মেরিয়াস তখন এই পথেই যেতে লাগল। সে এখন চিন্তার দিকে বেশি ঝুঁকল। যখন দেখল তার একট জীবিকার সংস্থান হয়ে গেছে তখন বুঝল চিন্তায় বেশি সময় সে দিতে পারবে। এক একবার সারাদিন ধরে সে দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকত। জীবনের সব সমস্যা সে এইভাবে সমাধান করল। পার্থিব বিষয়ে সে কম কাজ করে অপার্থিব বিষয়ে সে বেশি সময় কাটাবেই। তার মানে কয়েক ঘণ্টা বাস্তব কাজকর্ম করে বাকি সময়টা অনন্তের কথা চিন্তা করবে। দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিস আয়ত্ত করতে পারায় সে যেন অলস হয়ে পড়ছিল। মেরিয়াসের মতো উদ্যমশীল যুবকদের ক্ষেত্রে এমনিই হয়। কিন্তু জীবনের কোনও অপরিহার্য জটিলতার আঘাতে তাদের সাময়িক অলস কর্মহীন অবস্থাটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
তার মাতামহ ভেবেছিল সে উকিল হওয়ার পর কোর্টে ওকালতি করবে। কিন্তু তা সে করল না। দিবাস্বপ্ন ওকালতির প্রতি একটা অনীহা ও বিতৃষ্ণা এনে দিয়েছিল তার মধ্যে। অ্যাটর্নিদের সঙ্গে মেলামেশা, মামলার পেছনে ছুটে চলা অসম্ভব এবং একটা ঘৃণার ব্যাপার হয়ে উঠল তার কাছে। সে তার বর্তমান জীবনের কাঠামোকে বদলাবার কোনও কারণ খুঁজে পেল না। সে আগের মতোই প্রকাশকদের লেখালেখির কাজ করে যেতে লাগল এবং তাতেই তার খাওয়া-পরার প্রয়োজন মিটে যেতে লাগল।
মঁসিয়ে ম্যাগিমেল নামে এক পুস্তকবিক্রেতা ও প্রকাশক তাকে একটা স্থায়ী কাজ দিতে রাজি হল। এই কাজের জন্য সে মেরিয়াসকে একটা থাকার জায়গা, আর বছরে পনেরোশো ফ্রাঁ মাইনে দিতে চাইল। চাকরিটা আকর্ষণীয় হলেও তাতে তার স্বাধীনতা থাকবে না। সে বেতনভোগী দাসে পরিণত হবে। মেরিয়াস চায় একই সঙ্গে ভালো এবং খারাপ হতে। সে চায় ছোটখাটো কিছু স্বাচ্ছন্দ্য আর আরাম। কিন্তু মান-মর্যাদার দিকে তার কোনও আকাঙ্ক্ষা নেই। সে একটা চোখ হারিয়ে মাত্র একটা চোখ নিয়ে থাকতে চাইল। সে নতুন পাওয়া চাকরিটাকে প্রত্যাখ্যান করল।
তার জীবনটা রয়ে গেল নিঃসঙ্গ। সে যেমন কোনও বিষয়ে নিজেকে জড়াতে চাইল না, তেমনি এঁজোলরাসের দলেও যোগদান করতে চাইল না। অবশ্য তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা রয়ে গেল। দরকার পড়লে একে অন্যকে সাহায্য করত, এই পর্যন্ত। মেরিয়াসের মাত্র দু জন বন্ধু ছিল। একজন যুবক আর একজন বৃদ্ধ। একজন হল যুবক কুরফেরাক আর একজন হল মঁসিয়ে মেবুফ, চার্চের কর্মচারী। তবে মঁসিয়ে মেবুফে’র প্রতি তার আসক্তিই ছিল বেশি। মেবুফে’র জন্যই তার জীবনে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। মেবুফ তার চোখ খুলে দিয়েছে।
কিন্তু মঁসিয়ে মেবুফ যা কিছু করেছে সচেতনভাবে করেনি। ভাগ্যের বিধানের এক যন্ত্র হিসেবে করেছে। মেরিয়াসের অন্তরের মধ্যে যে আলোড়ন চলছিল, যে রূপান্তর এসেছিল সে বিষয়ে সে কিছুই জানত না। সে এ বিষয়ে কিছুই বুঝত না।
.
৪.
মেবুফ মেরিয়াসকে বলত, সব মানুষেরই একটা করে রাজনৈতিক মতামত থাকে। এটাতে ক্ষতি নেই। মেবুফের কাছে সব রাজনৈতিক মতামত সমান লাগত। অবসর সময়ে সে গাছপালা আর বই নিয়ে থাকত। তার কোনও রাজনৈতিক মতবাদ ছিল না। সে রাজতন্ত্রী বা বোনাপার্টপন্থী কোনও পন্থীই ছিল না।
সে বুঝতে পারত না পৃথিবীতে এত ঘাস, শ্যাওলা, কাঁটাগাছ ও গাছপালা থাকতে মানুষ কেন সনদ, গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সাধারণতন্ত্র প্রভৃতি এত সব নিয়ে মাথা ঘামায়। অবসর সময়ে বইও সংগ্রহ করে বেড়ায়। কর্নেল পঁতমার্সি বাগানে ফুলের চাষ করত বলে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় মেবুফে’র। সে চার্চে উপাসনাসভায় যোগ দিত তার কর্তব্যের খাতিরে, ভক্তির নিবিড়তার সঙ্গে নয়। চার্চে সমবেত মানুষের মুখগুলো দেখতে ভালো লাগত তার। কিন্তু তাদের গোলমাল ভালো লাগত না। সমাজের মানুষ হিসেবে, দেশের নাগরিক হিসেবে কিছু একটা তাকে করতে হবে এইজন্যই সে চার্চের কাজে যোগদান করে। কোনও নারীর প্রতি কোনও আসক্তি ছিল না তার। তার বয়স ষাট পেরিয়ে গেলে একজন জিজ্ঞাসা করে তাকে, আপনি কি কখনও বিয়ে করেননি?
মেবুফ তাকে উত্তর করে, না, বিয়ে করতে ভুলে গিয়েছি।
তবে কেন সে বিয়ে করেনি, একথা বুঝিয়ে বলতে গিয়ে সে বলত, আমি যদি ধনী হতাম তা হলে হয়তো বিয়ে করার কথাটা ভেবে দেখতাম। কিন্তু ধনী হবার কথাটা মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের মতো কোনও ধনীকে দেখে অথবা কোনও সুন্দরী মেয়েকে দেখে জাগেনি তার মনে। একথা জেগেছে কোনও আকাক্ষিত দামি বই কিনতে না পেরে।
সে এমন একটা বাড়িতে বাস করত যে বাড়িতে লোক বলতে বাড়ি দেখাশোনার জন্য এক বৃদ্ধা ছাড়া আর কেউ থাকত না। সে একটা বই প্রকাশ করেছিল। বইটা সুচিন্তিতভাবে লেখা। সে নিজেই বিক্রি করত। দিনে দু-তিনখানা করে সে বই বিক্রি হত এবং তাতে বছরে দু হাজার ফ্রাঁ পেত। এটা তার মোট আয়ের বড় একটা অংশ ছিল। কয়েক বছরের চেষ্টা আর আত্মনিগ্রহের ফলে বিভিন্ন রকমের বেশ কিছু বই সে সংগ্রহ করেছিল। সে বাড়ি থেকে বড় একটা বার হত না। কিন্তু যখনি বার হত একটা বই থাকত তার বগলে। যে বাড়িটাতে সে থাকত তার সংলগ্ন একটা ছোট বাগান ছিল এবং তাতে চারখানা কামরা ছিল। তাতে শুধু বই আর ভালো শিল্পীদের আঁকা কিছু ছবি ছিল। তার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে শুধু এক ভাই ছিল। সে ছিল একটা ছোট গির্জার যাজক। মাথায় পাকা চুল, মুখে দাঁত ছিল না। সে খুব শান্ত মেজাজের লোক ছিল। তার মুখে কোনও শক্ত বা তিক্ত কথা উচ্চারিত হত না। তাকে এক বৃদ্ধ ভেড়ার মতো শান্ত দেখাত সব সময়। এ ছাড়া কোনও বন্ধু বা আত্মীয় ছিল না তার। কারও বাড়ি যাবার ছিল না। শুধু পোর্তে সেন্ট জ্যাক অঞ্চলে রয়ল নামে এক পুস্তকবিক্রেতার কাছে মাঝে মাঝে যেত সে। পায়ে তার বাত ছিল। ঘুমোবার সময় কম্বলের তলায় শক্ত হয়ে উঠত পাগুলো। কোনও তরবারি বা বন্দুক দেখার সঙ্গে সঙ্গে হিম হয়ে উঠত তার গায়ের রক্ত।
