হ্যাঁ।
কিন্তু বিলের টাকা চাই আমার।
দয়া করে কুরফেরাককে আমার কাছে কিছুক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দেবেন?
কুরফেরাক এসে দেখা করল তার সঙ্গে। মেরিয়াস তাকে এতদিন যে কথা বলেনি সে কথা বলল। বলল, সে এখন জগতে সম্পূর্ণ একা। তারা বাবা-মা কেউ নেই।
কুরফেরাক বলল, তা হলে তোমার কী হবে?
মেরিয়াস বলল, জানি না।
তোমার কাছে কত টাকা আছে?
পনেরো ফ্রাঁ।
তুমি কি আমার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার চাও?
না, কখনই না।
তোমার কিছু পোশাক আছে?
যা আছে তা এই।
কিছু সোনারুপো আছে কাছে?
কেবল একটা হাতঘড়ি।
রুপোর?
সোনার, এই তো।
আমি একটা দোকানদারকে জানি যে তোমার পুরনো টেলকোট আর বাড়তি একজোড়া পায়জামা নেবে।
ভালো।
তা হলে তোমার পোশাকের মধ্যে শুধু থাকবে একজোড়া পায়জামা, একটা ওয়েস্ট কোট, টুপি আর জুতো।
এইসবই যথেষ্ট।
আমি ঘড়ি প্রস্তুতকারককে চিনি যে তোমার হাতঘড়িটা কিনে নেবে।
ভালো।
না, ভালো নয়। সব টাকা ফুরিয়ে গেলে কী করে চলবে তোমার?
যাই হোক, সৎভাবে চলতে হবে।
তুমি ইংরেজি জান?
না।
জার্মান?
না।
দুঃখের বিষয়।
কেন?
আমার এক পুস্তকবিক্রেতা বন্ধু একটা বিশ্বকোষ প্রকাশ করছে। ইংরেজি ও জার্মান ভাষা থেকে কিছু লেখা তুমি অনুবাদ করতে পারতে। পারিশ্রমিক খুবই কম, তবে কোনওরকমে চলে যেত।
তা হলে আমি ইংরেজি আর জার্মান ভাষা শিখে নেব।
ইতোমধ্যে চলবে কী করে?
পোশাক আর ঘড়ি বিক্রির টাকায় চলবে।
পোশাক বিক্রি করে কুড়ি ফ্রাঁ আর হাতঘড়ি বিক্রি করে পঁয়তাল্লিশ ফ্র পাওয়া গেল।
হোটেলে ফিরে এসে মেরিয়াস বলল, আমার কাছে পনেরো ফ্ৰাঁ আগে হতেই ছিল। এখন সব মিলিয়ে আশি ফ্রাঁ হল।
কুরফেরাক বলল, কিন্তু হোটেলের বিল?
হা ভগবান, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।
হোটেল বিল দেখা গেল সত্তর ফ্রাঁ হয়েছে।
কুরফেরাক বলল, কী মুশকিলের কথা! মাত্র দশ ফ্রাঁতে তুমি কি করে ইংরেজি ও জার্মান শিখবে?
এমন সময় মেরিয়াসের মাসি ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ কোনওরকমে তার ঠিকানা জোগাড় করে একটা চিঠি আর একটা প্যাকেটে করে কিছু টাকা পাঠায়। টাকার পরিমাণ ষাট পিস্তোল, যা ভাঙালে দুশো ফ্রাঁ হবে। কিন্তু টাকাটা ফেরত পাঠিয়ে দিল মেরিয়াস। সে একটা চিঠিতে তার মাসিকে জানাল সে তার জীবিকার ব্যবস্থা করেছে। তাতেই তার চলে যাবে। অথচ তার হাতে তখন ছিল মাত্র তিন ফ্রাঁ।
তার মাসি তার এই টাকা প্রত্যাখ্যানের কথা মঁসিয়ে গিলেনর্মাদকে জানাল না। কারণ তাতে তাঁর রাগ আরও বেড়ে যাবে। তাছাড়া তাঁর কাছে মেরিয়াসের নাম উল্লেখ করতেই তিনি নিষেধ করে দিয়েছিলেন তাকে।
মেরিয়াস পোর্তে সেন্ট জ্যাক হোটেল ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। আর ঋণ বাড়িয়ে লাভ নেই।
৩.৫ দিন চালানো খুবই কঠিন হয়ে উঠল
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
১.
এরপর দিন চালানো খুবই কঠিন হয়ে উঠল মেরিয়াসের পক্ষে। পোশাক গেছে, ঘড়ি গেছে। আর কোনও সংস্থান নেই। সারাদিন খাওয়া নেই। রাতে ঘুম নেই, আশ্রয় নেই। অন্ধকারে আলো নেই, ভবিষ্যতের আশা নেই। সে ভাড়া দিতে পারে না বলে আর কোনও ঘরভাড়া পায় না। যে বয়সে মানুষের সবচেয়ে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার দরকার হয় সেই বয়সে শুধু উপহাস আর বিদ্রূপ পাচ্ছে সবার কাছ থেকে। যুবকদের মন যে বয়সে আত্মবিশ্বাসে ভরে থাকে, তখন সে বয়সে ঘেঁড়া জুতো ও ছেঁড়া পোশাক পরে নিঃসীম দারিদ্রের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে তাকে। ভাগ্যের নিষ্ঠুর বিধান কোথায় নিয়ে চলেছে, তা কে জানে। হয়তো সে একটা অপদার্থ হয়ে উঠবে অথবা দেবতার কাছাকাছি চলে যাবে।
মানুষের এই দুরবস্থার মধ্যে ব্যাপক অবজ্ঞা ও অবহেলার মধ্যেও অনেক বড় কাজ হয়। এই সময় মানুষের মধ্যে এমন এক দুর্বার একগুয়ে সাহস থাকে, যা বাইরের যে কোনও বাধা-বিপত্তি অশুভ প্রভাবের প্রতিরোধ করে। অভাব, দারিদ্র্য আর নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে অনেক সময় অনেক বলিষ্ঠ বিরল চরিত্রের মানুষ গড়ে ওঠে।
এই সময় ছেঁড়া ময়লা জামাকাপড়ের জন্য দিনের বেলায় বেরোত না মেরিয়াস। সন্ধের পর বেরোত। তার মাসি ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ আবার সেই একই পরিমাণ টাকা পাঠিয়েছিল। কিন্তু এবারও সে ফেরত পাঠায় সে টাকা। এবারও চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয় তার টাকার প্রয়োজন নেই।
এত কষ্ট করেও সে আইন পড়া ছাড়ল না। সে নিয়মিত কলেজে যেত। কুরফেরাকের ঘরে অনেক আইনের বই ছিল। সেইসব বই সে পড়তে পেত। কুরফেরাকের ঠিকানাতেই তার চিঠিপত্র আসত।
আইন পাস করার সঙ্গে সঙ্গে কথাটা মঁসিয়ে গিলেনর্মাদকে একটা চিঠি দিয়ে জানায় মেরিয়াস। কর্তব্যগত শ্রদ্ধার সঙ্গেই লেখে চিঠিটা। মেরিয়াসের এই চিঠি পড়তে গিয়ে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের হাত দুটো কাঁপতে থাকে। কিন্তু পড়া হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দেন বাজে কাগজের ঝুড়ির মধ্যে। চিঠিটার কথা তার মেয়েকে বলেননি কিছু। কিছু না বললেও তিনি যখন নিজের ঘরে বসে আপন মনে বিড় বিড় করে কী বলছিলেন তখন তাঁর মেয়ে ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ শুনতে পায় তার কথা। তিনি বলছিলেন, তুমি যদি একটা অপদার্থ ক্লীব না হতে তা হলে বুঝতে পারতে একই সঙ্গে কেউ কখনও ব্যারন আর অ্যাডভোকেট হতে পারে না।
.
২.
অন্য সব কিছুর মতো দারিদ্রও সহনীয় হয়ে ওঠে কালক্রমে। নিদারুণ অভাবের মধ্যে হীনভাবে যাপন করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল মেরিয়াস।
