ঘরের উপস্থিত সকলে চুপ করে শুনতে লাগল। এঁজোলরাস মাথা নত করল। সব নীরবতার মধ্যেই সমর্থনের এক অনুচ্চারিত সুর থাকে। মেরিয়াস হাঁফ না ছেড়ে প্রবলতর আবেগের সঙ্গে আবার বলে যেতে লাগল, বন্ধুগণ, আমাদের সৌজন্যমূলক আচরণ করা উচিত। এই ধরনের এক সম্রাটের সাম্রাজ্যে পরিণত হওয়ার থেকে কোনও জাতির পক্ষে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে? সে জাতি হল ফ্রান্স এবং তার প্রতিভা এক বিরাট পুরুষের প্রতিভার সঙ্গে যুক্ত হবে। এক রাজধানী থেকে অন্য রাজধানীতে বিজয়গর্বে এগিয়ে যাওয়া, কত রাজবংশের পতন ঘটানো, ইউরোপের মুখটাকে বদলে দেওয়া, তোমাদের হাতের তরবারিগুলোকে ঈশ্বরের তরবারির মতো করে তোল। একটি লোকের মধ্যে হ্যাঁনিবল, সিজার এবং শার্লেমেনকে পাওয়া যায়। যে জাতির জীবনে প্রতিটি প্রভাত নব নব জয়ের সংবাদ এনে দেয় সে জাতির পক্ষে সেটা কি এক বিরল সৌভাগ্যের কথা নয়? ম্যারেঙ্গো, আর্কোল, অস্টারলিস, আয়েনা, ওয়াগরাম প্রভৃতি নামগুলো চির উজ্জ্বল হয়ে আছে ইতিহাসে। ফরাসি সাম্রাজ্যকে রোম সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী করে তোলা, পাহাড় থেকে যেমন ঈগলরা বিভিন্ন দিকে উড়ে যায় তেমনি এঁদ আর্মি গঠন করে পৃথিবীর চার প্রান্তে এক একটি বিরাট সেনাদল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া; অস্ত্রশস্ত্র ও বুদ্ধির দ্বারা দু দু বার পৃথিবী জয় করার মতো এক উজ্জ্বলতম জাতীয় গৌরব অর্জন করা, যে কথা ইতিহাসের পাতায় পাতায় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়–এগুলো কি মহত্ত্বের পরিচায়ক নয়? এর থেকে মহত্তর আর কী হতে পারে?
কমবেফারে বলল, স্বাধীন হতে পারা।
এবার মেরিয়াস মাথা নত করল। শান্তভাবে বলা শীতল কথাটা তার বাগ্মিতাতপ্ত বুকটাকে তরবারির মতো বিদ্ধ করল। তার মনে হল সহসা সব উদ্যম উবে গেছে তার। মেরিয়াস মুখ তুলে দেখল কমবেফারে আর সেখানে নেই। কথাটা বলে ফল হয়েছে। দেখে তৃপ্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় কমবেফারে আর তার সঙ্গে সঙ্গে অন্য সব বন্ধুরাও তার সঙ্গে চলে যায়। শুধু এঁজোলরাস আর মেরিয়াস ঘরের মধ্যে রয়ে যায়। মেরিয়াসকে গভীরভাবে খুঁটিয়ে দেখছিল এঁজোলরাস। এদিকে মেরিয়াসও ততক্ষণে সামলে নিয়েছে নিজেকে। মনে মনে সে পরাজয় স্বীকার করল না কিছুমাত্র। আবেগের উত্তাপের তখনও বেশ কিছু অবশিষ্ট ছিল তার মধ্যে। সেই আবেগের সঙ্গে আরও অনেক কিছু সে শোনাত এঁজোলরাসকে। কিন্তু হঠাৎ একটা গান শুনে দমে গেল সে। সে শুনতে পেল কমবেফারে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে পথটার উপর দাঁড়িয়ে একটা গান গাইছে। গানটার বাণীগুলো এই : সিজার যদি আমায় অনেক যুদ্ধজয়ের গৌরব আমার হাতে তুলে দিয়ে বলতেন, মা’র ভালোবাসা ত্যাগ কর, তা হলে আমি তাকে বলতাম, তোমার রথ আর রাজদণ্ড ফিরিয়ে নাও সিজার। সবকিছুর থেকে আমি আমার মাকে ভালোবাসি।
মিষ্টি করুণ সুরে গানটা এমনভাবে গাইছিল কমবেফারে যে গানটার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। গানটা শুনতে শুনতে ঘরের ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল মেরিয়াস। আপন মনে অনুচ্চস্বরে অর্ধচেতনভাবে বলে উঠল, আমার মা?
এঁজোলরাস তখন তার কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, হে নাগরিক, দেশের প্রজাতন্ত্রই হচ্ছে আমার মা।
.
৬.
সেদিনের সন্ধ্যাটা গভীরভাবে কাঁপিয়ে দেয় মেরিয়াসের মনটাকে। এক অব্যক্ত বিষাদের ভারে ভারী হয়ে ওঠে মনটা। মাঠে মাঠে যখন জমি কর্ষণ করে বীজ বপন করা হয় তখন ধরিত্রীর বুকেও এমনি একটা ব্যথা বাজে। বীজের অঙ্কুরোদগম, প্রাণচঞ্চলতা ও ফসলের আনন্দ অনেক পরে আসে।
বিষণ্ণ হয়ে ভাবতে লাগল মেরিয়াস। সম্প্রতি যে বিশ্বাসের সম্পদ সে খুঁজে পেয়েছে সে সম্পদ কি ত্যাগ করবে সে? সে নিজেকে এই বলে বোঝাল যে তার সংশয়ের কোনও প্রয়োজন নেই। দুটি বিশ্বাসের ঘাত-প্রতিঘাতে এই ভাবে দুলতে থাকাটা সত্যিই অস্বস্তিকর। একটি বিশ্বাস বা মতবাদ যখন তাকে বর্জন করে যায়নি, আবার আর একটি বিশ্বাস যখন তাকে এখনো আলিঙ্গন করে বরণ করে নেয়নি, তখন আধো-আলো আধো-অন্ধকারের মতো এক দুঃসহ অবস্থা হয় তার মনের মধ্যে। স্বচ্ছ দৃষ্টিসম্পন্ন মেরিয়াস চাইছিল সত্যিকারের এক আলো। অথচ এক সংশয়ের গোধূলির দ্বারা পীড়িত হচ্ছিল তার মনটা। তার পুরনো বিশ্বাসের ভিত্তিভূমিটাতে দাঁড়িয়ে থাকার যতই ইচ্ছা হোক না কেন, অগ্রগতির পথে কে যেন নির্মমভাবে টানছিল তাকে। এগিয়ে যেতে সে বাধ্য। তাকে ভাবতে হবে এ নিয়ে, চিন্তা করতে হবে, প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু এ চিন্তা কোথায় নিয়ে যাবে তাকে? তার একমাত্র ভয়, তার বাবার অনেক কাছে এসে পড়েও আবার সে দূরে সরে যেতে বাধ্য হবে। কারা তাকে যেন জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার বাবার কাছ থেকে। যতই ভাবতে লাগল সে এ বিষয়ে ততই আরও বেশি বিচলিত হয়ে পড়ল। একটা বিরাট বাধা ঘিরে ধরল তাকে। সে তার মাতামহের ও তার বন্ধুদের থেকে পৃথক হয়ে পড়ল। দু দিক থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল সে। প্রাচীন ও নবীন–কোনও দলেই যোগ দিতে পারল না সে। সে কাফে মুসেতে যাওয়া ছেড়ে দিল।
অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে মনের অবস্থা খুব খারাপ থাকায় টাকা-পয়সার কথাটা ভেবে দেখেনি মেরিয়াস। হোটেলমালিক হোটেলের বিলটা তার কাছে এনে দিল। বলল, মঁসিয়ে কুলফেরাক আপনাকে নিয়ে এসেছে এখানে। তা-ই নয় কি?
