সবচেয়ে দুঃসময়টা সে পার হয়ে এসেছে। তার সামনে যে পথটা রয়েছে সে পথ অনেক মসৃণ ও মোলায়েম মনে হচ্ছে আগের তুলঁনায়। সাহস, সংকল্প আর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়সহকারে কাজ করে সে এখন বছরে সাতশো ফ্রাঁ রোজগার করতে পারে। সে এখন ইংরেজি ও জার্মান শিখেছে। কুরফেরাকের দৌলতে বিশ্বকোষের সেই কাজটা পেয়েছে। তাছাড়াও খবরের কাগজের জন্য কিছু লেখা লেখে। আরও কিছু নোটের কাজ ও জীবনীগ্রন্থ লেখার কাজ করে।
গর্বোর সেই ব্যারাক বাড়িটার মধ্যে বছরে তিরিশ ফ্রাঁ দিয়ে একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে সে। রাত্রিতে কুরফেরাদের সেই হোটেলটায় গিয়ে মোলো স্যু দিয়ে রাতের খাওয়া সেরে আসে। আসার সময় কাউন্টারে পয়সা দিতে গেলে মাদাম রুশো একমুখ হেসে তাকে বিদায় দেয়। তার সব খরচ ধরে বছরে ৬৫০ ফ্রা’র মধ্যেই হয়ে যায়। পঞ্চাশ ট্র্যা করে তার জমে এই জমানো টাকা থেকে সে কুরফেরাককে একবার ষাট ফ্ৰাঁ ধার দেয়।
কয়েক বছর ধরে সংগ্রামের পর এই সচ্ছল অবস্থায় মধ্যে আসতে পেরেছে সে। অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে কাটলেও সে কারও কাছ থেকে একটা পয়সা ধার করেনি। তার মতে ধার থেকেই দাসত্বের শুরু। কারও অধীনে কাজ করা ভালো। উত্তমর্ণ বা ঋণদানকারী লোকের থেকে মালিক ভালো। মালিক শুধু শ্রমিকের উপস্থিতি চায়। কিন্তু ঋণদানকারী আমাদের মানসম্মান গ্রাস করতে চায়। সে কতদিন না খেয়ে থেকেছে, তবু কারও কাছে ধার করেনি।
দুঃখের দিনে এক গোপন আত্মশক্তিই তাকে সাহস জুগিয়ে এসেছে। আত্মাই দেহকে অনেক সময় সাহায্য করে এবং তাকে উপরে তোলে। পাখিই একমাত্র খাঁচাকে সহ্য করতে পারে।
তার বাবার সঙ্গে সঙ্গে আরও একজনের নাম মুদ্রিত হয়ে গেল মেরিয়াসের মনে। সে নাম হল থেনার্দিয়েরের। যে থেনার্দিয়ের তার বাবাকে ওয়াটারলু যুদ্ধের মৃত্যুর কবল থেকে উদ্ধার করে তার সম্বন্ধে স্বভাবতই একটা উচ্চ ধারণা গড়ে ওঠে তার মনে। তার মনের মধ্যে দুটো বেদি করে তার বাবা আর থেনার্দিয়েরকে বসিয়ে এক ধর্মীয় শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে তাদের স্মৃতিকে লালন করতে থাকে। যেনার্দিয়েরকে মঁতফারমেলে না পেয়ে হতাশ হলেও সে আবার তার খোঁজ করতে থাকে। দুর্ভাগ্যের কবলে পড়ে স্থান ত্যাগ করতে সে বাধ্য হয় একথা ভেবে তার প্রতি তার কৌতূহল বেড়ে যায়। তিন বছর ধরে আশপাশের অঞ্চলের অনেক শহর ও গ্রামে খোঁজ করে সে এবং এর জন্য যথাসাধ্য সে অর্থব্যয় করে। সবাই বলছে থেনার্দিয়েররা পাওনাদারদের টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে গেছে। মেরিয়াসের মতো পাওনাদারেরাও খুঁজছে থোর্দিয়েরকে। এই একটামাত্র ঋণ তার বাবা তার ওপর চাপিয়ে দিয়ে গেছে। মেরিয়াস ভাবল, আমার বাবা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে মুমূর্ষ অবস্থায় পড়েছিল তখন এই থেনার্দিয়েরই পিঠে করে নিরাপদ স্থানে বয়ে নিয়ে যায়। সে আমার বাবার জন্য এত কিছু করেছে তাকে খুঁজে বার করে তার বিপদে না দেখে কী করে থাকি। তাকে জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা আমার একান্ত কর্তব্য। তাকে অবশ্যই খুঁজে বার করতে হবে।
থেনার্দিয়েরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য মেরিয়াস তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিতে পারত। সে তার শেষ রক্তবিন্দু দান করতে পারত। তাকে খুঁজে বার করে তাকে সেবা দান করার জন্য বলতে ইচ্ছা করছিল। তুমি আমাকে চেন না। আমিও তোমাকে চিনি না। তবু আমি এসেছি। তুমি আমার কাছ থেকে কী চাও তা বল।
এটাই এখন মেরিয়াসের একমাত্র স্বপ্ন।
.
৩.
মেরিয়াসের বয়স এখন কুড়ি। আজ তিন বছর হল সে তার মাতামহকে ছেড়ে চলে এসেছে। তার সঙ্গে সম্পর্কের কোনও উন্নতি হয়নি।
তাদের মধ্যে আর দেখা হয়নি। তাদের পুনর্মিলনের জন্য কেউ কোনও চেষ্টা করেনি। অবশ্য দেখা হলেও কোনও ফল হত না। তবে ঝগড়াটা নতুন করে জোরালো হয়ে উঠত। কেউ মাথা নত করল না। মেরিয়াস এক দুর্বার চলমান শক্তি, আর বৃদ্ধ গিলেনৰ্মাদ অটল।
তবে একটা কথা ঠিক যে মেরিয়াস তার মাতামহকে ভুল বোঝে। কারণ তার ধারণা ছিল তার মাতামহ তাকে মোটেই ভালোবাসে না, কখনও ভালোবাসেনি। শুধু ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছে আর তিরস্কার করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে সে ভুল করেছে। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তাকে ভালো ঠিকই বাসতেন, এ ব্যাপারে তার একটা নিজস্ব পদ্ধতি ছিল। তাকে যখন-তখন ভর্ৎসনাটা ছিল তাঁর ভালোবাসারই এক বিশেষ ভঙ্গিমা। মেরিয়াস বাড়ি থেকে চলে গেলে এক অন্ধকার শূন্যতা আচ্ছন্ন করে ফেলে তারা সারা অন্তরটাকে। তিনিই নিজে হুকুম দিয়েছিলেন, তার নাম যেন কেউ কখনও না করে তাঁর কাছে। কিন্তু তার এ আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্যও তিনি খুবই দুঃখিত হন। প্রথম প্রথম তিনি ভেবেছিলেন বোনাপার্টপন্থী জ্যাকোবিন বিদ্রোহী যুবক নিজে থেকেই ফিরে আসবে। কিন্তু সপ্তার পর সপ্তা, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে গেলেও সে ফিরে এল না দেখে দুঃখ বেড়ে গেল তার। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন তিনি, সে ফিরে এসে ওকথা আবার যদি বলে তা হলে আবার কি তাকে তাড়িয়ে দেবেন তিনি? তাঁর অহঙ্কার বলল, হ্যাঁ, তাই করবেন তিনি। কিন্তু তার মস্তিষ্ক ভেবে বলল, না। মেরিয়াসের অভাব ক্রমশ বিষণ্ণ করে তুলঁতে থাকে তাঁকে। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ তপ্ত সূর্যালোকের মতোই ভালোবাসার বস্তু এবং তার তপ্ত সাহচর্য চায়। তার চরিত্রের ধাতুটা শক্ত হলেও মেরিয়াসের অনুপস্থিতিতে সে ধাতু অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে যায়। আগের মতো বাইরে হাসিখুশির উচ্ছলতা দেখালেও সে উচ্ছলতার মধ্যে একটা চাপা যন্ত্রণার আবেগ ফুটে উঠত। কোনও কারণে হঠাৎ রাগে ফেটে পড়লে তার পর অনেকক্ষণ বিষণ্ণ হয়ে থাকতেন। মাঝে মাঝে নিজের মনে বলতেন, ছোকরাটা একবার যদি ফিরে আসে তা হলে আমি তার কান মলে দেব।
