তখন শীতকাল বলে আগুনে দুটো কাঠ পুড়ছিল। সে লোভ সামলাতে না পেরে চার্টারের দলিলটা মুচড়ে আগুনের উপর ফেলে দিল। বলল, অষ্টাদশ লুই-এর মহান সনদটাকে আগুন গ্রাস করে ফেলল।
এই হল যুবকদের সভা। আর তার মানেই যত সব বক্রোক্তি, বিদ্রূপ আর ভাঁড়ামি। একেই ফরাসিরা বলে শ্লেষাত্মক বিপ, আর ইংরেজরা বলে হাস্যরস। এর মধ্যে সুরুচি, কুরুচি, ভালো যুক্তি সব আছে। ঘরের এক কোণ থেকে সোচ্চার আলোচনার একটি ধ্বনি অন্য কোণে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে।
.
৫.
যুবকদের মনের বিশেষত্ব এই যে তারা কোনও বিস্ফোরণের সঙ্গে যে সব স্ফুলিঙ্গ থাকে সেগুলো আগে হতে দেখতে পায় না বা তার কথা ভাবে না। বিস্ফোরণ কী ধরনের হবে তা-ও বুঝতে পারে না আগে থেকে। তাদের অন্তরে হালকা ভাবটা কিছুক্ষণের মধ্যেই এক প্রবল হাসিতে ফেটে পড়ে, তার পর চরম আনন্দের উত্তেজনার মাঝে হঠাৎ তাদের ভাবটা গুরুগম্ভীর হয়ে ওঠে। এই সময় হঠাৎ বলা একটা কথা বা কোনও অলস দায়িত্বহীন উক্তি আলোচনার মোড়টা সম্পূর্ণ নতুন পথে ঘুরিয়ে দিতে পারে। অনেক অজানা বিষয় এসে পড়ে কথায় কথায়।
সহসা কার একটা কথা ঘরের সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। গ্রান্তেয়ার, বাহারোল, প্রুভেয়ার, বোসেত, কমবেফারে আর কুরফেরাক একযোগে কথাটা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল।
কথাটা কে তুলেছে তা কেউ জানে না। গোলমালের ভেতর বোসেত কমবেয়ারেকে একটা তারিখের কথা বলল। বলল, ১৮১৫ সালের ১৮ জুন–ওয়াটারলু।
মেরিয়াস এতক্ষণ টেবিলে কনুই-এর উপর মাথা রেখে বসেছিল। ওয়াটারলু’র নাম শুনে সে তাদের মুখপানে তাকাল হঠাৎ।
কুরফেরাক বলল, আশ্চর্য! আমি দেখেছি ১৮ সংখ্যাটা বোনাপার্টের পক্ষে সব সময় মারাত্মক হয়ে উঠেছে। অষ্টাদশ লুই আর ১৮ ক্ৰমেয়ার–এর দ্বারা বোনাপার্টের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে।
এঁজোলরাস এতক্ষণ চুপ করে ছিল। সে বলল, তোমাদের বলা উচিত যে অপরাধ তিনি করেছিলেন তার উপযুক্ত শাস্তি তিনি পেয়েছেন।
ওয়াটারলু’র নাম শুনে মেরিয়াস আগেই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। তার ওপর অপরাধ কথাটা সহ্য করতে পারল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালে টাঙানো ফ্রান্সের মানচিত্রটার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। আর একটা দিকে কর্সিকার একটা মানচিত্র ছিল। কর্সিকার মানচিত্রটার দিকে সে হাত বাড়িয়ে বলল, একটা ছোট দ্বীপ কর্সিকা ফ্রান্সকে বড় করেছে।
একঝলক ঠাণ্ডা বাতাস যেন বয়ে গেল ঘরখানার মধ্যে। এঁজোলরাস তার নীল চোখের দৃষ্টি বাইরে প্রসারিত করে মেরিয়াসের দিকে না তাকিয়েই বলল, ফ্রান্সের বড় হওয়ার জন্য কর্সিকার দরকার ছিল না। ফ্রান্স বলেই সে বড়।
কিন্তু মেরিয়াস এ কথা অত সহজে মেনে নিতে পারল না। সে এঁজোলরাসের মুখোমুখি হয়ে আবেগকম্পিত কণ্ঠে বলতে লাগল, ঈশ্বর করুন আমি ফ্রান্সকে যেন ছোট না করি। কিন্তু ফ্রান্সকে নেপোলিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে দেখাটা তাকে ছোট করা নয়, তার গৌরবকে খর্ব করা নয়। বিষয়টা স্পষ্ট ও পরিষ্কার করে ভোলা ভালো। আমি তোমাদের কাছে নবাগত। তোমাদের কথাবার্তায় আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমি। কোথায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি? তোমরা কে এবং আমিই-বা কে? সম্রাটের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বা কী? আমি শুনেছি বোনাপার্টের বদলে তোমরা বুনাপার্ট উচ্চারণ করেছ। আমার মাতামহ আবার বোনাপার্তে উচ্চারণ করতেন। তোমরা বয়সে যুবক। কিন্তু কী চাও তোমরা? তোমরা যদি সম্রাটকে শ্রদ্ধা করতে না পার তা হলে কাকে শ্রদ্ধা করবে তার বদলে? তিনি যদি মহান না হন তা হলে কোন ব্যক্তিকে তোমরা মহান মনে কর তা বল। তার সব কিছুই গুণই ছিল। তিনি ছিলেন সমগ্র। মানুষের সব গুণ, সব বুদ্ধিবৃত্তিই তার মস্তিষ্কে ছিল। তিনি জাস্টিনিয়ানের মতো আইন প্রণয়ন করতেন, তিনি ছিলেন সিজারের মতোই স্বৈরতন্ত্রী, তাঁর কথার মধ্যে ছিল পাসকেলের বিদ্যুৎ আর ট্যাসিফাসের বন্ধু। তিনি এক নতুন ইতিহাস রচনা করেন, তার প্রচারিত ইশতেহার এক একটি মহাকাব্য। তিনি নিউটনের গণিতের সঙ্গে মুহম্মদের উপমা অলঙ্কারের মিশ্রণ ঘটান। তিনি যেসব কথা বলে গেছেন সেসব কথার স্তূপ পিরামিডের মতোই উঁচু হবে। তিলসিতে তিনি সম্রাটদের দয়া কাকে বলে তা শেখান, অ্যাকাঁদেমি দে সায়েন্সে তিনি ল্যাপলেসের প্রশ্নের উত্তর দেন, স্টেট কাউন্সিলে তিনি মার্টিনের সমান মর্যাদা লাভ করেন। তিনি সব কিছুই দেখতেন এবং সব কিছুই জানতেন। তিনি তাঁর নবজাত পুত্রের দোলনার উপর একজন সরল সাধারণ লোকের মতো আনন্দ করতেন। সহসা সমগ্র ইউরোপ সন্ত্রস্ত হয়ে শুনেছে সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজের ধ্বনি, অস্ত্রবাহিনীর বজ্রগর্জন, অশ্বারোহী বাহিনীর দ্বারা উৎক্ষিপ্ত ধূলির ঝড়ের শব্দ, আর যুদ্ধের তূর্যনিনাদ। আর তাতে বিভিন্ন দেশের সিংহাসনগুলো কেঁপে উঠেছে, বিভিন্ন দেশের সীমারেখাগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে। তারা এক অতিমানবিক আশ্চর্য তরবারির খাপ থেকে বার করার শব্দ শুনেছে, তারা দেখেছে এক অতিমানব দিগন্তে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখে চোখ ধাঁধানো বিদ্যুতের আলো, তিনি এঁদ আর্মি আর ভিলে গার্দে নামে দুটো বিরাট ডানা মেলে বজ্র ও বিদ্যুতের মাঝে উড়ে যাচ্ছেন। সকলে জানত তিনি হচ্ছেন যুদ্ধের ঊর্ধ্বতন দেবদূত।
