মঁসিয়ে মেবুফে’র বাড়ি দেখাশোনার কাজ করত যে বৃদ্ধা মহিলা সে-ও খুবই নিরীহ প্রকৃতির ছিল। সে ছিল চিরকুমারী এবং নিষ্ঠা ও শুচিতার সঙ্গে তার কৌমার্যব্রত পালন করে। একটা বিড়াল ছাড়া তার জীবনের সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না। বাড়ি থেকে কোথাও যেত না সে। তার একমাত্র শখ ছিল লিনেনের কিছু পোশাক কেনা এবং সন্ধের দিকে একবার করে পোশাকগুলো বাক্স থেকে বার করে বিছানার উপর ছড়িয়ে রাখা। সে পোশাকগুলো সে কখনও ব্যবহার করত না। সে-ও কিছু পড়াশুনো করত। মঁসিয়ে মেবুফ তাকে ঠাট্টা করে বলত, মেরে প্লুতার্ক।
মেরিয়াসের প্রতি একটা আসক্তি গড়ে উঠেছিল মঁসিয়ে মেবুফে’র, কারণ মেরিয়াস বয়সে যুবক হলেও শান্ত প্রকৃতির ছিল এবং তার সাহচর্যের উত্তাপ তার ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্যানুরাগের ওপর হস্তক্ষেপ করত না বা আঘাত হানত না কোনওভাবে। কোনও বৃদ্ধের কাছে কোনও শান্ত প্রকৃতির যুবকের সাহচর্য বায়ুতরঙ্গহীন শান্ত অচঞ্চল সূর্যালোকের মতোই উপভোগ্য। মেরিয়াস যখন দেশের সামরিক ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করে যে সব বড় বড় যুদ্ধে তার বাবা অংশ গ্রহণ করেছে এবং আহত হয়েছে সেইসব যুদ্ধের কথা পড়ত তখন সে মাঝে মাঝে মঁসিয়ে মেবুফে’র কাছে যেত। মেবুফ তখন শান্ত কণ্ঠে বড় বড় বীরপুরুষদের কথা এমনভাবে বলত যাতে মনে হত সেই বীরেরা যেন একগুচ্ছ ফুল।
কিন্তু ১৮২০ সালে মঁসিয়ে মেবুফে’র ভাই কুরে হঠাৎ মারা গেলে অন্ধকারে ডুবে গেল মেবুফ। যে অ্যাটর্নির কাছে তাদের মূলধন ছিল এবং যে মূলধন থেকে তারা দুই ভাইয়ে বছরে দশ হাজার ফ্রাঁ করে পেত সেই অ্যাটর্নি দেউলিয়া হয়ে পড়লে তাদের সে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায় একেবারে। তার ওপর জুলাই বিপ্লবের ফলে বইয়ের ব্যবসা বিরাটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মঁসিয়ে তার যে বই বিক্রি করে বছরে দু হাজার ফ্রাঁ করে পেত সে বই বিক্রিও বন্ধ হয়ে যায়। দরজায় ঘন্টা বাজার শব্দ শুনেই ভয়ে চমকে উঠত মেবুফ। মেরে পুর্ক তখন তাকে বলত, জলবাহক মঁসিয়ে।
খরচ কমাবার জন্য মঁসিয়ে চার-কামরার বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে বুলভার্দ মঁতপার্নেসি অঞ্চলে একটা ছোট বাড়িতে উঠে যায়। কিন্তু মাস তিনেকের মধ্যেই সে আবার সে বাড়ি থেকে উঠে যায়। কারণ সে বাড়ির ভাড়া বছরে তিনশো ফ্রাঁ করে। কিন্তু মঁসিয়ে মেবুফে’র ক্ষমতা ছিল মাত্র দুশো ফ্রাঁ দেবার। তাছাড়া বাড়িটার কাছে বন্দুক শেখার একটা গ্যালারি ছিল, যেখান থেকে প্রায়ই বন্দুকের গুলির আওয়াজ আসত।
এপর অস্টারলিস গ্রামে সানপেত্রিয়ের অঞ্চলে একটা ছোট বাড়িতে উঠে গেল। সে বাড়িতেও তিনখানা কামরা ছিল এবং একটা ছোট বাগান ছিল। যেদিন সেই বাড়িতে উঠে যায় মেবুফ সেদিন সে নিজের হাতে তার ঘরে ছবিগুলো টাঙায় এবং বাগানে কাজ করতে থাকে। সে তার বেশির ভাগ আসবাবপত্র বিক্রি করে দেয়।
এই নতুন বাসায় মাত্র দু জন লোক দেখা করতে আসে তার সঙ্গে। তার মধ্যে একজন। হল সেই সেন্ট জ্যাক অঞ্চলের পুস্তকবিক্রেতা আর একজন হল মেরিয়াস। মেরিয়াসের নামটার মধ্যে একটা সামরিক গন্ধ থাকায় নামটা মোটেই ভালো লাগত না মেবুফে’র।
সাধারণত যারা জ্ঞানী অথবা নির্বোধ তারা কেউ দৈনন্দিন জীবনের কোনও ঘাত-প্রতিঘাত কখনও মানে না, ভাগ্যের খেলায় অর্থাৎ সৌভাগ্যে বা দুর্ভাগ্যে বিচলিত হয় না। তারা দেহগত অবক্ষয় বা অসুস্থতার মতোই লাভ-ক্ষতিতে উদাসীন থাকে।
এইভাবে দিনের পর দিন মেবুফে’র চারদিকে যতই ছায়া ঘনিয়ে উঠতে লাগল ততই সব আশা বিলীন হয়ে যেতে লাগল একে একে। কিন্তু সমস্ত বিপর্যয়ের মধ্যেও শিশুসুলভ অথচ এক গভীর ঔদাসীন্যসহকারে প্রশান্ত রয়ে গেল সে। তার আত্মার গতি অব্যাহত রয়ে গেল।
মাঝে মাঝে খুবই সহজ সরল ঘটনা থেকে বিনা খরচে আনন্দ পেত। একদিন মেরে প্লুতার্ক যখন একটা বই পড়ছিল তখন মঁসিয়ে তা শুনছিল। শুনতে শুনতে প্লুতার্ক দুটো শব্দ ভুল বলায় মেবুফ তার ভুল ধরিয়ে দিয়ে বলল, শব্দ দুটো হল বৃদ্ধ আর ড্রাগন।
তার পর সে বলতে লাগল, এই গল্পে এক ড্রাগনের কথা আছে যে ড্রাগন একটা গুহাতে বাস করত। সেই গুহা থেকে সে এমন আগুন ছড়াত যে সেই আগুনের আঁচে আকাশটা পর্যন্ত জ্বলে যায়, কতকগুলি নক্ষত্রও জ্বলে ওঠে। সেই ড্রাগনের আবার বাঘের মতো থাবা ছিল। বৃদ্ধ সাহসের সঙ্গে সেই গুহায় গিয়ে ড্রাগনের স্বভাবটাকে পাল্টে দেয়। তুমি ভালো বই-ই পড়ছ। এর থেকে ভালো রূপকথা আর হতে পারে না।
এক মধুর আত্মচিন্তার মধ্যে ডুবে গেল মঁসিয়ে মেবুফ।
.
৫.
এই সরল প্রকৃতির মানুষটিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত মেরিয়াস। সে দেখল এই ভালো লোকটি নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে ক্রমশই তলিয়ে যাচ্ছে। দিনে দিনে অবস্থার জটিলতা বেড়ে গেলেও কোনও ভয় নেই মেবুফে’র। মেরিয়াস শুধু মাঝে মাঝে কুরফেরাক আর মেবুফে’র কাছে যেত। তবে মাসে দু-তিনবারের বেশি নয়। অপেক্ষাকৃত নির্জন পথ দিয়ে দীর্ঘক্ষণ একটানা হেঁটে যেতে ভালো লাগত তার।
এমনি করে বড় রাস্তা দিয়ে বেড়াতে বেড়াতেই একদিন গর্বে অঞ্চলের সেই ব্যারাকবাড়িটাকে দেখতে পায় মেরিয়াস। বাড়িটার কম ভাড়া আর নির্জনতা দেখে পছন্দ হয়ে যায় তার। সেই বাড়িটার মধ্যেই একটা ঘর ভাড়া নেয় সে। সেখানকার লোকেরা তাকে মঁসিয়ে মেরিয়াস বলত।
