এমন সময় গ্রান্তেয়ার প্রচুর মদ খেয়ে মদের ঝোঁকে লুসের হাত ধরে ঘরটার যে কোণে সে ছিল সেখানে জোর করে নিয়ে গেল। বোসেত যখন হাত বাড়িয়ে তাকে বাধা দিতে গেল তখন সে রেগে গিয়ে বলে উঠল, হাত সরিয়ে নাও ল্যাগলে। তুমি আমাকে শান্ত করতে পারবে না। আমি শান্ত হব না। আমার মন-মেজাজ ভালো নেই। মানুষের থেকে প্রজাপতি অনেক ভালো। মানবজাতি সব দিক থেকে ব্যর্থ। অতীতাশ্রয়ী এক বিষাদে আমি ভুগছি। আমার তাই রাগ হচ্ছে। ঈশ্বর জাহান্নামে যাক শয়তানের কাছে। বোসেত তখন আইনের একটা বিষয় আলোচনা করছিল। সে বলল, ঠিক আছে, এখন চুপ কর। আমি এখনও উকিল হয়ে উঠতে পারিনি। তবু আমি জানি, নর্ম্যানদের মধ্যে একটা প্রথা আছে। সেটা হল এই যে মাইকেলমাসের লর্ডের কাছে বছরে সম্পত্তির অধিকার বা উত্তরাধিকারের জন্য একটা টাকা দিতে হয়।
গ্রান্তেয়ারের কাছে টেবিলে দুটো মদের গ্লাসের মাঝখানে কিছু কাগজ, কালি আর কলম ছিল। দু জন ঘন হয়ে সেখানে কী আলোচনা করছিল। একজন বলল, প্রথম কতকগুলি নাম জোগাড় কর। নামগুলো ঠিক করলেই জমি পাওয়া যাবে।
অন্যজন বলল, হ্যাঁ ঠিক বলেছ। তুমি বল, আমি লিখে নিচ্ছি।
মঁসিয়ে ডবিমনের নামটা কেমন হয়?
একটা ভাড়াটে?
অবশ্যই। তার সঙ্গে একটা মেয়ে আছে। মেয়েটার নাম সেলেস্তিনে।
হ্যাঁ সেলেস্তিনে। তার পর?
কর্নেল সেঁতন।
‘সেঁতন’ নামটা চলবে না। তার থেকে বল ভ্যালসিন।
তাদের আরও দু জন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। তিরিশ বছরের এক যুবক আঠারো বছরের একটি ছেলেকে এক ডুয়েলের কথা বলছিল। তার প্রতিদ্বন্দ্বীর বিষয়। বর্ণনা করছিল। সে বলল, ডুয়েলের সময় সব সময় তার দিকে লক্ষ রাখতে হবে। সে খুব ভালো তরোয়াল চালাতে পারে। তার কব্জির জোর আছে। সে আবার বাঁ হাতে সব কাজ করে।
গ্রান্তেয়ারের উল্টো দিকে এক কোণে জলি আর বাহোরেল তাদের প্রেমের ব্যাপার নিয়ে কথা বলছিল।
জলি বলল, তুমি ভাগ্যবান, তোমার প্রেমিকা সব সময় হাসে। বাহোরেল বলল, এটা তার ভুল। কোনও প্রেমিকার সব সময় হাসা উচিত নয়। হাসি থেকে অবিশ্বস্ততা আছে। অবশ্য সে খুশির মেজাজে থাকতে পারে। সেটা দেখতে ভালো লাগে। বরং বিষণ্ণ হয়ে থাকলেই খারাপ দেখায়।
মেয়েরা আনন্দে থাকলেই তাদের আরও সুন্দর দেখায়। বল, তুমি ঝগড়া করবে না।
না, কারণ আমরা দু জনে একটা সন্ধি করে আমাদের সীমানা ঠিক করে নিয়েছি। কেউ কারও অধিকারের সীমানায় পা দেবে না।
জলি বলল, শান্তি। ভালো হজম থেকে শান্তি আসে।
বাহোরেল বলল, তোমার খবর কী জলি? সেই মেয়েটার সঙ্গে তোমার কেমন ঝগড়াঝাটি হচ্ছে? বুঝতে পারছ আমি কার কথা বলছি?
মেয়েটা একটা জেদের সঙ্গে আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটা বড় নিষ্ঠুর।
তবু তোমার চেহারাটা বেশ রোগা রোগা আছে। কোনও মেয়ের হৃদয় গলাবার পক্ষে যথেষ্ট।
হায়! আমি যদি তুমি হতাম তা হলে তাতে ঠিক বশীভূত করে ফেলতাম।
কথাটা বলা সহজ।
করাও সহজ। তার নাম মুশিয়েত্তা। তাই নয় কি?
হ্যাঁ বাহোরেল, মেয়েটা সত্যিই বেশ সুন্দরী। ছোট ছোট শিল্পীসুলভ হাত-পা, ভালো সাজপোশাক পরা, ফর্সা রঙ, মুখে ব্রণ, চোখ দুটো জ্যোতিষীদের মতো তীক্ষ্ণ। আমি তার জন্য পাগল।
তা হলে তাকে তো প্রেম নিবেদন করা তোমার উচিত। বেশ ভালো পোশাক পরে এগিয়ে যাও। তুমি দর্জির কাছে গিয়ে হরিণের চামড়া দিয়ে একটা ভালো পায়জামা তৈরি করাও। ইলিউসন পাই রইনের নায়ক মঁসিয়ে দ্য রুবেমপ্রের মতো। তাতে তোমার কাজ হবে।
গ্রান্তেয়ার বলে উঠল, কিন্তু তার দাম কত জান?
এদিকে ঘরের আর এক কোণে কবিতা আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনা চলছিল পেগান পুরান আর খ্রিস্টীয় পুরাণ নিয়ে। গ্রুভেয়ার পেগান পুরাণের পীঠস্থান অলিম্পাসের পক্ষ অবলম্বন করেছিল। সে আবার উত্তেজিত হয়ে উঠলে তার কথা থামতে চায় না। এক দুর্বার আবেগের স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। হাস্যরস আর কাব্যরস মিলেমিশে এক হয়ে যায়। সে বলল, প্রাচীন পৌরাণিক দেবতাদের অপমান করা উচিত নয়। এইসব দেবতার মাহাত্ম্য এখনও চলে যায়নি। জুপিটার নেই একথা আজও আমি ভাবতে পারি না। তোমরা হয়তো বলবে এসব স্বপ্নকথা; কিন্তু স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলেও সেইসব পেগান পুরাণের প্রভাব শেষ হয়ে যায় না। ভগলেমেনের মতো পাহাড় আজও এক বিরাট দুর্গের মতো সাইবেলের মুকুটের মতো তাকিয়ে থাকে আমাদের পানে। প্যান যে আজও রাত্রিতে বনের মাঝে এসে উইলোগাছের ফাঁপা গুঁড়ির মধ্যে ঢুকে বাতাসের সঙ্গে গাছগুলোকে নাড়া দেয় না একথা আমি ভাবতেই পারি না।
ঘরের আর এক কোণে রাজনীতির আলোচনা হচ্ছিল। কমবেফারে আর কুরফেরাকের সামনে অষ্টাদশ লুই-এর চার্টারের একটা কপি ছিল। কমবেফারে আর সলজটার সমর্থনে অনেক কথা বলছিল, কিন্তু কুরফেরাক যুক্তি দিয়ে সেটা নস্যাৎ করে দেবার চেষ্টা করছিল। সে বলছিল, প্রথমত আমার মতে রাজাদের কোনও প্রয়োজনও নেই। শুধু অর্থনৈতিক কারণেই আমি তাদের উচ্ছেদ চাই। চতুর্দশ লুই-এর পরগাছা, তার কাজের মতো কাজ কিছুই নেই। কিন্তু তার পেছনে খরচ কত জান? চতুর্দশ লুই-এর মৃত্যুর পর আমাদের জাতীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ছমিলিয়ার্ড, দু হাজার মিলিয়ন। প্রথম সোফ’র মৃত্যুতে জাতীয় ঋণের পরিমাণ ছিল তিরিশ হাজার লিভার। কমবেফারের মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েও বলতে হয়, সনদের মাধ্যমে রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের পথটা বিপজ্জনক। সাংবিধানিক জটিলতায় সব নীতি হারিয়ে যায়। রাজারা কখনও জনগণকে কোনও সুযোগ-সুবিধা দেয় না, তাদের সঙ্গে কোনও আপোস করে না। সনদের চৌদ্দ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় স্বার্থের খাতিরে প্রজাদের কিছু সুযোগ-সুবিধা দান করার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। সে সব ক্ষেত্রে রাজারা একদিকে দেয় আর অন্য দিকে নেয়। আমি সম্পূর্ণরূপে এই চার্টার বা সনদটাকে প্রত্যাখ্যান করছি। মিথ্যাকে ঢাকার এক ধোয়ার আবরণ ছাড়া এটা আর কিছুই নয়। কোনও জাতি এটা গ্রহণ করলে তাকে সব অধিকার ছাড়তে হবে। অধিকার যদি আংশিক হয়, অধিকার যদি সমগ্র বা সার্বিক না হয় তা হলে তার কোনও অর্থ হয় না।
