তাঁর মেয়ে ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদের অন্তরটা এমনই অগভীর ছিল যে তাতে কোনও গভীর স্নেহ-ভালোবাসা স্থান পেত না। মেরিয়াসের স্মৃতিটা ক্রমশই অস্পষ্ট ও ছায়াচ্ছন্ন হয়ে উঠল তার মনে। যেন একটা পোষা বিড়াল পালিয়ে গেছে।
বৃদ্ধ মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের দুঃখ আরও বেড়ে যাবার কারণ এই যে তিনি সে দুঃখের কথা বাইরে প্রকাশ করতেন না কারও কাছে। যে চুল্লি থেকে ধোঁয়া বার হয় না সেই চুল্লির মতো সব দুঃখের বাম্প নিজের মধ্যে আত্মসাৎ করে নিতে হত তাকে। মাঝে মাঝে কখনও তার কোনও পরিচিত ব্যক্তি তাকে যদি জিজ্ঞাসা করত, তোমার নাতি আজকাল কী করছে?’ তখন তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষাদময়তার সঙ্গে উত্তর দিতেন, ব্যারন পঁতমার্সি আজকাল নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়ে তুলঁছে।
এদিকে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের বুকটা যখন দুঃখে জ্বলে যাচ্ছিল, মেরিয়াস তখন নিজে সব বিপদ থেকে একে একে মুক্ত করে তুলঁতে পারার জন্য একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করে অভিনন্দন জানাচ্ছিল নিজেকে। আজ আর তার মনে কোনও তিক্ততা নেই তার মাতামহের প্রতি। তবে একটা বিষয়ে মনস্থির করে ফেলেছে সে, তার যে মাতামহ তার বাবার সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করে, তার কোনও সাহায্য বা দান আর সে নেবে না। বর্তমানে জীবনে সে যত দুঃখ-কষ্ট পায় তখনই সে একদিক দিয়ে একটা আত্মতৃপ্তি লাভ করে, তার কেবলি মনে হয় এই শাস্তি এই অভিশাপের যোগ্য সে এবং এর একটা প্রয়োজন ছিল তার। আজ এই শাস্তি ভোগ না করলে তার পরবর্তী জীবনে কখনও না কখনও এই শাস্তি ভোগ করতেই হত। তা না হলে তার বাবার প্রতি এক নিষ্ঠুর ঔদাসীন্য দেখিয়ে সে যে অপরাধ করেছে, সে অপরাধ স্খলন হত না। তার বাবা জীবনে একা যে দুঃখের বোঝা বহন করেছে, তার কিছুটা দুঃখ ভোগ তার করা উচিত। তাছাড়া তার বাবার দুঃখের তুলঁনায় কতটুকু দুঃখই-বা সে ভোগ করছে। তার বাবা যেমন শত্রুপক্ষের কামান ও গোলাগুলির সামনে সাহসের সঙ্গে বুক পেতে দিয়েছিল তেমনি আজ সে যদি অনুরূপ সাহসের সঙ্গে সমস্ত দুঃখ-দারিদ্র্য বুক পেতে সহ্য করতে পারত, একমাত্র তা হলে সে তার বাবার আদর্শের সার্থক উত্তরাধিকারী হয়ে উঠতে পারবে। তার বাবা তার শেষ চিঠিতে এই জন্যই লিখে গেছে, সে এই উপাধির যোগ্য হয়ে উঠবে। চিঠিখানি নষ্ট হয়ে গেলেও চিঠির এই কথাটা চিরদিন মনে রেখে দেবে সে।
তার মাতামহ যখন তাকে তাড়িয়ে দেয় বাড়ি থেকে তখন বয়সে সে ছিল তরুণ যুবক। এখন সে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হয়ে উঠেছে। দারিদ্র অভিশাপের পরিবর্তে আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে তার জীবনে। যৌবনে দারিদ্র্যকে যদি সংযত রাখা যায় তা হলে সে দারিদ্র্য মানুষের ইচ্ছাশক্তিতে সগ্রাম আর তার আত্মাকে আশার মধ্যে কেন্দ্রীভূত করে রাখে। বাস্তব জীবনের স্বরূপকে উদ্ঘাটিত করে এই দারিদ্র্য আদর্শ জীবনের প্রতি এক অনির্বচনীয় আকাক্ষা জাগায় মানুষের মধ্যে। ধনী যুবকরা হাতের কাছে ভোগের অনেক উপকরণ পায়–ঘোড়া, শিকার, জুয়া, ভালো খাবার, তামাক প্রভৃতি মাদকদ্রব্য। এইসব ভোগ উপভোগের ফলে তাদের মনটা নিচের দিকে যায়, উদার মানসিকতা ও সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা তাদের স্বভাবের মধ্যে পাওয়া যাবে না। গরিব যুবকরা বাঁচার জন্য সংগ্রাম করে, খাওয়া-থাকার জন্য লড়াই করে এবং স্বপ্নই তার একমাত্র সান্তনা। তার আমোদ-প্রমোদের উপকরণ কেবল কোনও কৃত্রিম রঙ্গমঞ্চে থাকে না, তা থাকে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে। আকাশ, নক্ষত্র, ফুল, শিশু প্রভৃতির মধ্যে ঈশ্বরপ্রদত্ত আমোদর উপাদান থরে থরে সাজানো থাকে তার জন্য। এমনকি তার জীবনসংগ্রামের মধ্যেও সে আনন্দ পায় এক ধরনের। সে সাধারণ মানুষের এত কাছে থাকে যে মানবতার আত্মাকে সে দেখতে পায়, ঈশ্বরের সৃষ্টির এত কাছে থাকে যে সেই সৃষ্টির মধ্যেই ঈশ্বরকে দেখে। সে তার আপন মহত্ত্বকে আপনি অনুভব করে। অপরের করুণার ওপর তাকে নির্ভর করতে হয় বলে সব রকম আত্মম্ভরিতা হতে মুক্ত হয় সে। ফলে এক নিরহঙ্কার আত্মবিস্মৃতি আর পরদুঃখকাতরতা–এই প্রশংসনীয় গুণ দুটির জন্ম হয় তার মধ্যে। প্রকৃতির মধ্যে যেসব অজস্র আনন্দের বস্তু ছড়িয়ে আছে, মুক্ত মন নিয়ে সেই বস্তু উপভোগ করে আত্মার দিক থেকে নিজেকে সম্পদশালী মনে করে, এবং অর্থের দিক থেকে যারা সম্পদশালী তাদের জন্য দুঃখবোধ করে। সব ঘৃণা দূরীভূত হয়ে যায় তার মন থেকে। সত্যি সত্যিই কি সে সুখী? একজন বলিষ্ঠ যুবক যে কালো চুল, সাদা ঝকঝকে দাঁত, সজীব উজ্জ্বল গাল আর দেহের শিরায় শিরায় প্রবাহিত উত্তপ্ত রক্তস্রোত নিয়ে আনন্দোচ্ছল ভঙ্গিতে লম্বা লম্বা পা ফেলে হেঁটে যায়, সে এক বৃদ্ধ সম্রাটের ঈর্ষার বস্তু। তার পর সে যুবক যখন রোজ সকালে উঠে জীবিকার জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে যায় তখন তার হাত দুটো কাজে ব্যস্ত থাকলেও তার মেরুদণ্ডটা গর্বে খাড়া হয়ে ওঠে এবং তার মনটা এক নতুন ভাবধারায় উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। সারাদিনের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে এসে আনন্দের সঙ্গে চিন্তা করে। দুঃখ-কষ্টে ও হতাশার কাটাবন ও কাদাজলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে পারে, কিন্তু তার মনটা থাকে আকাশের নক্ষত্রের দিকে। তার মন থাকে শান্তস্থির, সদাসচেতন, অল্পে-সতুষ্ট, পরোপকারী। সে তাদের এই স্বাধীনতা, এই দানের জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেয়।
