ধ গিলেনৰ্মাদ আবার কাগজ পড়ায় মন দিলেন। কাগজটা রাজতন্ত্রবাদী হলেও তাতে এমন একটা খবর ছিল যেটা পড়ে রাগে জ্বলে যাচ্ছিলেন মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ। সে খবরে প্রকাশ হয় সেদিন বেলা দুটোর সময় প্লেস দ্য প্যান্থিয়নে আইন ও ডাক্তারি ছাত্ররা সমবেত হয়ে প্রকাশ্যে একটা বিষয় আলোচনা করবে। বিষয়টা ছিল এই যে, লুভারের মিউজিয়াম প্রাঙ্গণে যেসব কামান ও অস্ত্রশস্ত্র রাখা হয়েছে তার বৈধতা নিয়ে সরকারের যুদ্ধদপ্তর আর অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে যে বিরোধের উদ্ভব হয়েছে, সে বিরোধের ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।
